চারদিক-বঙ্গবন্ধুর বাল্যবন্ধু মানিক মিয়া by সাহাদাত পারভেজ

মানিক ঢাকায় এসেছেন। উদ্দেশ্য, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করা। বঙ্গবন্ধু তাঁর ছেলেবেলার বন্ধু। কিন্তু বাদ সাধলেন বঙ্গভবনের নিরাপত্তারক্ষীরা। মানিক মিয়াও নাছোড়বান্দা। বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেই যাবেন। খুব কষ্টে অবশেষে বঙ্গবন্ধুর দেখা পেলেন। মানিক বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘নিরাপত্তা ডিঙিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করা খুবই কষ্টকর।’


সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু দুই লাইনের একটি চিরকুট লিখলেন, ‘মানিক যখনই আসিবে, তখনই ঢুকিতে পারিবে—শেখ মুজিব’। দিনটা ছিল ১৯৭৩ সালের ৯ ডিসেম্বর। বঙ্গবন্ধু তখন রাষ্ট্রপতি। সেদিন বঙ্গবন্ধু মানিক মিয়াকে পাঁচ হাজার টাকাও দিলেন তাঁর মক্তবের শিক্ষক ব্রজেন বাবুকে দেওয়ার জন্য।
মানিক মিয়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাল্যবন্ধু, পাঠশালার সহপাঠী। বয়স এখন নব্বইয়ের ওপরে। বঙ্গবন্ধুর থেকে বয়সে ছয় মাসের বড় কিন্তু পড়তেন একই সঙ্গে। তালপাতা, কয়লা গুলিয়ে কালি আর বাঁশের কঞ্চির কলম নিয়ে একসঙ্গে পড়তে যেতেন গিমাডাঙ্গা পাঠশালায়। বর্তমানে গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সংক্ষেপে সবাই বলেন জিটি স্কুল। এখানে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে দুজন ভর্তি হন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে। স্কুলের এক মৌলভি সাহেব ছাত্রদের কানে বেত্রাঘাত করতেন। এর প্রতিবাদ করেন বঙ্গবন্ধু, মানিক মিয়াসহ পাঁচ-ছয়জন। এ নিয়ে তাঁদের অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ১৯৩৬ সালে দুজন একসঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করেন। বঙ্গবন্ধু ভর্তি হলেন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে। মানিক মিয়ার আর পড়াশোনা হলো না। যতটুকু জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর বাল্যবন্ধুদের মধ্যে মানিক মিয়াই এখন একমাত্র জীবিত। বঙ্গবন্ধুর আরেক ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধু শেখ শাহাদাত হোসেন মারা গেছেন বছর দেড়েক আগে। গত ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালনের দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে খোঁজ পাওয়া গেল সৈয়দ নূরুল হকের। মানিক মিয়া নামেই তাঁকে সবাই জানে।
বিশাল জায়গায় প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো একটি বাড়ি। পাশে একটি বড় পুকুর। বড় বড় গাছপালায় ঘেরা বাড়িটির ভেতর গিয়ে একটি কক্ষে দেখা গেল বয়োবৃদ্ধ মানুষটিকে। এখানেই থাকেন মানিক মিয়া।
নব্বই-ঊর্ধ্ব মানিক মিয়ার স্মৃতিশক্তি এখন আর আগের মতো কাজ করে না। লোকজনকে চিনতে পারেন না ঠিকমতো। চোখ-কান ঠিকই আছে। বাঘাইর নদীর ধারে পাটগাতী খুব সুন্দর একটা গ্রাম। পাশের গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। দূরত্ব এক কিলোমিটার। ১৪টি গ্রাম মিলে ছিল পাটগাতী ইউনিয়ন। এর একটি গ্রাম পাটগাতী, অন্যটি টুঙ্গিপাড়া। টুঙ্গিপাড়া এখন অবশ্য পৌরসভা। পাটগাতী গ্রামে মানিক মিয়ার এই বাড়িকে ঘিরে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর নানা স্মৃতি। এই বাড়িতেই ছিল একসময় বঙ্গবন্ধুর আড্ডা। পাটগাতীতে তখন লঞ্চঘাট ছিল। কলকাতা থেকে বরিশাল হয়ে স্টিমার এসে ভিড়ত পাটগাতীতে। বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে লঞ্চে এসে নামতেন পাটগাতী স্টেশনে। ‘প্রথমে আসতেন আমাদের বাড়ি। বাবার সঙ্গে দেখা করতেন, গল্পগুজব করতেন। বিশ্রাম নিয়ে তারপর যেতেন নিজের বাড়ি টুঙ্গিপাড়ায়।’ কথাগুলো বললেন মানিক মিয়ার বড় ছেলে সৈয়দ বদরুল হক।
বঙ্গবন্ধু যে কাচারিঘরে বসতেন, তা ঠিক আগের আদলেই রাখা হয়েছে। স্মৃতি ধরে রাখার জন্য বাড়িটির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। জামরুল খুব পছন্দ করতেন তিনি। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বাড়ি এলে জামরুলগাছে উঠে যেতেন। সেই গাছটি এখনো আছে। তবে আকারে ছোট হয়ে গেছে। যে পুকুরে নেমে গোসল করতেন, সেটাও আছে আগের মতোই। শুধু একটা পাকা ঘাট বানানো ছাড়া কিছুই পরিবর্তন করা হয়নি। স্মৃতিময় এই বাড়ি বানিয়েছিলেন মানিক মিয়ার বাবা আবদুল হামিদ।
মানিক মিয়া যে ঘরে থাকেন, সেখানে বঙ্গবন্ধুর একটি ছবি টাঙানো আছে। মাঝেমধ্যে মানিক মিয়া তাকিয়ে দেখেন তাঁর বাল্যবন্ধুকে। পাশের ঘরে আরেকটি ছবি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোলে মানিক মিয়ার ছোট নাতনি প্রিয়ম। দুটো ছবিই রাখা হয়েছে যতন করে।
বয়োবৃদ্ধ মানিক মিয়াকে এখন দেখাশোনা করেন তাঁর ছেলে ও পুত্রবধূরা। তাঁর ছয় ছেলে, ছয় মেয়ে। স্ত্রী সমিরণ নাহার শোভা মারা গেছেন ১৯৯৮ সালে। সেই থেকে স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে মানিক মিয়ার। অথচ এই মানিক মিয়াই ছিলেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে টুঙ্গিপাড়া শাখার ইনচার্জ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু তাঁকে সরাসরি পাটগাতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেন। ৩০ বছর পাটগাতী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। অথচ আজ বয়সের ভারে কেমন যেন ন্যুব্জ।
সৈয়দ বদরুল জানান, ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু যে চিরকুট দিয়েছিলেন, সেটি শেখ হাসিনা মানিক মিয়াকে একবার দেখতে এসে সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন। ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে চিরকুটটি।
আজ ১০ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে আসবেন শুনে ৯ জানুয়ারিতেই ঢাকায় চলে এসেছিলেন মানিক মিয়া। ১০ তারিখে হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তেজগাঁও বিমানবন্দরে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক দিনে বাল্যবন্ধুর কাছে যেতে পারেননি তিনি। ১১ জানুয়ারি যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গেলেন মানিক মিয়া, তখন বঙ্গবন্ধু তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘বেঁচে আছি বলেই তোর সঙ্গে দেখা হলো।’

No comments

Powered by Blogger.