সংবিধান সংশোধন এবং প্রসঙ্গ কথা by ডা. এম এ করীম

ইদানীং পত্রপত্রিকায় সংবিধান নিয়ে বেশ লেখালেখি চলছে। এ লেখালেখি চলছে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধনী-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির ইদানীংকালের বৈঠক, আগামী বিশেষ সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনীর সম্ভাবনা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল বিভাগের অ্যামিকাস কিউরিদের


সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং বিএনপির (কমিটিতে যোগ না দিয়ে) বক্তব্যের কারণে। এ সব কিছু আলোচনার আগে আমরা ফিরে তাকাই ১৯৭২ সালের সংবিধানের দিকে। সবারই হয়তো জানা আছে, ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বরে 'ধ্বনি ভোটে' গণপরিষদে সর্বমোট ২১টি অধিবেশনে মিলিত হয়ে ২০৮ দিনে বাংলাদেশ গণপরিষদ সদস্যরা অপূর্ব নিয়ম-নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে কার্যপ্রণালি বিধির সব বিধানানুসারে সর্বসম্মতভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করেন। সংবিধান প্রণয়নে কেবল তত্ত্বগত কচকচানি নয়, বরং বাস্তব প্রক্রিয়ায় তত্ত্বের প্রায় শতভাগ প্রয়োগ ইন্দ্রিয়গোচর করে পুরো প্রণয়ন-প্রক্রিয়াটি সামগ্রিকতায় নিয়মতান্ত্রিকতার এক আদর্শ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বাঙালি হিসেবে আমাদের প্রত্যেক নাগরিকের এই অধ্যয়নটি গৌরবমণ্ডিত ও মহিমান্বিত হয়ে থাকবে। আবুল খায়েরের সুরে সুর মিলিয়ে আমি বলতে চাই, 'গৌরবময় অতীতের সব শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও বলবৎকৃত সংবিধান রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের পবিত্র দায়িত্ব পালনে আমাদের সাফল্য বা ব্যর্থতার সালতামামি আবশ্যক। কেননা উত্তরকালে '৭২-এ প্রণীত সংবিধানটির ওপর যে পরিমাণে যথেচ্ছাচার চালানো হয়েছে এবং যে কায়দায় চালানো হয়েছে, তার তুলনাও ইতিহাসে বিরল। সে জন্য এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে তুলনামূলক বিচারে প্রণীত সংবিধানটি মর্মবস্তুগত দিক থেকে এতই আধুনিক, উদার গণতান্ত্রিক চেতনা সংবলিত_জাতি হিসেবে আমরা বাঙালিরা কি আদৌ এর সমতুল্য বা যোগ্য? আজ যতভাবে যত দিক থেকেই প্রজাতন্ত্রের অঙ্গগুলো যতই পাপস্খলন করার চেষ্টা করুক না কেন, এই পাপাচারের মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে যে তামসশক্তি সমাজে ও রাষ্ট্রে দম্ভভরে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে, তাতে কোনো একদল 'রাইচরণের বিজ্ঞজনোচিত বিচক্ষণ রায়ে' 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন'-এর মতো '৭২-এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তন হয়তো সম্ভব। কিন্তু হামাগুড়ি দিয়ে যে খোকাবাবু স্বাভাবিকভাবে যে চৌকাঠ পার হয়ে ভুবন দেখায় সামর্থ্য হতো, তাকে শৈশবেই বিকলাঙ্গ, বিকৃত ও সমাধিস্থ করে দেওয়ার হীন-অপচেষ্টার মধ্য দিয়ে যারা মার্শাল ডেমোক্রেসির উদ্ভব ঘটিয়েছিল এবং সেই যজ্ঞে সারথি হয়ে যারা বিষবৃক্ষের জন্ম দিয়ে সমাজকে বিস্ময় করে তুলেছে, তাদের কোথায় প্রত্যাবর্তন ঘটবে_ইতিহাস সে প্রশ্নের সামাধান না জেনে পাপস্খলনের সুযোগ দেবে না আদৌ!
মূল সংবিধানের প্রত্যাবর্তন এবং তদনুযায়ী রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে অব্যাহতভাবে সাংবিধানিক চর্চা অব্যাহত রাখার মাধ্যমেই কেবল স্বপ্নের আরাধ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। সংবিধানকে যারা শৈশবেই বিকলাঙ্গ, বিকৃত ও সমাধিস্থ করে দেওয়ার হীন চেষ্টা করেছিল, তাদের জাতি ভালোভাবেই চেনে। নতুন করে পরিচয় করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমার মনে হয় না। এরা একই উদ্দেশ্য নিয়ে ভিন্ন নামে বারবার হাজির হয়। ১৯৭৫-এর পরে এদের শুরু। আজও এরা থেমে নেই। সংবিধান হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের মৌলিক আইন। এই মৌলিক আইনগুলো কিন্তু স্বল্পমেয়াদি দলিল নয়। রাষ্ট্রের সংবিধান ঐশীগ্রন্থের মতো অপরিবর্তনীয়ও নয়। রাষ্ট্রের চরিত্র ও ভিত্তি আনুষ্ঠানিক অবয়ব পায় এই সংবিধানে। সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়। তবে সংবিধানের মৌলিক চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে সংবিধানে পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এ পরিবর্তন কিভাবে করা যায়, তা সংবিধানেই লিপিবদ্ধ করা আছে। সম্প্রতি সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল হয়েছে, সংবিধান তার আদি ('৭২ সালের) উপাদান ও চরিত্র ফিরে পেয়েছে। সে রায় অনুযায়ী সংবিধান পুনর্মুদ্রণও হয়েছে। (তবে পুনর্মুদ্রণ নিয়ে বিভিন্ন মহলের অভিযোগও রয়েছে)। এখানে উল্লেখ্য যে এই রায়ের ভিত্তিতে সংবিধানের যে রূপ পেয়েছে, তার পরও আরো সংশোধন-সংযোজন-সম্পাদনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদীয় কার্যক্রম শুরু করেছে। '৭২-এর সংবিধানের প্রথমটিই হলো 'গণতন্ত্র'। শুরুতেই ভোটাধিকার দিয়ে শুরু হলেও নাগরিকদের সব ধরনের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানই যে গণতন্ত্রের মূল কথা, তা এখন সর্বজন স্বীকৃত। আমাদের সংবিধানও তার ব্যতিক্রম নয়।
একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক হওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্রের সামনে ধর্মবর্ণ, লিঙ্গ-বিত্ত নির্বিশেষে তার সব নাগরিক সমান মর্যাদা ও অধিকারসম্পন্ন হবে। এখানে 'ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার'_এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান বিধান। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র 'দুটি দুই মেরুর'। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। কিন্তু এখন এ কী শুনি! রাষ্ট্রধর্ম থাকবে। বিস্মিল্লাহ থাকবে। আমাদের দেশের রাষ্ট্রধর্মের বিধান আবার মালয়েশিয়ার সংবিধান থেকে নেওয়া। এখানে মালয়েশিয়ার এক বিচারকের উদ্ধৃতি তুলে ধরছি, (যা ২০ বছর আগে এক নৈশ ভোজে আমাদের সাবেক বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সামনে বলেছিলেন) 'আমি দুই ধরনের বিড়ম্বনাগ্রস্ত এক বিপন্ন ব্যক্তি। আমি খ্রিস্টান এবং চীনা বংশোদ্ভূত। সবার সঙ্গে সমান চোখে আমাকে বিবেচনা করা হলে আমার অবস্থান অনেক ওপরে থাকত।' রাষ্ট্রের সব নাগরিক যদি রাষ্ট্রের কাছে সমান অধিকার না পায় এবং রাষ্ট্রের আদালতে সমান অধিকারসম্পন্ন না হয়, তবে সে রাষ্ট্র স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা পেতে পারে না। সরকার যেন '৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে চায় না। যেতে চাইলেও কোথায় যেন ভীত। শ্যাম রাখি না কুল রাখি_এমন একটা ইতস্তত ভাব। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হবে না। এটা কিসের জন্য? আন্তর্জাতিক শক্তির চাপ? পরার্মশ? ভোট হারানোর বিপদ? কোনটি? এ পথ ভালো নয়। এ পথ পরিষ্কার নয়। তাহলে জামায়াত আর বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের পার্থক্য কোথায়? সংবিধান সংশোধনে আমার মনে হয়_১. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কাল নিয়ে ভাবলেই চলবে না, এর সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থার অভাব কেন? অবাধ নির্বাচনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অভাব এবং প্রশাসন দলীয়করণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর নজর দেওয়া। ২. অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য স্বাধীন, নিরপেক্ষ শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা এবং এ কমিশন যাতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে ও দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে, তার ব্যবস্থা করা। ৩. তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি রাখতেই হয়, তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। ৪. প্রধানমন্ত্রী যখন কেউ হবেন, তখন তাঁকে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে।
লেখা শেষ করতে চাই '৭২-এর নভেম্বরের ৪ তারিখ_যেদিন গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয়, সেদিনের বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, 'ভবিষ্যৎ বংশধর, ভবিষ্যৎ জনসাধারণ কিভাবে শাসনতন্ত্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করবে, তারই ওপর নির্ভর করে শাসনতন্ত্রের সাফল্য, তার কার্যকারিতা। ভবিষ্যৎ বংশধররা যদি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শোষণহীন সমাজ গঠন করতে পারে, তাহলে আমার জীবন সার্থক, শহীদের রক্তদান সার্থক।' সংবিধান বলবৎ হওয়ার ৩৮ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রজাতন্ত্রের স্থপতি ও সংবিধান প্রণেতা মহান নেতৃবৃন্দ কথিত ভবিষ্যৎ বংশধররা সাবালক হয়েছেন। অনেকেই আইনসভার সদস্য হয়েছেন। কিন্তু সংবিধানে লিপিবদ্ধ অপরূপ সুন্দর স্বপ্নটি অধরাই থেকে গেছে। পক্ষান্তরে আমাদের সব কিছু নষ্টদের দখলে চলে গেছে। কিন্তু সময় এসেছে আবার জাতিকে একসূত্রে সূত্রায়িত করে তাবৎ অর্জন পুনরুদ্ধারে সক্ষম হওয়ার।

লেখক : বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট পরমাণু চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা

No comments

Powered by Blogger.