হাইকোর্টের মাইলফলক রায়টি অনুসরণযোগ্য-রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বৈধতা

রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় দণ্ড মওকুফ পাওয়া ব্যক্তিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ প্রদানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট একটি নতুন আইনি ধারা উন্মোচন করলেন। ৪০ বছর ধরে আমাদের ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদের আওতায় নেওয়া সিদ্ধান্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে।


রাষ্ট্রপতির ক্ষমার এখতিয়ারের অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভবত এটাই প্রথম রায়, যেখানে পরোক্ষভাবে হলেও প্রমাণিত হলো যে ৪৯ অনুচ্ছেদ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তে আদালতের নজরদারি রহিত করা যাবে না। তাই এই রায় একটা বিরাট বিচারিক অগ্রগতি।
বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২৫ এপ্রিল প্রায় ১৯ বছর আগে তথ্য গোপন করে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পাওয়া ক্ষমা উল্টে দিয়েছেন। দণ্ডিতকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন। এই রায়ের মধ্য দিয়ে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদের আওতায় রাষ্ট্রপতির বিশেষ অধিকারও বিচার বিভাগীয় এখতিয়ারভুক্ত।
মনে করা হয়, একজন বিচারক যতই প্রশিক্ষিত ও দক্ষ হোন না কেন, এমন বিরল মুহূর্ত আসতে পারে, যখন তিনি হয়তো কাউকে ভুলভাবে দণ্ড দিলেন। নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে কারণে ক্ষমা বা দণ্ড হ্রাসের সুযোগ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে এর অপব্যবহার চলছে। একজন পলাতক আইনের আশ্রয়লাভের অধিকারী নন। কক্সবাজারের ওই মামলায়ও দণ্ডিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দণ্ড মওকুফের সময় আইনের দৃষ্টিতে পলাতক ছিলেন।
বিচার বিভাগ নিয়ে যাঁরা সক্রিয় ভূমিকা রাখেন, আমরা তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। এই মামলায় হাইকোর্টের বেঞ্চ হয়তো তাঁদের এখতিয়ার নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন। কারণ, তাঁদেরটি রিট বেঞ্চ ছিল না, ছিল ফৌজদারি কার্যবিধিনির্ভর। সে কারণে ৪৯ অনুচ্ছেদ নিয়ে যে ধরনের পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত রায় ও নির্দেশনা আমরা আশা করেছি, সেটা হয়তো পুরোমাত্রায় অর্জিত না-ও হতে পারে। কিন্তু কোনো রিট বেঞ্চে জনস্বার্থে মামলা হলে আমরা তা পাওয়ার আশা করতে পারি।
ওই মামলার নথি নিখোঁজ। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস কীভাবে, কী সুপারিশ করেছিলেন, তা অজানা। আমরা আশঙ্কা করি, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা নথি খোয়ানোর জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পার পেয়েছেন। কিন্তু জনগণের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কমেনি। গত ৪০ বছরে কতজন ক্ষমা পেয়েছেন এবং তার নথি ব্যবস্থাপনার কী হাল, তা আমরা সরকারের কাছে জানতে চাই।
ফাঁসির আসামি ঝিন্টু এবং লক্ষ্মীপুরের আওয়ামী লীগের নেতা আবু তাহেরের ছেলের দণ্ড মওকুফের বৈধতা সন্দেহাতীতভাবে আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। আমরা আশা করব, এই রায়ের আলোকে সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল এর প্রতিকার চাইতে আদালতের শরণাপন্ন হবে। এই মাইলফলক রায় প্রমাণ করেছে, সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদকে যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করা যাবে না। উত্তম নজির হিসেবে এ রায়টি অনুসরণীয় হোক।

No comments

Powered by Blogger.