জাতীয়তাবাদের পুরোধা by সিরাজ উদদীন আহমেদ

২০০৪ সালের মার্চ-এপ্রিলে বিবিসি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০ জন বাঙালির নাম ঘোষণা করে। ২০ জনের মধ্যে চতুর্থ স্থানে নির্বাচিত হয়েছেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। প্রথম স্থানে রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, দ্বিতীয় হলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তৃতীয় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।


বিবিসির শ্রোতাদের জরিপে শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত করা হয়েছে।
তিনি মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস_ উভয় দলের নেতা ছিলেন। ১৯১৩ সালে ঢাকা বিভাগ থেকে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৪ সালে কৃষক-প্রজা সমিতি গঠন করেন। ১৯২৪ সালে বাংলার শিক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৩০-৩১ সালে তিনি লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন। ১৯৩৭ সালে তার দল কৃষক প্রজা পার্টি নির্বাচনে জয়লাভ করলে তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এ সময় তিনি শিক্ষা বিস্তার, জমিদারি উচ্ছেদ ও মহাজনি আইন পাস করে বাঙালি সমাজ জীবনে বিপল্গব সৃষ্টি করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর তিনি ঢাকায় রাজনীতি শুরু করেন এবং তার প্রতিষ্ঠিত কৃষক শ্রমিক পার্টিকে শক্তিশালী করেন। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালে ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। সুদীর্ঘ ষাট বছর ধরে তিনি বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন।
ফজলুল হক একজন সেরা দাতা, আইনজীবী ও বাগ্মী ছিলেন। বাংলা, ইংরেজি, আরবি, উর্দু ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। আইনসভায় তিনি জনগণের কথা বলেছেন, তাদের সমস্যার কথা বলেছেন এবং তাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। তিনি বাংলার রাজনীতিকে ঢাকার আহসান মঞ্জিল থেকে কৃষক-শ্রমিকদের কাছে নিয়ে আসেন। তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম কৃতিত্ব হলো বাংলার অবহেলিত, শোষিত, নির্যাতিত, কৃষক-শ্রমিকদের শিক্ষিত করা। রাজনীতির দর্শন ছিল অবহেলিত মুসলিম সম্প্রদায়কে শিক্ষার দিকে অগ্রসর করে নেওয়া। তিনি ছিলেন অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান উদ্যোক্তা। গ্রামবাংলায় অসংখ্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে একটি শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলেন। কলকাতা ইসলামিয়া, লেডি ব্রাবোর্ন ও চাখারে কলেজ প্রতিষ্ঠা করে তিনি মুসলমানদের উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচন করে। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ভূমি ও কৃষি সংস্কারের কোনো স্পষ্ট কর্মসূচি ছিল না। তারা জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ চায়নি। এসব কারণে ফজলুল হক পৃথকভাবে কৃষক-প্রজা পার্টি গঠন করেন। বাংলার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করে কৃষকদের মহাজনদের শোষণ থেকে মুক্ত করেন। বাংলার জনসংখ্যার ৮০ ভাগ কৃষক। তিনি আইন করে খাজনা বৃদ্ধি ও আবোয়াব চিরতরে বন্ধ করে দেন। জমিদাররা ছিল জমির মালিক। যে কোনো সময় তারা কৃষকদের তাদের দখলীয় ভূমি থেকে উচ্ছেদ করত।
এ কে ফজলুল হক ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তিনি সারাজীবন হিন্দু-মুসলমান মিলনের জন্য চেষ্টা করেছেন। হিন্দু-মুসলমান মিলনের জন্য ১৯১৬ সালে লখনৌ প্যাক্ট ও ১৯২৩ সালে বেঙ্গল প্যাক্ট প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম সেরা বক্তা। ১৯৩৭ সালের ১৫ অক্টোবর লখনৌ শহরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সম্মেলনে তার অপূর্ব ভাষণ শুনে লখনৌবাসী তাকে শেরেবাংলা উপাধিতে ভূষিত করেন।
জাতীয়তাবাদের মূলভিত্তি জনগণের মধ্যে চেতনাবোধ। তার নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের পূর্ণতা দেন। তিনি আসাম-বাংলা নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাকে ২৮ এপ্রিল ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে কবর দেওয়া হয়।

সিরাজ উদদীন আহমেদ : 'শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক' গ্রন্থের প্রণেতা

No comments

Powered by Blogger.