কালান্তরের কড়চা-ঢাকার তিলোত্তমা রূপ ধারণ এবং আবর্জনা ও ভিখিরি অপসারণ by আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

এবারের বঙ্গদর্শন (৬) সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট নায়ক নিকিতা ক্রুশভ বলতেন, ঔপনিবেশিক মানসিকতা হচ্ছে পোষা কুকুরের গলার বকলেসের মতো। দীর্ঘদিন ওই বকলেস পোষা কুকুরের গলায় বেঁধে রাখা হলে তারপর ওই বকলেস খুলে ফেলা হলেও কুকুর ওই বকলেস ছাড়া আর চলাফেরা করতে চায় না।


পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের সাবেক উপনিবেশগুলোর অবস্থাও অনেকটা তা-ই। ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও ওই যুগের মানসিক দাসত্ব, অভ্যাস ও রীতি-নীতি সাবেক উপনিবেশগুলোর দেশি শাসকরা সহজে ছাড়তে পারে না এবং ছাড়তে চায় না। সাবেক প্রভুদের অনুকরণের মাধ্যমে তারা নিজেরা প্রভু শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে বলে মনে করে।
ব্রিটিশ কলোনিয়াল শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর অবিভক্ত ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে প্রথমে ভারত ও পাকিস্তান, পরে বাংলাদেশ_এই তিনটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। দেশ তিনটি স্বাধীন হলেও তিনটি দেশের স্বদেশি শাসকদের কেউ বিদেশি শাসকদের আচার-আচরণ, শাসন প্রক্রিয়া_কোনোটারই অনুকরণ ছাড়তে পারেননি; বরং দিন দিন তার অনুকরণ বাড়ছে। এই অনুকরণ দ্বারা নিজেদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ভাবমূর্তি যে মর্যাদা হারায়, এ সম্পর্কে আমাদের শাসকদের মধ্যে সচেতনতা খুবই কম।
ব্রিটিশ আমলে আমার বয়স কম ছিল। কিন্তু তখন থেকেই ছিল পর্যবেক্ষণ শক্তিটা সমবয়সী অনেকের চেয়ে একটু প্রখর। আমি তখন বরিশাল শহরে থাকি এবং স্কুলে পড়ি। তখন দেখতাম, বরিশাল শহরের রাস্তাঘাট হঠাৎ ধোয়ামোছা হচ্ছে। রাস্তাঘাটে দীর্ঘকাল জমে থাকা জঞ্জালের স্তূপ সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। রাস্তাঘাট থেকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভিখিরিদের গ্রেপ্তার করে পুলিশের গাড়িতে তুলে শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আমরা তখনই বুঝতে পারতাম, কোনো ব্রিটিশ রাজপুরুষ অথবা ব্রিটিশ রাজপুরুষদের অনুগত কোনো উচ্চপদস্থ দেশি রাজ কর্মচারী আসছেন বরিশাল সফরে। এ রকম অন্যান্য জেলা শহরেও হতো। রাজধানী থেকে লাট সাহেব, কোনো মন্ত্রী বা সচিব এলে শহর ধুয়েমুছে একেবারে তকতকে করে ফেলা হতো। রাজপুরুষ যে পথ দিয়ে মোটর হাঁকিয়ে যাবেন, সেই পথে একজন ভিখিরিও চোখে পড়ার সুযোগ থাকত না। শহরটিকে মনে হতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, দারিদ্র্য ও ভিখিরিমুক্ত একটি সুন্দর নগরী।
ব্রিটিশ যুগের পর পাকিস্তান আমল এল। আমি তখনো কিশোর এবং স্কুলের ওপরের ক্লাসের ছাত্র। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র মৃত্যুর পর খাজা নাজিমুদ্দীনকে ওই পদে নিযুক্ত করা হলো। তিনি উর্দুভাষী বাঙালি। ঢাকার নবাব পরিবারের মানুষ। এমন একজন স্বদেশি মানুষ আসছেন বরিশাল সফরে। যেদিন তিনি আসবেন, তার সাত দিন আগে থেকে শুরু হলো বরিশাল শহর ধোয়ামোছা। আমি তখনো ঢাকায় আসিনি। মফস্বল শহরে বসেই শুনেছি, করাচি থেকে তাঁর আগমন উপলক্ষে ঢাকা শহরেও ধোয়ামোছা হয়েছে আরো বেশি করে। পুলিশ লাঠিপেটা করে ভিখিরি সরিয়ে দিয়েছে রাস্তাঘাট থেকে। বরিশাল শহরেও এর পুনরাবৃত্তি হলো।
আমার কিশোর মনেই তখন প্রশ্ন জেগেছিল, নাজিমুদ্দীন সাহেব তো বিদেশি শাসক কিংবা রাজপুরুষ নন। তিনি এ দেশেরই মানুষ। পুরনো ঢাকার নবাববাড়িতে তাঁর জন্ম। পাকিস্তান হওয়ার পর গভর্নর জেনারেল হয়ে করাচিতে চলে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত তিনি ঢাকায় ছিলেন। ঢাকা শহর কত অপরিচ্ছন্ন, রাস্তাঘাটে কত জঞ্জাল, সারা শহরে কত শয়ে শয়ে ভিখিরি, তা তিনি ভালো করেই জানেন। তাহলে এই একজন মানুষের চোখে ঢাকা শহরের আসল চেহারা ঢাকা দিয়ে তাঁকে দুই দিনের জন্য তিলোত্তমা করে সাজানোর এই ব্যয়বহুল হাস্যকর প্রয়াস কেন? কার চোখে ঢাকা শহরের জঞ্জালভর্তি রাস্তা, দুর্গন্ধময় নর্দমা এবং নগ্ন দারিদ্র্য আড়াল করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে? এটা কি আত্মপ্রতারণা নয়? বিদেশি ঔপনিবেশিক যুগের দাস-মানসিকতা বহন করে চলা নয়?
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দেখেছি, আমাদের প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বশীল স্বাধীন শাসকদের মধ্যেও পুরনো কলোনিয়াল অভ্যাস পরিত্যাগ করার কোনো লক্ষণ নেই। মন্ত্রীদের গাড়িতে চড়ে তীব্র শব্দে সাইরেন বাজিয়ে পথ চলা, পুলিশ দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলার পথ ভিড়মুক্ত করে ফেলা, গাড়ির আরোহী রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হলে সাধারণ মানুষকে দুর্বিষহ যানজটে ফেলা, আধঘণ্টা-এক ঘণ্টার জন্য রাস্তা একেবারে ফাঁকা করে ফেলা, গাড়ির সামনে-পেছনে মোটরসাইকেল আরোহী পুলিশবহরের পাহারা_বিদেশি ঔপনিবেশিক আমলের এসব ঠাঁটবাট সবই বজায় রাখা হয়েছে প্রজাতন্ত্রী স্বদেশে।
দেশে থাকতে ভাবতাম, এটাই বুঝি সব দেশের, গণতান্ত্রিক দেশগুলোরও নিয়ম। জীবনের প্রায় অপরাহ্নবেলায় বিলাতে এসে সেই ভুল ভেঙেছে। আজাদের আগের গভর্নর হাউস এবং এখনকার প্রেসিডেন্ট হাউসে যে বিপুল পাহারা দেখা যায়, তার সিকি ভাগ পাহারাও দেখিনি সত্তরের দশকের লন্ডনে রাজা-রানির সরকারি বাসভবন বাকিংহাম প্যালেসে।
একবার তো একটা পাগল গোছের লোক শেষ রাতে দেয়াল টপকে বাকিংহাম প্যালেসে স্বয়ং রানির বেডরুমে ঢুকে তাঁর শয্যাপাশে বসে রানিকে বলেছে, 'হায় ম্যাজেস্টি, আমাকে একটা সিগারেট খেতে দেবেন?' এ ঘটনা নিয়ে লন্ডনে তখন কত হৈচৈ!
সেই সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন লন্ডনে এসেছি, তখন দেখেছি, প্রধানমন্ত্রীর ১০, ডাউনিং স্ট্রিটের সরকারি বাসভবনের প্রধান দরজায় একজন মাত্র লাঠিধারী পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই সময় বাংলাদেশে আমাদের একজন সাধারণ মন্ত্রীর বাড়িতেও সেকি পাহারা! ব্রিটেনের কোনো কোনো মন্ত্রীকে দেখেছি পায়ে হেঁটে তাঁর কন্সটিটিউয়েন্সিতে ঘোরাফেরা করতে। লেবার পার্টির প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী পিটার শোরকে দেখতাম, পূর্ব লন্ডনের বাঙালিপাড়ায় পায়ে হেঁটে ঘুরছেন।
বাংলাদেশের কোনো প্রতিমন্ত্রীও রাস্তায় হাঁটছেন_এ দৃশ্য দেখেছি বলে মনে পড়ে না। লন্ডনে মন্ত্রীদের গাড়ি, এমনকি কুইনের গাড়ি চলাচলের জন্য রাজপথে যানজট সৃষ্টি হতে দেওয়া হয় না। আর বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিরোধীদলীয় নেত্রীর বিদেশ গমন বা দেশে ফেরার সময় এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে তাঁদের সারা যাত্রাপথ থাকে সাধারণ মানুষের জন্য অবরুদ্ধ। এর প্রতিক্রিয়ায় সারা শহরে ভয়াবহ যানজটে নগরজীবন অচল হয়ে পড়ে।
এবারও ঢাকা শহরে দেখেছি এই একই অবস্থা। ভিআইপিদের চলাচলের জন্য রাস্তায় সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করে সারা শহরে যানজট সৃষ্টি দ্বারা যে অসহনীয় অবস্থা সৃষ্টি করা হয়, ভুক্তভোগী ছাড়া এর যন্ত্রণা কেউ বুঝবে না। আমার এক ব্রিটিশ বন্ধু, যিনি ঢাকায় এ ধরনের যানজটে পড়েছিলেন, তিনি আমাকে বলেছেন, 'লন্ডনের রাস্তায় প্রধানমন্ত্রী, এমনকি রানির জন্যও যদি এ ধরনের যানজট সৃষ্টি করা হতো, তাহলে ব্রিটেনে নাগরিক-বিপ্লব ঘটে যেত। ওই প্রধানমন্ত্রীকে তো পদত্যাগ করতেই হতো, রাজতন্ত্রও হয়তো উচ্ছেদ হয়ে যেত।' আমি তাঁকে বলেছি, এ ধরনের ঔপনিবেশিক কায়দা-কানুন তোমরা শুধু তোমাদের সাবেক কলোনিগুলোতেই প্রবর্তন করে রেখে গেছো; নিজ দেশে প্রবর্তন করোনি। আমরা তোমাদের সেই ঔপনিবেশিক যুগের মানসিকতায় এখনো ভুগছি এবং সাবেক প্রভুদের রীতি-নীতি অনুকরণ করে চলছি মাত্র।
সময় বদলে গেছে। গণতন্ত্রের সেই 'খোলা দুয়ার-নীতি'র যুগ এখন আর নেই। নিউইয়র্ক শহরে সেই ভয়াবহ নাইন/ইলেভেনের ঘটনার পর সারা দুনিয়ায় যে যুগ শুরু হয়েছে, তাকে বলা হয় এইজ অব টেরোরিজম বা সন্ত্রাসের যুগ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যুদ্ধ ব্যবসা ও অস্ত্র ব্যবসার অতি মুনাফার জন্যও এই সন্ত্রাসী যুগ সৃষ্টি তাদের দরকার ছিল। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং সন্ত্রাসীদের হামলা থেকে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে সারা বিশ্বে নাগরিক অধিকার, মানবিক অধিকার_বহু কিছুই এই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এবং তার শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা হরণ করেছে। আসলে জননিরাপত্তা নয়, দেশে দেশে 'গণতান্ত্রিক শাসকদেরই' নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার চেষ্টা চলছে। এতে তাদের গণবিচ্ছিন্নতাই বাড়ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলোতেও সাবেক ঔপনিবেশিক প্রভুদের অনুকরণে দেশি শাসকদের, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-সাংসদদের কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে আপত্তি ছিল না। সন্ত্রাসীদের আকস্মিক হামলা থেকে বাঁচানোর জন্য আমাদের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং মন্ত্রী-এমপিদের নিরাপত্তা অবশ্যই কঠোর করা প্রয়োজন। গণতন্ত্রের 'খোলা দুয়ার নীতি' এখন আর অনুসরণ করা যাবে না, এটাও বোধগম্য ব্যাপার। কিন্তু তাই বলে কি আমাদের সেই ঔপনিবেশিক যুগের দাস প্রথায় ফিরে যেতে হবে? নিরাপত্তাব্যবস্থায়ও চলবে বৈষম্য-নীতি? নেতা-নেত্রীরা থাকবেন কঠোর পাহারার মধ্যে। আর সাধারণ নাগরিকরা দিনের পর দিন থাকবেন সন্ত্রাসের শিকার হয়ে? আমার এবারকার বঙ্গ দর্শনেরও অভিজ্ঞতা হলো, নেতা-নেত্রীদের নিরাপত্তার কঠোরতা এমন পর্যায়ে পেঁৗছেছে যে, তা নাগরিক জীবনকে মাঝে মাঝে দুর্বিষহ করে তোলে। পাশাপাশি জনজীবনে কোনো নিরাপত্তা নেই, প্রত্যহ বাড়ছে নানা রকম সন্ত্রাস। আর এই সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোই।
পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাই। আমার এবারকার বঙ্গ দর্শনের যে অভিজ্ঞতার কথাটা লিখতে চেয়ে কলম ধরেছিলাম, তার প্রস্তাবনাটাই বেশি বড় হয়ে গেল। এবার আসল কথায় আসি। এবার বাংলাদেশে এক মাস ছিলাম। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ। এবার ঢাকায় পা দিয়েই মনটা তরতাজা হয়ে গিয়েছিল। এমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঢাকা শহর কোন যুগে আমার চোখে পড়েছে, তা স্মরণ হলো না। রাজপথের মাঝখানে ডিভাইডারে তাজা ঘাস, তার ওপর রকমারি রঙিন ফুলের টানা শয্যা। রাস্তার দু'পাশে নানা রকম রঙিন পোস্টার-ফেস্টুন-সুদৃশ্য বোর্ড। বহু উচ্চে নিয়ন সাইনের বহু বিজ্ঞাপন। রাস্তার পাশে যত বোর্ড বসানো হয়েছে, তাতে ক্রিকেট বিশ্বকাপের খেলা এবং বাংলাদেশ টিমকে শাবাশ দিয়ে নানা কথা উৎকীর্ণ। অনেকগুলোতেই বঙ্গবন্ধুর এবং কোনো কোনোটায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি রয়েছে। অবশ্য অধিকাংশ বোর্ড বিজ্ঞাপনেই ইসলামী ব্যাংকের নাম মুদ্রিত (সে কথায় পরে আসব)।
আমার গন্তব্য ছিল এয়ারপোর্ট থেকে বনানীতে আমার জন্য নির্দিষ্ট করা হোটেল ইস্টার্ন রেসিডেন্স। দিনেরবেলা মুগ্ধ চোখে দেখেছি নতুন ঢাকার নতুন রূপসজ্জা আর রাতে দেখেছি আলোয় আলোকময় তিলোত্তমা ঢাকা। রঙিন আলোর রূপসজ্জায় উদ্ভাসিত মহানগর। আমার গাড়িচালক বললেন, স্যার, বিশ্বকাপের খেলার জন্য শহর সাজানো হয়েছে। এ রকম থাকবে খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, শহরে সারারাত এত রঙিন আলোর সমারোহ, লোডশেডিং তাহলে নিশ্চয়ই কমেছে?
ড্রাইভার বললেন, কিছুটা কমেছে স্যার। তা ছাড়া বিশ্বকাপের খেলা উপলক্ষ করে বিদ্যুৎ সাপ্লাই বিশেষ ব্যবস্থায় কিছুটা বাড়ানোও হয়েছে। রাস্তাঘাট আবর্জনামুক্ত করা হয়েছে। ট্রাফিক জ্যামও অনেকটা কম দেখবেন স্যার। কড়া ব্যবস্থায় মানুষ ট্রাফিক আইন মেনে চলতে বাধ্য হচ্ছে। তাঁর কথা শুনে মনে মনে বিশ্বকাপকে ধন্যবাদ জানালাম। হোক বড়লোকদের খেলা। এই খেলায় ঢাকার মানুষ লোডশেডিংয়ের দুঃসহ অত্যাচার থেকে কিছুটা হলেও বেঁচেছে। আবর্জনা আর দুর্গন্ধে ভর্তি ঢাকা তিলোত্তমা সেজেছে। তার বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে। এয়ারপোর্ট থেকে বনানী পেঁৗছতে আগের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে পড়ে থাকতে হলো না। এ যেন সেই ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনামলের মতো কোনো বিদেশি রাজপুরুষের নগর দর্শনে আসায় নেটিভদের নগরটি ঘষেমেজে পরিষ্কার করা হয়েছে, আলোকসজ্জিত করা হয়েছে। গরিবের কপালে এই ক্ষণিকের সুখ ও সৌভাগ্যই বা কম কিসে?
কিন্তু বনানীতে ইস্টার্ন রেসিডেন্স হোটেলে এক মাস অবস্থানের প্রথম রাতেই একাধিকবার লোডশেডিং। অবশ্য এই লোডশেডিংয়ের জন্য আমাদের ভুগতে হয়নি। হোটেলটির নিজস্ব জেনারেটর আছে। সুতরাং মুহূর্তেই আলো জ্বলে উঠেছে। কিন্তু যাদের বাড়িতে জেনারেটর নেই, তাদের কী হচ্ছে? এক হোটেল পরিচারক জানান, তাঁরা মোমবাতি অথবা হ্যারিকেন জ্বালায় স্যার। আপনার ঘরের টেবিলের ড্রয়ারেও মোমবাতি আছে, যদি জেনারেটর কাজ না করে।
কৌতূহল হলো। জিজ্ঞেস করলাম, রাস্তায় আলোকসজ্জার কী হয়?
পরিচারক বললেন, ওগুলো ঠিক থাকে স্যার। এর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে। বুঝলাম, বাইরের ঠাঁট বজায় রাখার ব্যবস্থা আছে। মনে প্রশ্ন জাগল, এ ব্যবস্থাটা কি একটু সম্প্রসারিত করে সাধারণ নাগরিকদের জীবনে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণাটা কমানো যায় না? বিদেশিদের জন্য চোখ ধাঁধানো এই আলোকসজ্জার পাশাপাশি পরীক্ষার সময় স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা যেন ঘন ঘন বৈদ্যুতিক আলো না হারায়, হাসপাতালে রোগীর অপারেশনের মুহূর্তে যেন আলো চলে না যায়, এপ্রিল-মে মাসের অসহ্য গরমে মানুষ যাতে ভয়ানক কষ্ট না পায়, কলকারখানাগুলোতে বারবার লোডশেডিংয়ের জন্য যাতে উৎপাদন বন্ধ না হয়, তার সামান্য বন্দোবস্ত কি এতদিনেও করা গেল না? কিন্তু বিশ্বকাপের আলোকসজ্জা তো আহামরি ঢঙে করা গেল। এ সম্পর্কে বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী সাহেবের বিজ্ঞ মতামত জানতে পারলে খুশি হতাম।
বিশ্বকাপের খেলা। অবশ্যই ঢাকা শহর ধোপদুরস্ত ও আলোর অলংকারে ভরে তোলা হবে, এতে কারো আপত্তি নেই। কথা হলো, এই ব্যবস্থাটুকুর স্পর্শ সাধারণ নাগরিক জীবনেও একটু টেনেটুনে নিয়ে আসা যায় না? ঘরে যদি বাতি না জ্বলে, তাহলে কেবল রাস্তায় আলো জ্বালিয়ে কী হবে? বিশ্বকাপ খেলার সময় ঢাকা শহরের রূপসজ্জা দেখে মনে হয়েছে, সরকার ইচ্ছা করলে ঢাকার দৈন্যদশা কিছুটা হলেও কমাতে পারে। তাহলে তা পারছে না কেন?
এবার এক মাস ঢাকায় অবস্থানকালে আমার কাছে বিস্ময়কর লেগেছে, রাস্তাঘাটে একেবারেই ভিখিরি নেই। ভেবেছি, ঢাকা কি হঠাৎ ভিখিরিমুক্ত হয়ে গেল? জিজ্ঞেস করে জেনেছি, পুলিশ ভিখিরিদের ধরে ঢাকার বাইরে চালান করেছে। খেলা চলাকালে তাদের আর ফিরতে দেওয়া হবে না। যদি তারা বিদেশি খেলোয়াড়দের চোখে পড়ে যায়! আমরা যে গরিব, বিদেশিরা তা জেনে যায়! ভাবখানা এই, তারা যেন আমাদের অবস্থা আর জানে না।
এটা ঠিক বিদেশি আমলের সেই ঔপনিবেশিক শাসকদের মতো আচরণ। বড় লাট বা ছোট লাট কোনো জেলা বা ডিভিশনাল শহরে এলে ঝেঁটিয়ে সব ভিখিরি শহর থেকে বিদায় করে দেওয়া হতো। বড় লাট বা ছোট লাট চলে যেতেন। শহরের অবস্থা আবার যা ছিল, তা-ই। এবার বিশ্বকাপ খেলার সময় ঢাকা শহরকে কিছু দিনের জন্য ভিখিরিমুক্ত দেখে আমার অতীতের কিছু তিক্ত-মধুর স্মৃতি মনে জেগেছে। (অসমাপ্ত)

লন্ডন, ১৮ এপ্রিল, সোমবার, ২০১১

No comments

Powered by Blogger.