দুই বিএনপি নেতার লাশ উদ্ধার by তৌহিদুর রহমান

শোর জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক ও ঝিকরগাছা উপজেলা সভাপতি ব্যবসায়ী নাজমুল ইসলামকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুর জেলার দক্ষিণ শালনায় তার লাশ পাওয়া গেছে। এর আগে বুধবার রাতে ঢাকার মোহম্মদপুরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে তিনি ধানমণ্ডির বাড়িতে ফেরার পথে অপহৃত হন। অন্যদিকে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে আবদুল ওহাব নামে অন্য এক বিএনপি


নেতাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে এ হত্যাকা ের প্রতিবাদে শনিবার যশোর জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে যশোর জেলা বিএনপি। বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম হরতালসহ তিন দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেন, বিএনপি নেতা নাজমুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। শনিবার যশোরে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জবাব দেওয়ার জন্য তরিকুল ইসলাম জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
খুনের ঘটনা জানার পর যশোর ও তার নিজ এলাকা ঝিকরগাছায় দলীয় নেতাকর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। উভয় স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন তারা। ঝিকরগাছায় পালিত হয় অঘোষিত হরতাল।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার সামনে থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা নিজেদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে নাজমুলকে তার গাড়িসহ অপহরণ করে নিয়ে যায়। এ অপহরণের খবর পেয়ে নাজমুলের স্ত্রী সাবিরা সুলতানাসহ পরিবারের সদস্যরা দফায় দফায় র‌্যাব ও পুলিশের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো সহযোগিতা পাননি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বাঘারপাড়া উপজেলা সভাপতি প্রকৌশলী টিএস আইয়ুব জানান, পরিবারের সদস্যদের নিয়েই নাজমুল বুধবার রাতে ঢাকা মোহাম্মদপুরে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখান থেকে তিনি একা একটি গাড়িতে ফিরছিলেন ধানমণ্ডির নিজ বাসায়। স্ত্রী ও সন্তানরা ছিলেন অন্য গাড়িতে। রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে নাজমুল ড্রাইভ করতে করতেই তাকে (টিএস আইয়ুব) মোবাইলে ফোন করেন। কথা বলার এক পর্যায়ে নাজমুল কিডন্যাপ অথবা ছিনতাইকারীর কবলে পড়ার কথা বলেন। এর পরপরই নাজমুলের ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে সারারাত নাজমুলের স্ত্রী সাবিরা সুলতানা মুনি্ন ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে তিনি র‌্যাব, পুলিশের কাছে ধরনা দেওয়াসহ বিভিন্ন স্থানে খুঁজে বেড়ান। সকাল ৭টার দিকে নাজমুলের ফোনটি খোলা পাওয়া যায়। তখন ওই ফোনে রিং দিলে এক পথচারী নিজেকে গার্মেন্ট কর্মী পরিচয় দিয়ে জানান, গাজীপুর জেলার দক্ষিণ শালনা এলাকায় রাস্তার পাশে একটি লাশ পড়ে আছে এবং তার পাশেই ফোনটি পড়ে আছে। এরপর তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ গলায় ও মুখে গামছা পেঁচানো অবস্থায় নাজমুলের লাশটি উদ্ধার করে।
লাশ চাই না, বাবাকে চাই : সকাল থেকেই ধানমণ্ডির ১২ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাড়ির সি/৫ নম্বর ফ্ল্যাটে নাজমুলের স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের শোকের মাতম চলছিল। নাজমুলকে শেষবারের মতো দেখতে ওই বাড়িতে ভিড় করেছিলেন আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। একই সঙ্গে বাবার প্রতীক্ষায় ছিল নাজমুলের তিন সন্তান_ রিফাত (১২), নাফিউ (৮) ও নাওয়াফ (৫)। বারান্দার গ্রিল ধরে তারা রাস্তায় খুঁজছিল বাবার গাড়ি। বিকেল ৩টায় হঠাৎ খবর আসে, নাজমুলের গাড়ি এসেছে। বড় ছেলে দৌড়ে নিচতলায় নামে। কফিনের কাপড়ে মোড়া লাশ দেখেই চিৎকার করে ওঠে, কই আমার বাবা তো আসেনি। শুধু লাশ এসেছে। বড় ভাইয়ের এমন আর্তনাদে কফিনের দিকে এগিয়ে গিয়েও থেমে যায় নাফিউ। খালা-ফুপুদের কাছে বলে, 'এ লাশ আমি দেখব না। তোমরা আমার বাবাকে এনে দাও। লাশ চাই না, বাবাকে চাই।' অবুঝ দুই সন্তানের পাশাপাশি স্ব্বামীকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন নাজমুলের স্ত্রী সাবিরা সুলতানা। এ সময় নাজমুলের ভাইবোন ও আত্মীয়-স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
হত্যাকা নিয়ে নানা গুঞ্জন :চাঞ্চল্যকর এই খুনের কারণ নিয়ে নানামুখী গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তবে এ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা দিতে পারছেন না কেউই। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যবসাকেন্দ্রিক বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বিরোধ ছিল নাজমুলের। এর মধ্যে আবুল কালাম আজাদ নামে ঢাকার এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিরোধের সূত্র ধরে ইতিপূর্বে তিনি জেলও খাটেন। ২০০৮ সালের মে মাসে আবুল কালাম আজাদ অর্থ আত্মসাৎ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে নাজমুলের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। গাজীপুরের একটি ফ্যাক্টরির জায়গাসহ ঢাকার কিছু জায়গা জমি নিয়েও নাজমুলের সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের বিরোধ চলে আসছিল বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় কোনো প্রতিপক্ষের নাম শোনা না গেলেও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে মনোনয়ন নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতা নিয়ে জোটভুক্ত একটি সাম্প্রদায়িক দলের সঙ্গে তার বিরোধের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। উল্লেখ্য, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে এ আসনে জামায়াত নেতা মুহাদ্দিস আবু সাঈদকে চারদলীয় জোটের মনোনয়ন দেওয়ায় নাজমুল সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। অবশ্য ভুল তথ্য দেওয়ায় তার মনোনয়নপত্রটি বাতিল হয়ে গিয়েছিল।
নাজমুলের উত্থান : এরশাদের শাসনামলে থানকাপড় এবং ভিসিপি পাচারের মাধ্যমে নাজমুল ইসলামের ব্যবসায় হাতেখড়ি। এরপর '৯০ সালে তিনি বেনাপোল বন্দরে আমদানি-রফতানি ও সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসা শুরু করেন। দলীয় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসার অন্তরালে শুল্ক ফাঁকির আশ্রয় নিয়ে তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, নিহত নাজমুলের বিরুদ্ধে প্রায় দু'ডজন মামলা রয়েছে। এর অধিকাংশই ভারত থেকে পণ্য আমদানি রফতানিতে জালিয়াতি, শুল্ক ফাঁকি, আন্ডার ইনভয়েস ইত্যাদির। এ ছাড়া ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে ঝিকরগাছা থানায় নাজমুলের বিরুদ্ধে এবং ঢাকার ধানমণ্ডি থানায় নাজমুলের স্ত্রী সাবিরা সুলতানার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। আয়বহির্ভূত ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের হিসাব গোপন করার অভিযোগে দুদক মামলা দুটি করে। এর আগে ২০০৮ সালের মে মাসে ব্যবসায়ী পার্টনার আবুল কালাম আজাদ অর্থ আত্মসাৎ ও তাকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে নাজমুলের বিরুদ্ধে ঢাকার শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেন। ওই মাসের ৫ তারিখে কম্বোডিয়া থেকে ফেরার পথে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে নাজমুল আটক হন। আলোচিত এ মামলাকে হয়রানিমূলক দাবি করে তা থেকে রেহাই পেতে সম্প্রতি নাজমুল আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ওই আবেদনে তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বলে পরিচয় দিয়েছেন। এ ছাড়াও নাজমুলের বিরুদ্ধে বেনাপোলে কাস্টমস কর্মকর্তা মতিয়ার রহমানকে অস্ত্র প্রদর্শন করে হত্যার হুমকির অভিযোগেও একটি মামলা হয়।
কোম্পানীগঞ্জে বিএনপি নেতা ওহাবের গলাকাটা লাশ উদ্ধার : নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্য ও চরকাঁকড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আবদুল ওহাবকে (৭০) জবাই করে হত্যা করা হয়েছে।
জানা গেছে বুধবার রাত ১১টার সময় আবদুল ওহাব চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের নিজ বাড়িতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অচেনা কয়েক ব্যক্তি আবদুল ওহাবকে নাম ধরে ডাকলে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে আসার পর থেকে তাকে আর পাওয়া যায়নি। পরিবারের লোকজন তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে চিন্তিত ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার সময় তার নাতি মাসুদ ও রাসেল ওহাবের বাড়ি সংলগ্ন বাগান বাড়িতে তার লাশ দেখতে পায়। বিষয়টি কোম্পানীগঞ্জ থানাকে জানানো হলে পুলিশ ওহাবের লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। এ ব্যাপারে চরকাঁকড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু নাছের জানান, আমার ধারণা এ হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক।

No comments

Powered by Blogger.