গুপ্তহত্যার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত রয়েছে - অধিকার : গুম ও হত্যার সঙ্গে সরকার জড়িত : মির্জা ফখরুল

শোরের বিএনপি নেতা নাজমুল ইসলামের নিহত হওয়ার ঘটনাকে ‘গুপ্ত হত্যা’ দাবি করে এর জন্য সরকারকে দায়ী করেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। নাজমুল হত্যার প্রতিবাদে আগামী শনিবার যশোরে স্থানীয় বিএনপি যে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছে, তাতে কেন্দ্রের সমর্থন রয়েছে বলে জানায় দলটি। গতকাল দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই-


সরকার পাইকারি হারে গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে। বিরোধী দল তথা বিএনপির নেতাকর্মীরাই এর শিকার হচ্ছেন। এর উদ্দেশ্য একটাই, যাতে সরকারের সব অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কিংবা প্রতিবাদ না হয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, আগেও বলেছি, এখনও দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি- গুম ও হত্যার সঙ্গে সরকার জড়িত।
বুধবার রাতে ঢাকার মিরপুরে এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে ধানমন্ডিতে নিজের বাসায় ফেরার সময় নিখোঁজ হন যশোরের ঝিকরগাছা থানা বিএনপির সভাপতি নাজমুল। বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে তার লাশ পাওয়া যায়।
নাজমুলকে অপহরণের অভিযোগে রাতেই মোহাম্মদপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন যশোরের আরেক বিএনপি নেতা।
পুলিশ বলছে, চোখে মলম দিয়ে এবং শ্বাসরোধ করে নাজমুলকে হত্যা করার আলামত পাওয়া গেছে।
নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে বলেন, গত ১২ ঘণ্টায় দেশে চারটি লাশ পাওয়া গেছে। অর্থাত্ প্রতি ৩ ঘণ্টায় একজন গুপ্তহত্যার শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে র্যাবের পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যাদের লাশ পরে উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন স্থান থেকে। গত মঙ্গলবারও মুন্সীগঞ্জে ধলেশ্বরী নদী থেকে তিনটি লাশ উদ্ধার করা হয়, যাদের গুলি চালিয়ে হত্যার পর লাশ বস্তায় ভরে নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল বলে পুলিশের ধারণা।
তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে ধলেশ্বরী নদী থেকে আরও তিনটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল, যার একটি ছিল ঢাকার ৫০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ইসমাইল হোসেনের। ইসমাইলসহ সংগঠনের তিন নেতাকর্মীকে গত ২৮ নভেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হাতিরপুল থেকে তুলে নিয়ে যায়। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এ ‘রহস্য’ ভেদ করতে সরকারের প্রতি তাগিদ দিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানও।
এ বিষয়ে বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের বক্তব্য ‘গুপ্তহত্যার’ বিষয়টি জানতে পেরেছি পত্রিকা পড়ে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, এটা একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য হতে পারে না। তিনি যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা নাইবা জানতে পারবেন, তাহলে ওই পদ আঁকড়ে থাকার মানে কী?
বর্তমান পরিস্থিতিকে ১৯৭২-৭৫ সালের সঙ্গে তুলনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, ওই সময়ে রক্ষী বাহিনী ও লালবাহিনী গঠন করে সরকার বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে।
নাজমুলের হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, এ সরকারের হাতে আইনের শাসন কখনও সুরক্ষিত থাকেনি। তারা আইনের শাসনের বদলে নিষ্ঠুর দলীয় শাসন জারি রেখেছে।
এ জন্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলেও হুশিয়ার করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।
গুপ্তহত্যার পেছনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাত রয়েছে - অধিকার : বিবিসি জানায়, বাংলাদেশে গত কয়েক মাসে হঠাত্ করে অপহরণ ও গুপ্তহত্যার ঘটনা বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এ ধরনের গুপ্তহত্যার পেছনে নিরাপত্তা বাহিনীর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিরোধী দল এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
গত ২৪ ঘণ্টায় বিএনপির যশোর জেলার একজন নেতাসহ মোট ৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। র্যাব বলছে, গত ৯ দিনে মোট ৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধেই অভিযোগ করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান অপহরণের পর হত্যাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নতুন কৌশল বলে মনে করছেন।
বিবিসির এক প্রশ্নের জবাবে আদিলুর রহমান বলেন, আগে ড্রেস পরে নিয়ে গেছে, বিচারবহির্ভূত কিলিং হয়েছে, ক্রসফায়ার হয়েছে। এখন অন্যরকম কিলিং হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে দেখা যায়—যেমন ল্যাটিন আমেরিকা বা ফিলিপাইনে গুপ্তহত্যা সরাসরিভাবে ধরা যায় না। তাই এ ধরনের টেকনিকে রূপান্তর হওয়াটাই আমরা মনে করছি।
প্রমাণ বা অনুমানের ভিত্তিতে এ ধরনের মন্তব্য কিনা বিবিসির এ প্রশ্নের জবাবে আদিলুর রহমান খান বলেন, এ ধরনের ঘটনার ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং করা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করছেন, ওই বিশেষ বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে নিয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে যারা প্রত্যক্ষদর্শী তারা বলছেন, ওই বাহিনীর গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে গেছে বা একটা সাদা মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। মাইক্রোবাসে চলার সময় কিন্তু বলা হচ্ছে আমরা নিয়ে গেলাম। অধিকারের হিসাবমতে এ বছরের নভেম্বর পর্যন্ত অপহরণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২২টি।

No comments

Powered by Blogger.