মেয়র লোকমান হত্যাকাণ্ড-খুনের সম্ভাব্য কারণ ৯ রকমের বিরোধ by পারভেজ খান ও সুমন বর্মণ

রসিংদীর মেয়র লোকমান হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্তে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নরসিংদীবাসী উদ্বিগ্ন। আশঙ্কা লোকমানের পরিবারের সদস্যদের মাঝেও। তাঁরা বলছেন, একটা বিষয় তাঁরা স্পষ্ট বুঝতে পারছেন যে তদন্তের নেপথ্যে অনেক নাটক তৈরি করা হচ্ছে।তবে পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা তদন্তের স্বার্থেই নীরবতাসহ নানা কৌশল অবলম্বন করছে; কাউকে ছাড় দিতে নয়।


গতকাল শনিবারও এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মাহফুজ, শাহিন ও ফারুক নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে পুলিশ এদের পরিচয় বা কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলছে না।
একাধিক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, এই মামলার তদন্ত চলছে মূলত একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল থেকে। ওই মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে নরসিংদীর পুলিশ। তারা যেভাবে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে, সেভাবেই তদন্ত চলছে। মতিন সরকার এবং মন্ত্রীর ভাই সালাহউদ্দিন বাচ্চু গ্রেপ্তার হয়েছেন, এটা অনেকেই নিশ্চিত। কিন্তু পুলিশ নীরব। অভিযোগ আছে, টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু নরসিংদীর পুলিশ সুপারকে (এসপি) যেভাবে বলছেন, তিনি সেভাবেই কাজ চলছেন।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসপি খন্দকার মহিদউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কোনো কথা হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে যেভাবে বলা হচ্ছে, তিনি সেভাবেই তদন্ত করছেন। কৌশলগত কারণেই তাঁরা প্রচারমাধ্যমকে কিছু বলতে পারছেন না। এটাকে অন্যভাবে নেওয়ার কিছু নেই। তবে এসপি আরো বলেন, তদন্তের যথেষ্ট অগ্রগতি আছে। খুব শিগগির সব কিছু খোলাসা হয়ে যাবে।
সম্ভাব্য ৯ কারণ : লোকমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এর নেপথ্য কারণ খুঁজতে যেমন মাঠে নেমেছে পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা; বলা চলে তেমনি মাঠে নেমেছে নরসিংদীর প্রতিটি মানুষ। পুলিশ-গোয়েন্দাদের মতো তাদেরও একটাই প্রশ্ন_কারা, কেন খুন করল লোকমানকে?
এই প্রশ্ন সামনে রেখে কালের কণ্ঠের ব্যাপক অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে সম্ভাব্য ৯টি কারণ। সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে ও গোয়েন্দা-পুলিশের তদন্তের সূত্র থেকে জানা গেছে, লোকমানের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা, গণমুখী রাজনীতি আর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে কমপক্ষে ৯ রকমের বিরোধ দানা বেঁধেছিল বিভিন্ন মহলের সঙ্গে। পুলিশও যেমন এগুলোকে লোকমান হত্যার সম্ভাব্য কারণ ধরে তদন্তে এগিয়ে যাচ্ছে, সাধারণ মানুষও তেমনি এসব কারণের আদ্যোপান্ত খোঁজার চেষ্টা করছে।

হত্যাকাণ্ডের পর মামলার এজাহার বা প্রাথমিক অভিযোগ দায়ের করেন লোকমানের ছোট ভাই কামরুজ্জামান। এজাহারে আসামি করা হয় ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর ছোট ভাই সালাহউদ্দিন আহমেদ বাচ্চুসহ ১৪ জনকে। আসামিদের মধ্যে ১২ জনই আওয়ামী লীগ ঘরানার। বাকি দুজন বিএনপির। এজাহারে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, লোকমানের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণেই একটি মহল ঈর্ষান্বিত হয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে।
কোনো হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধ বিশ্লেষণে একটা প্রশ্নই সবার আগে আসে। সেটা হলো, খুন হওয়া ব্যক্তির অবর্তমানে লাভবান হবে কে বা কারা? সব খুনের তদন্তের নেপথ্যে থাকে এই প্রশ্ন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নরসিংদীর মেয়র লোকমান হোসেন খুন হওয়াতে লাভবান হয়েছেন এক-দুজন নন, একাধিক।
অনুসন্ধান, তদন্ত আর জনমনে উঠে আসা লোকমান হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণগুলো :
এক : রায়পুরা উপজেলার পলাশতলী ইউনিয়নের মেনজেরকান্দি গ্রামের শাহনেওয়াজ ভূঁইয়ার ছেলে লোকমান হোসেন। নরসিংদী শহরের বাসাইল এলাকায় তাঁর বাড়ি। বাবা নব্বইয়ের দশকে স্ত্রী, পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে মারা যান। লোকমান ১৯৮৫ সালে নরসিংদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। নরসিংদী সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮৮ সালে তিনি নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে জেলা ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন থেকেই নেতৃত্ব নিয়ে নিজ দলের একটি প্রতিপক্ষ গ্রুপের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয় লোকমানের।
দুই : ২০০৪ সালে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় লোকমান নরসিংদী পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়ে বড় ব্যবধানে হারান সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মতিন সরকারকে। তখন থেকে বিরোধ তাঁর সঙ্গেও। নরসিংদীর রাজনৈতিক অঙ্গনে লোকমান হোসেনের উত্থানে শহরে আওয়ামীপাড়া হিসেবে পরিচিত বেপারীপাড়ার নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভাবমূর্তি ম্লান হতে থাকে। এটাও বিরোধ তীব্র করে বেপারীপাড়ার মতিন গ্রুপের সঙ্গে। মতিন সরকার তৎকালীন সংসদ সদস্য, বর্তমানে নরসিংদী জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাজু-মতিন সরকার সমর্থকরা নরসিংদীতে লোকমান ঠেকাও আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু লোকমানের ব্যাপক জনপ্রিয়তায় তা ধোপে টেকেনি।
তিন : জেলা আওয়ামী লীগের আগামী কাউন্সিলের সম্ভাব্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছিল। মেয়র লোকমান তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের কাছে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই পদে মন্ত্রী রাজুর ভাই জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর নামও আলোচিত হচ্ছিল। গত ১৫ অক্টোবর এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ওই দিন রাজুর অনুগত নরসিংদী সরকারি কলেজ সংসদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেহানুল ইসলাম লেনিনের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় লোকমানের অনুগত জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমানের সমর্থকদের। এ ঘটনার জের ধরে লোকমান গ্রুপের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। লোকমান গ্রুপের চার ছাত্রনেতা আদালতে জামিন আনতে গেলে আদালত তা নাকচ করে দিয়ে তাঁদের কারাগারে পাঠান। এ ঘটনার পর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্রলীগের লোকমান সমর্থক গ্রুপ। তারা মন্ত্রী রাজুর বিরুদ্ধে শহরে জুতা ও ঝাড়ু মিছিল বের করে এবং তাঁকে নরসিংদীতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। এতে মন্ত্রী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং দোষারোপ করেন লোকমানকে। এ ঘটনার পর মন্ত্রীর সঙ্গে লোকমানের বিরোধ আরো প্রকট হয়ে ওঠে।
চার : নরসিংদীতে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল লোকমানের। পৌর মেয়র হলেও নরসিংদীর ছয়টি থানা এলাকায়ই তাঁর সমান জনপ্রিয়তা। অনেকে এমনও বলেছেন, লোকমান নরসিংদীর পাঁচ আসনে একসঙ্গে দাঁড়ালে পাঁচটিতেই জিততে পারতেন। রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু ছাড়া নরসিংদীর বাকি চারজন সংসদ সদস্যের সঙ্গেও রাজুর ছিল ঘনিষ্ঠতা। ঈর্ষাকাতর হলেও ওই চার এমপি বাস্তবতা ও এলাকার অবস্থানের কারণে লোকমানকে সমীহ করে চলতেন। লোকমান যেটা বলবেন, সেটাই হবে_এটাই হয়ে উঠেছিল নরসিংদীর বাস্তবতা। আর লোকমানের সব কর্মকাণ্ডই ছিল জনমুখী। ফলে তাঁর সব কর্মকাণ্ডে এলাকার সাধারণ মানুষ তাঁর সঙ্গে এসে যোগ দেয়।
কিন্তু এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যান নরসিংদীর আরেক দাপুটে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং জেলা বিএনপির নেতা নুরুল ইসলাম। এলাকায় অভিযোগ রয়েছে, নরসিংদীর আন্ডার ওয়ার্ল্ড বলে যে একটি সন্ত্রাসী আর অপরাধীচক্র আছে, সেই চক্রের নেতা নুরুল ইসলাম। পুলিশের নথিতে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলাও আছে থানায়। কিন্তু লোকমানের উত্থানের কারণে নুরুল ইসলামের সন্ত্রাসী ক্যাডাররা একে একে যোগ দিতে শুরু করে তাঁর দলে। লোকমানও তাদের টেনে নিয়ে ভালো পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। নরসিংদীতে একাধিক মাদক ব্যবসার কেন্দ্র পরিচালনা করতেন নুরুল ইসলাম। লোকমান সেগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন। ফলে বিরোধ দেখা দেয় নুরুল ইসলামের সঙ্গেও। এ ছাড়া নুরুল ইসলামের ইচ্ছা ছিল ভবিষ্যতে নরসিংদীতে উপজেলা চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়র পদে নির্বাচন করার। কিন্তু লোকমানের আধিপত্যের কারণে তাঁর সেই স্বপ্নের যে বাস্তবায়ন সম্ভব নয় তা তিনি বুঝে যান। আর এ কারণেই এর আগে একাধিকবার লোকমানকে খুনের পরিকল্পনা হয়। লোকমান জীবিত অবস্থায় এ কথা অনেককেই বলেছিলেন। তাই এখন অনেকেই নুরুল ইসলামকে সন্দেহের তালিকায় রাখছে। শুধু সন্দেহ নয়, পুলিশের মতে নুরুল ইসলাম এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী। বাদীর এজাহারেও তাঁর নাম আছে।
পাঁচ : সম্ভাব্য আরেক খুনি শহর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ মোবারক হোসেন ওরফে মোবা। তিনি এজাহারভুক্ত আসামিও। তাঁর বিরুদ্ধে নরসিংদী থানায় একাধিক মামলা আছে। মোবা একসময় লোকমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আগে লোকমানের জন্য জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন মোবা। মোবার স্ত্রীর সঙ্গে তাঁরই আরেক বন্ধু তারেকের (এজাহারভুক্ত আসামি তারেক নয়) পরকীয়া সম্পর্ক হয় বলে এলাকায় গুঞ্জন রটে। স্ত্রীর এই পরকীয় নিয়ে মোবা অভিযোগ করেন মেয়র লোকমানের কাছে। লোকমান বন্ধুর এই পারিবারিক কলহের মীমাংসা করতে বিব্রতবোধ করেন। এসব বিষয় নিয়ে মোবার সঙ্গে লোকমানের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। মোবা ছিলেন নেশাসক্ত ও সন্ত্রাসী প্রকৃতির। এ ঘটনার পর থেকে লোকমান আর তাঁর স্ত্রীকে জড়িয়ে মোবা অপপ্রচার শুরু করেন। বিভিন্ন সময় রাস্তায় লোকমানকে গালাগালও করেছেন। লোকমানকে দেখে নেবে বলে মোবা হুমকিও দিতে থাকেন। লোকমানকে শায়েস্তা করার জন্য তিনি জোট বাঁধেন নুরুল ইসলামের সঙ্গে। মোবা পৌর নির্বাচনেও মেয়র পদে লোকমানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। হত্যাকাণ্ডের মাসখানেক আগে শহরের রাস্তাঘাট উন্নয়নের সময় হেমেন্দ্র সাহা মোড়ে ইসলাম প্লাজা ও হলি ক্রিসেন্ট ডায়াগনস্টিকসহ বেশ কয়েকটি ভবন ভাঙতে হয়। এ নিয়ে কিছু লোক লোকমানের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। এই সুযোগে মোবা যোগ দেন তাদের সঙ্গে। যখন যেখানেই কোনো দুর্বলতা পান, সেখানেই সুযোগ বুঝে লোকমানবিরোধীদের জড়ো করেন মোবা। কয়েক মাস আগে নরসিংদীর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে ঢুকে মোবা ও তাঁর বন্ধু কবির সরকার (লোকমান হত্যা মামলার আরেক আসামি) টেন্ডারের শিডিউল ছিনিয়ে নেন। এ ঘটনায় মামলা হলে মোবা ও কবির গ্রেপ্তার হয়ে বেশ কিছুদিন কারারুদ্ধ থাকেন। তাঁরা সে সময় লোকমানের সহযোগিতা চেয়ে ব্যর্থ হন। এরপর জামিনে ছাড়া পেয়ে লোকমানকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেন মোবা ও কবির সরকার। লোকমান হত্যাকাণ্ডের আগে মোবা মালয়েশিয়ায় চলে যান। পুলিশি তদন্তে আসামিদের মোবাইল কললিস্ট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মামলার অন্য আসামিদের অনেকেই দফায় দফায় মালয়েশিয়ায় মোবার সঙ্গে কথা বলেছে।
ছয় : হত্যা মামলার আরেক আসামি তারেক আহমেদ নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি। গত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন। লোকমান হত্যার সময় তারেক দেশের বাইরে ছিলেন। এলাকার সবাই জানত তিনি হজে গেছেন। পরে পুলিশি তদন্তে বের হয়ে আসে, তিনি হজে নয়, দুবাই গেছেন। স্থানীয় সূত্র মতে, নরসিংদীর সবচেয়ে বিত্তশালী পরিবারের সদস্য তারেক আহমেদ। শহরের সঙ্গীতা এলাকায় 'নাহার সিটি' নামের একটি হাউসিং প্রকল্প রয়েছে তাঁদের। এক বছর আগে তারেকের ভাই সাইফুল ইসলাম মারা যান। তারেক সাইফুলের স্ত্রী-সন্তানদের উত্তরাধিকার অনুযায়ী সম্পত্তি দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বিষয়টি নিয়ে সাইফুলের স্ত্রী লোকমানের কাছে বিচারপ্রার্থী হন। লোকমান তারেককে চাপ দেন সাইফুলের স্ত্রীর জমিজমা বুঝিয়ে দিতে। এ নিয়ে তারেকের সঙ্গে লোকমানের বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। অবশ্য লোকমানের সঙ্গে এর আগেও তারেকের বিরোধ ছিল। মেয়র নির্বাচনে লোকমানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন তারেক। লোকমান খুন হওয়ার পর পলাতক আসামিদের কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর দফায় দফায় টেলিফোনে কথাও হয়। পুলিশের তদন্তে এসব বের হয়ে এসেছে। এই হত্যাকাণ্ডে তারেকের সংশ্লিষ্টতাও রয়েছে বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন।
সাত : গ্রেপ্তার আরেক আসামি আশরাফ হোসেন সরকারের সঙ্গে লোকমানের বিরোধও পুরনো। সম্প্র্রতি এই বিরোধ আরো জোরদার হয় পৌরসভার প্রায় আট কোটি টাকার একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে। আশরাফ হোসেন মামলার দুই নম্বর আসামি আবদুল মতিন সরকারের ছোট ভাই।
পুলিশসহ বিভিন্ন সূত্র মতে, মেয়র লোকমান শহরের ব্রাহ্মণপাড়ার পাথরঘাটে যে জায়গায় প্লান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছিলেন, এর পাশেই সরকারি জায়গা ইজারা নিয়ে ব্যবসা করছিলেন আশরাফ। লোকমান ওয়াটার প্লান্টের জন্য আশরাফের ইজারার জমি থেকে কিছু অংশ নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। বড় ভাই মতিন সরকারের সঙ্গে পূর্বের বিরোধ আর এসব নতুন বিরোধ নিয়েই আশরাফ লোকমানকে আগেও কয়েকবার হুমকি দিয়েছিলেন।
আট : ছাত্র রাজনীতির সময় লোকমান ছিলেন মোবারক হোসেন মোবা, কবির সরকার ও তারেকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁদের বিরুদ্ধে ওই সময় শহরের বিভিন্ন সন্ত্রাসী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি শহরের ভেলানগরের যাত্রা প্যান্ডেলে খুন হন নরসিংদীর পৌর কমিশনার মানিক মিয়া। এই মামলায় আসামি করা হয় লোকমানকে। এসব নিয়েও অনেকের সঙ্গে বিরোধ ছিল লোকমানের।
এ ছাড়া লোকমান নরসিংদীতে একটা পৃথক 'বিচারালয়' খুলে বসেছিলেন। প্রতিদিনই তাঁকে ১০-১২টি করে ঘটনার বিচার করতে হতো। এলাকাবাসীর মতে, লোকমান ন্যায্য বিচার করতেন। তাঁর আপনজনদেরও ছাড় দিতেন না। এর জন্য অনেকেই থানা-পুলিশ বা আদালতে না গিয়ে লোকমানের 'আদালতে' যেতেন। এই বিচার নিয়েও প্রতিপক্ষ তৈরি হতো লোকমানের। এসবও এই হত্যাকাণ্ডের কারণ হয়ে থাকতে পারে।
এলাকার অনেক প্রবীণ ব্যক্তি গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, লোকমানের অতীতের জীবন বিতর্কিত হতে পারে, তবে এটা সত্য যে তিনি অনেকের কাছে আতঙ্ক থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন আশীর্বাদ। তাঁর সঙ্গে আধিপত্য নিয়ে বিরোধ হয়েছে তাদেরই, যারা নিজেরাও অর্থ আর ক্ষমতার আধিপত্য নিয়ে লড়াই করত। লোকমান ত্রাস ছিলেন ওদের কাছে। এলাকার খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষ লোকমানকে খেতাব দিয়েছিল 'জনবন্ধু'।
৯ : লোকমান হত্যাকাণ্ডের পর যে নামটি বারবার আসছে, সেটি হচ্ছে_এস এম কাইয়ুম। কাইয়ুম কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি এবং নরসিংদী সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। লোকমানের পক্ষ নিয়ে তিনিই সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদী। তবে এই হত্যাকাণ্ডে পুলিশের তালিকায় কাইয়ুমও সন্দেহভাজন ব্যক্তি। তাঁকে ঢাকার র‌্যাব অফিসে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। তাঁর ব্যাপারে পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কাইয়ুম এর আগে রায়পুরা উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন। তিনি শুধু নিহত লোকমানের ঘনিষ্ঠজনদের একজন নন_বলা চলে লোকমানের ডান হাত ছিলেন। স্থানীয় প্রভাবে লোকমানের পরই ছিল কাইয়ুমের অবস্থান। ফলে এখন লোকমানের অবর্তমানে একাধারে তিনি যেমন একাকী হয়ে পড়েছেন, তেমনি শীর্ষ পর্যায়েও আছেন। অর্থাৎ লোকমানের মৃত্যু তাঁকে এ দিক দিয়ে লাভবানও করেছে।
কাইয়ুম সম্পর্কে জানা যায়, তাঁর বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার নিলক্ষাই গ্রামে। তাঁর বাবা আবদুল হক রায়পুরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নিলক্ষা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। কাইয়ুম রায়পুরা উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিলেও আওয়ামী লীগ থেকে সরাসরি কোনো সমর্থন পাননি। আওয়ামী লীগ সমর্থন করে দলের উপজেলা সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী ভুঁইয়াকে। মন্ত্রী রাজুও ইউনুসের পক্ষ নেন। ওই সময় লোকমানও কাইয়ুমের পক্ষ নেননি। আর এটাই ছিল কাইয়ুমের পরাজিত হওয়ার বড় কারণ। এতে কাইয়ুম তখন থেকেই লোকমানের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। কিন্তু জনস্রোতের কারণে কাইয়ুম হাত মেলান লোকমানেরই সঙ্গে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কাইয়ুমের একান্ত ইচ্ছা_তিনি আগামীতে নরসিংদীর রাজনীতিতে একটা উল্লেখযোগ্য অবস্থানে যাবেন। লোকমানের জনপ্রিয়তার কারণে তা তিনি পারছিলেন না। ফলে কাইয়ুমও তাদের সন্দেহের তালিকায় রয়েছে।
পরিবারের আশঙ্কা

No comments

Powered by Blogger.