সাত মাস বেতন পাচ্ছেন না ১২ হাজার শিক্ষক by অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য

শ্রীমঙ্গলের মীর্জ্জাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক ডলি দাস। ওই বিদ্যালয়ে তিনি এমপিওভুক্ত শিক্ষক ছিলেন। বিয়ের পর গত মে মাসে তিনি ওই বিদ্যালয় ছেড়ে যোগ দেন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন উচ্চ বিদ্যালয়ে একই বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে। বিদ্যালয়টি তাঁর স্বামীর বাড়ির পাশে। উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনকারী শিক্ষকদের 'ইনডেঙ্ধারী শিক্ষক' বলা হয়।


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডলি দাস প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করলেও এমপিও শিটে তাঁর ইনডেঙ্ নম্বর পরিবর্তন হবে না। শুধু এমপিও শিটে বিদ্যালয়ের নামটি পরিবর্তন হবে এবং পরিবর্তনের পর যোগ দেওয়া নতুন বিদ্যালয় থেকে এমপিওর সুবিধা পাবেন।
জানা যায়, সাত মাস আগে ডলি দাস বিদ্যালয় পরিবর্তন করলেও এখন পর্যন্ত তাঁর এমপিও শিটে নতুন বিদ্যালয়ের নাম যুক্ত হয়নি। এর ফলে সাত মাস ধরে ডলি দাস বেতন পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, 'নতুন এমপিও শিটে আমার নাম যুক্ত না হলেও পুরনো প্রতিষ্ঠানের এমপিও শিট থেকে আমার নাম কেটে দেওয়া হয়েছে।'
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষকদের এমপিও দেওয়ার কাজটি করে থাকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর। সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এভাবে সারা দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ১২ হাজার শিক্ষক (ইনডেঙ্ধারী) প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করে এমপিও পাচ্ছেন না। অথচ তাঁরা আগের প্রতিষ্ঠানে থাকতে ঠিকই এমপিও সুবিধা নিয়েছেন। নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে এমপিও না পেয়ে এসব শিক্ষক অনেক কষ্টে রয়েছেন।
শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের সাত মাস ধরে বেতন-ভাতা না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বেতনের সরকারি অংশ প্রতিবছর জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত বাজেটে বরাদ্দ থাকে। একজন শিক্ষক এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেদিন চাকরিতে যোগদান করেন, সেদিন থেকে তাঁর বেতনের সরকারি অংশ দেওয়ার কথা থাকলেও সাত মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না ওই সব শিক্ষক-কর্মচারী। তিনি বলেন, বিষয়টি চরম অন্যায়, অযৌক্তিক ও অমানবিক। নভেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে শিক্ষকদের টাকা দেওয়া না হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।
জানা যায়, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনকারী শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য মাউশি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। সেই প্রস্তাবনায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কিভাবে দেওয়া যায়, এর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের জুন থেকে আগামী মে মাস পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও উৎসব ভাতা বাবদ খরচ হবে দুই হাজার ৯৭১ কোটি ৭৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া চলতি নভেম্বর থেকে আগামী বছরের মে মাস পর্যন্ত সাত মাসে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হবে দুই হাজার ৮৯৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। এ খাতে শুধু বেতন-ভাতা বাবদ উদ্বৃত্ত থাকবে ৭৮ কোটি ৬৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকা।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, শিক্ষক-কর্মচারীদের প্যাটার্নভুক্ত শূন্যপদে এমপিওভুক্তির কার্যক্রম চলতি বছরের জুন থেকে এখন পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে। ইনডেঙ্ধারী শিক্ষকদের বকেয়াসহ এমপিওভুক্তি প্রদানে প্রতি মাসে এক কোটি টাকা হিসাবে এ সাত মাসে (নভেম্বর-মে) সম্ভাব্য ব্যয় হবে সাত কোটি টাকা। প্যাটার্নভুক্ত শূন্যপদে ১২ হাজার ইনডেঙ্বিহীন শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া ছাড়া এমপিওভুক্তির জন্য প্রতি মাসে সাত কোটি টাকা হিসাবে উলি্লখিত সাত মাসে সম্ভাব্য ব্যয় হবে ৪৯ কোটি টাকা।
এ ছাড়া প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এমনিতে বাজেটে এ খাতে টাকা নেই। এ কারণে অন্য খাত থেকে টাকা কেটে এনে ইনডেঙ্ধারী শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার কথা চিন্তা করা হচ্ছে বলে মাউশি থেকে জানানো হয়েছে।
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. নোমান উর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সম্প্রতি ওই প্রস্তাবনা আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে চলতি অর্থবছরের বাকি মাসগুলোয় আমরা ইনডেঙ্ধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারব।'

No comments

Powered by Blogger.