লটারি নিয়ে কিছু কথা by ইমরুল চৌধুরী

সি বড়, না মসি! তাৎক্ষণিকভাবে অসিকে অগ্রাধিকার দেব। অসি ক্ষুরধার, তীক্ষষ্ট ও ধারালো। মুহূর্তে কিংবা পলকে শিরশ্ছেদে আর কারও সঙ্গে এর তুলনা চলে না। আর মসি শ্লথ, মন্থর ও ধীরগতির। তথাপি কালান্তরে মসির জয়জয়কার। অনেকটা কচ্ছপ ও খরগোশের দৌড় প্রতিযোগিতার মতো। শেষাবধি কচ্ছপের দূরদর্শিতা ছিনিয়ে আনে বিজয়ের মালা। নিজের ভেতর দ্রোহ থেকে বিদ্রোহের এই কলাম লিখতে বসা।


কী হয় লিখে? আমাদের জীবন প্রপাতের নানা সমস্যার কথা লিখে তার কি সম্যক কোনো সমাধান হয়? এত যে গোলটেবিল বৈঠক, টিভি পর্দায় এত যে ধুন্ধুমার টক শো, সুশীল সমাজের এত যে নিরন্তর উদ্বেগ_ সবই কি তাহলে বৃথা যাচ্ছে? হয়তো যাচ্ছে বা যাচ্ছে না। তবু লিখতে হয়। তাতে কিছু অর্জন হোক বা না হোক।
গত কয়েক বছর আগে এই কলাম লেখকের ওপর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত লটারি ড্র অনুষ্ঠানের সঞ্চালকের দায়িত্ব বর্তেছিল। যেহেতু এই কলাম লেখক 'যদি লাইগ্যা যায়' স্লোগানের আবিষ্কারক এবং একাধিক সংস্থার লটারির আয়োজক, তাই এই বিরল সম্মান। ঠিক ওই দিন একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত লটারির বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে এই লেখকের একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। ওই লটারির পর আরও একাধিক সংস্থা সরকারি অনুমোদন পেয়ে লটারি পরিচালনা করেছে। অতীব পরিতাপের বিষয়, সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের কোনো কর্মকর্তাই উলি্লখিত অসঙ্গতির প্রতি কোনো কর্ণপাত করেননি।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সংস্থা পরিচালিত লটারির একটি ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। যেমন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আয়োজিত ৯ পর্বের লটারি থেকে ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত সাফ গেমসের অর্থ সংগ্রহ, আর্ত-মানবতার সেবায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থা, যেমন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সমিতি, শিশু হাসপাতাল, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, সন্ধানী, জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি, ক্যান্সার হাসপাতাল, আধুনিক হাসপাতাল ইত্যাকার মানবহিতৈষী সংস্থার কর্মকাণ্ডে কিছুটা হলেও অর্থের জোগান দেওয়া। নিঃসন্দেহে এটি সরকারের একটি মহতী উদ্যোগ। এতে উলি্লখিত প্রতিটি সংস্থার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জনগণের প্রচ্ছন্ন অংশীদারিত্বের সুযোগ রয়েছে। এসব সংস্থার ভৌত অবকাঠামোর ইট-বালি-সুরকির সঙ্গে জনগণের রয়েছে সম্পৃক্ততা। অপরদিকে কোনো না কোনো সৌভাগ্যবান ব্যক্তি লটারির প্রথম পুরস্কার পেয়ে ভবিষ্যৎ জীবন যাপনে স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পান।
পত্রিকায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে প্রশ্নটি ছিল অন্যরকম। সরকার অনুমোদিত উপরোক্ত লটারির জন্য যেসব পুরস্কার ঘোষণা করা হয় তার মালিক এক অর্থে জনগণ। কোনো পুরস্কারের অর্থ কোনো না কোনো কারসাজিতে জনগণকে প্রদান করা না হলে সেই অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ওই সংস্থার পরবর্তী লটারিতে প্রদানের ব্যবস্থা করা। নচেৎ উপরোক্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া। বিভিন্ন আয়োজক সংস্থা কেবল প্রথম পুরস্কার প্রদানকে গুরুত্বসহকারে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির ছবি ফলাও করে পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। বিক্রীত টিকিটের ওপর অপ্রদেয় অন্যান্য পুরস্কার আয়োজক সংস্থা সংগোপনে নিজেদের কোষাগারে গচ্ছিত রাখে। এটি এক ধরনের প্রতারণা। প্রথম পুরস্কার ছাড়া অন্যান্য পুরস্কার প্রদানের বাধ্যবাধকতা যেন শূন্যের কোঠায়। আমি এ ব্যাপারে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের একটি মনিটরিং ব্যবস্থার জন্য সুপারিশ করেছিলাম। পরিতাপের বিষয়, সুপারিশ সুপারিশই থেকে গেছে। যেহেতু দেশে অনুষ্ঠিত এসব আর্থ-সামাজিক সংস্থা আয়োজিত লটারি থেকে অনেক সুফল অর্জিত হয়েছে বা ভবিষ্যতে আরও অর্জিত হবে, তাই লটারি যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে জন্যই আয়োজনে আরও স্বচ্ছতা প্রদান করা বাঞ্ছনীয়। ১০ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে যে বিরাট অঙ্কের টাকা প্রদানের অঙ্গীকার করা হয়, আসলে কি তা সত্যি? বলা হয়_ মাত্র ১০ টাকায় ৩০ বা ৪০ লাখ টাকার প্রথম পুরস্কার। ব্যানার, পোস্টার, স্টিকার, পত্রিকার বিজ্ঞাপন এমনকি টেলিভিশন বিজ্ঞাপনচিত্রেও ফলাও করে এই বিপুল অঙ্কের স্বপি্নল প্রলোভন দেখিয়ে ক্রেতাসাধারণকে আকৃষ্ট করা হয়। বাস্তবে কি এত টাকা! সৌভাগ্যবান বিজয়ীকে পুরস্কার প্রদানের সময় শতকরা ৩০% হারে আয়কর কর্তন করা হয়। ১০ টাকার বিনিময়ে কোনো সহৃদয় ব্যক্তি কোনো কিছু আয় করতে চায়নি, চেয়েছে পুরস্কার। চেয়েছে ওই সংস্থাকে যৎকিঞ্চিৎ সাহায্য করতে। তাহলে এই কর্তনের যৌক্তিকতা কোথায়? লটারির টিকিটের গায়ে সতর্কবাণীর মতো কোথাও এই কর্তনের বিষয় মুদ্রিত হওয়া প্রয়োজন ছিল। বাস্তবে তো তা হচ্ছে না। লটারির এহেন সামগ্রিক বিষয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে খতিয়ে দেখবে_ এই সুপারিশ রইল। দেখবেন তো!

ইমরুল চৌধুরী :সাবেক সংবাদ পাঠক, কবি ও শিশুসাহিত্যিক
adkingltd@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.