কৃষি খাত : নীতির অসম্পূর্ণতা by এ এম এম শওকত আলী

সার্বিকভাবে সব খাতের উন্নয়নের জন্য ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রতিটি খাতের উদ্দেশ্য ও কৌশলের রপরেখা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় খসড়া কৃষিনীতিও এখন চূড়ান্ত করবে। এ প্রক্রিয়ায় যদি ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকীর রূপরেখা আমলে নেওয়া না হয় তাহলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। এখানে মূল সমস্যা হলো বর্তমান পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষি খাতের উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়ে কিছু অসম্পূর্ণতা। এ পরিকল্পনায় কৃষি খাতের উন্নয়নের উদ্দেশ্য একাধিক।


এর অন্তত তিনটি উদ্দেশ্য আলোচনার দাবি রাখে। কারণ দুটি উদ্দেশ্যই খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া এ দুটির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে।
তিনটি উদ্দেশ্য হলো_এক. পর্যায়ক্রমে সেচনির্ভর বোরো চাষ দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ে যেতে হবে। এর উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বলা হয়েছে, নতুন লবণাক্ত সহনীয় বীজসহ অধিক পানি সহনীয় বীজ ও অন্যান্য চাপ (stress) সহায়ক বীজ ব্যবহার করা। ভূ-উপরস্থ সেচ ব্যবহারের বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। দুই. ফসল উৎপাদনের মাত্রার তারতম্য হ্রাস করে আউশ ও আমন ধানের উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে বোরো ফসলের সমতুল্য করা, যাতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব হয়। উত্তর-পূর্ব ভূগর্ভস্থ সেচনির্ভর এলাকায় উচ্চমূল্যসম্পন্ন (High Value Crops) নগদ ফসল (Cash crops), যেমন_গম, ভুট্টা এবং শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বলা যায়, একটি উদ্দেশ্য আরেকটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তবে ভূগর্ভস্থ সেচনির্ভর উত্তর-পূর্ব অঞ্চল কথাটি সঠিক নয়। এটা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল হবে, অর্থাৎ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলাগুলো। এই সব জেলা থেকেই বোরো ফসল ক্রমান্বয়ে দক্ষিণাঞ্চলে সরিয়ে নিলে বিষয়টির সঙ্গে উচ্চমূল্যসম্পন্ন ফসল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে উৎপাদন করা সহজ হবে। অন্যদিকে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অধিক ফসল ফলানোর কৌশল সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। খসড়া কৃষিনীতিতে কী আছে?
এ খসড়ায় উদ্দেশ্যের মধ্যে এসব কথা উল্লেখ করা হয়নি। উদ্দেশ্যের প্রারম্ভিক বক্তব্যে দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্রসহ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও সার্কের উন্নয়নের লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এ পরিকল্পনাই হবে উন্নয়নের মূল ভিত্তি। খসড়া নীতির সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে চারটি বিষয়_এক. গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন কৃষিপ্রযুক্তির উদ্ভাবন। দুই. ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিসহ আয় ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং তার জন্য লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করা। তিন. কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার প্রসার অর্জন করা। চার. জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য স্বনির্ভর ও স্থায়ী উৎপাদনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। সার্বিক দৃষ্টিকোণে সরাসরিভাবে সংঘাতময় না হলেও উদ্দেশ্যের বিষয়ে দুই উন্নয়ন দলিলে অষ্পষ্টতা রয়েছে। এর উদাহরণ, খসড়া কৃষিনীতির কৃষি উৎপাদন বিষয়ক অংশে বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সর্বমোট সাতটি বিষয়, যা আলোচনা করা শ্রেয়।
এক. খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকা অর্জনে সহায়ক প্রধান ফসল উৎপাদন শক্তিশালী করতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া কৃষিপণ্য রপ্তানি ও কৃষকের আয় বৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। কিন্তু কোন অঞ্চলে সে কথা বলা নেই। এটাই হবে দুই দলিলের বিভ্রান্তির বিষয়।
দুই. ফসল উৎপাদনের নিবিড়তা (Cropping intensity), বিশেষ করে পতিত জমি চাষ করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। পতিত জমি কি বাংলাদেশে খুব একটা আছে? কিছু হয়তো আছে সিলেট ও দক্ষিণাঞ্চলে। তবে সিলেটে ভূগর্ভস্থ সেচ সম্ভব নয়। দক্ষিণাঞ্চলেও একই অবস্থা। যা বলা উচিত ছিল তা হলো, অঞ্চল উপযোগী বীজ ও সেচ ব্যবহার সম্প্রসারণ। এখানে কোনো অঞ্চলের উল্লেখ নেই। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন একফসলি জমিকে দুইফসলি এবং দুইফসলি জমিকে তিনফসলি জমিতে রূপান্তর করার উপযুক্ত পদক্ষেপ। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ ক্ষেত্রে কৌশলের জন্য অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিন. খাদ্যভিত্তিক পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষি বহুমুখীকরণের কথা বলা হয়েছে। এ প্রচেষ্টা অবশ্যই সঠিক হবে। কিন্তু অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এ বিষয়টি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উল্লেখ নেই। কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণের বিষয়ও এতে উল্লেখ নেই। এখানেই অস্পষ্টতা।
চার. এ অংশে সরকার কর্তৃক কৃষি উপকরণ সরবরাহ পরিবীক্ষণের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ইত্যাদি। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, যথা_ডিএই, বিএডিসি ও অন্যান্য সংস্থার উল্লেখ রয়েছে। অন্য সংস্থাগুলো কী? বাস্তবে অন্যান্য সংস্থা বেসরকারি খাত। সার সরবরাহের ক্ষেত্রে বৃহত্তম ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন বা সংক্ষেপে বিএফএ। বিএফএ সব ধরনের সারের ৯০ শতাংশ সরবরাহ করে, তবে ইউরিয়ার ক্ষেত্রে মূল সরবরাহকারী বিসিআইসি, যার কোনো উল্লেখ নেই। মোট সারের মাত্র ১০ শতাংশ বিএডিসি সরবরাহ করে, তাও বেসরকারি ডিলারদের মাধ্যমে।
পাঁচ. কিছু নির্বাচিত ফসলের জন্য সহনীয় সুদে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠান দেবে, তার কোনো উল্লেখ নেই। নির্বাচিত ফসল কী কী, তারও কোনো উল্লেখ নেই।
ছয়. এ অংশেও বলা হয়েছে কৃষিঋণের কথা, যার মধ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক প্রাধান্য পাবে। এ তো নতুন কিছু নয়।
সাত. এ অংশে কৃষিঋণ ফাউন্ডেশন পিকেএসএফের আদলে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এ অংশের সার্বিক ত্রুটি বেশ কয়েকটি। এক. সার, বীজ ও সেচ ব্যবহারের বিষয়ে দক্ষতা ও ব্যয় সংকোচন নীতির কোনো উল্লেখ নেই। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ বিষয় ইতিমধ্যে উদ্ভাবিত ও ব্যবহৃত প্রযুক্তির কথা বলা আছে। যেমন_ সারের ক্ষেত্রে গুটি ইউরিয়ার অধিকতর ব্যবহার এবং অ-ইউরিয়া সার ব্যবহার উৎসাহিত করা, যাতে অপচয় রোধ, ব্যয় হ্রাস ও সুষম সার ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। সেচের বিষয়ে একই দলিলে পর্যায়ক্রমে পানি ব্যবহার(AWD) করার কথা বলা হয়েছে। দুই. বীজের বিষয়ে ইতিমধ্যে কম সময়ে অথচ অধিক ফলনের জন্য কোনো উল্লেখ নেই। বীজের অংশটি খসড়া কৃষিনীতিতে পৃথকভাবে বলা হলেও সার ও সেচের বিষয়ে কিছুই বলা নেই। যে পৃথক অংশে বীজের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণমূলক। অথচ বীজ উৎপাদন ও বিতরণে বৃহত্তম অংশীদার বেসরকারি খাত।
খসড়া কৃষিনীতি অবশ্য জনগণের মতামত গ্রহণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে রাখা হয়েছে। এই নিবন্ধে যেসব কথা বলা হলো, তার বাইরেও আরো কিছু বিষয়ে হয়তো আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইট ব্যবহারে মতামত প্রদান করবে। সার্বিক দৃষ্টিকোণে বিচার করলে বলা যায়, খসড়া নীতি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা প্রয়োজন।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

No comments

Powered by Blogger.