যেভাবে কূটনৈতিক চালে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি করাল কাতার
বহুপক্ষীয় এই মধ্যস্থতায় প্রথম থেকে ধারাবাহিক ও স্পষ্ট নেতৃত্ব দিয়েছে পাকিস্তান। তারা তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিশরকে নিয়ে একটি কূটনৈতিক ফ্রন্ট গঠন করে। তবে এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান মূলত কাতারের অনুসৃত নীতিই ব্যবহার করেছে। কাতার দুই পক্ষের সঙ্গেই তার অনন্য সম্পর্ক ও যোগাযোগের মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে একটি কার্যকর সংযোগকারী হিসেবে কাজ করেছে।
কাতারের বাস্তবসম্মত উদ্যোগ
গত এক সপ্তাহে কাতারি প্রতিনিধিদল দুইবার তেহরান সফর করেছে। সেখানে গত রোববার টানা ১৭ ঘণ্টার তীব্র আলোচনার পর এই চুক্তি চূড়ান্ত রূপ পায়। চলতি সপ্তাহেও দোহায় পরবর্তী আলোচনার সূচি রয়েছে। বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাতারের ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হলেও এই চুক্তিতে তাদের সম্পৃক্ততা অনেক পর্যবেক্ষককে অবাক করেছে।
বর্তমান যুদ্ধের আগে ওমান এবং কাতার যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনার আয়োজন করেছিল। তখন ওমান সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করলেও কাতার মূলত দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের কাজ করত। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর একযোগে হামলা চালালে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
ক্ষয়ক্ষতি ও অবস্থান পরিবর্তন
যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরীয় দেশগুলো অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই সংঘাতের সামনে চলে আসে। কাতার এতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। ইরানি হামলায় দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যায়, যা পুনরুদ্ধার করতে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
দিনের পর দিন ইরানি হামলার মুখে গত ২৪ মার্চ কাতার আনুষ্ঠানিকভাবে এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। তারা তখন ইরানের হামলার মুখে নিজেদের সুরক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়।
কূটনীতিতে ফেরা
গত ৮ এপ্রিল স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি সাম্প্রতিক সপ্তাহে ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হলে কাতার আবারও আলোচনায় ফিরে আসে। মে মাসের শেষের দিকে একটি ইরানি প্রতিনিধিদল দোহা সফর করে। পাকিস্তান মূল প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে থাকলেও কাতার আগের মতোই দুই পক্ষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের (শাটল ডিপ্লোম্যাসি) কাজ শুরু করে।
নিজেদের সম্পদ ধ্বংস হওয়ার পরও কাতারের আবারও আলোচনায় ফিরে আসা সমালোচকদের জন্য একটি বড় বার্তা। অনেকে চেয়েছিলেন কাতার ইরানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে সামরিক পথ বেছে নিক। কিন্তু মাসব্যাপী যুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো চূড়ান্ত ক্ষতি করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে ছোট উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক শক্তি বৃদ্ধি কোনো কাজে আসত না।
কাতারের জন্য সবসময়ই কূটনীতি ও মধ্যস্থতা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী তাস। যুদ্ধের বিশাল খরচ ও মানবিক বিপর্যয়ের তুলনায় কূটনৈতিক পদক্ষেপের খরচ একেবারেই সামান্য। কাতার যদি ইরানের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করত, তবে তারা মধ্যস্থতাকারীর যোগ্যতা হারাত। একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে কাতারের জন্য এই কূটনীতি কোনো অসহায়ত্ব ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
![]() |
| ১৬ জুন ফ্রান্সে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স |

No comments