চিকিৎসা আছে, তবু রোগটি গোপন রেখে যন্ত্রণায় ভোগেন মায়েরা by মানসুরা হোসাইন

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে নিজের শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মর্জিনা বেগম। বসতে রাজি নন তিনি। মুখে অস্বস্তির ছাপ। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, ‘এখন বসন যাইব না, এই জায়গা তো ভিইজ্যা যাইব।’

মর্জিনার বয়স প্রায় ৬০। ২০ বছর ধরে তাঁর অনবরত প্রস্রাব ঝরছে। এ কারণে কোথাও যাওয়া, মানুষের পাশে বসা তিনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন।

বাড়িতে সন্তান জন্ম দিতে গিয়েই এই স্বাস্থ্যগত জটিলতার মধ্যে পড়েন মর্জিনা। তখন তিনি তাঁর প্রথম সন্তান হারান। একই সঙ্গে হারান স্বাভাবিক জীবনও।

লজ্জা, অপমান আর একাকিত্ব নিয়ে বছরের পর বছর মর্জিনার মতো প্রায় ঘরবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন দেশের অসংখ্য নারী। তাঁদের এই নীরব যন্ত্রণার নাম—প্রসবজনিত ফিস্টুলা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে গত ১৩ মে কথা হয় খাগড়াছড়ির মর্জিনার সঙ্গে। তিনি বলেন, সব সময় ন্যাকড়া পরা ঝামেলার। অনেক চুলকায়। আবার বারবার কাপড় ধুতে হয়। এই সমস্যার কারণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ার ভয়ে মানুষের বাড়িতে যান না। কারও পাশে বসেন না।

ফিস্টুলা সেন্টারে আসার পর ডায়াপার পেয়েছেন মর্জিনা। এতে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে তাঁর। তবে দীর্ঘক্ষণ ডায়াপার না পাল্টানোয় সেটিও ভিজে গিয়েছিল। এখন তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় আছেন।

ফিস্টুলা সেন্টারে ভোলার ৩৫ বছর বয়সী কুলসুম বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তাঁর বিয়ে হয়েছিল ১৬ বছর বয়সে। তৃতীয় সন্তানের জন্মের পর থেকে তিনি মল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। মূত্রনালি দিয়ে মল চলে আসে। গত সাড়ে ছয় বছর ধরে তিনি এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন।

কুলসুম বলেন, ‘কারও সঙ্গে মিশতে পারি না। পায়খানা ধরলে দৌড়ে যেতে হয়।’

তবে এই কঠিন সময়েও স্বামী ছেড়ে যাননি—এ কথা বলতে গিয়ে কুলসুমের চোখ ভিজে ওঠে।

সিরাজগঞ্জের বিলকিস বেগম বাড়িতে প্রসব করতে জটিলতায় পড়েন। তাঁর সন্তানটি মারা যায়। তখন থেকে তিনি প্রসবজনিত ফিস্টুলায় ভুগছেন। তাঁর স্বামী তাঁকে তালাক না দিলেও আরেকটি বিয়ে করেছেন। এখন এক ছেলে তাঁর দেখাশোনা করেন।

মর্জিনা, কুলসুম, বিলকিস—সবার জীবনই কাটছে এই প্রসবজনিত ফিস্টুলার ভয়াবহ যন্ত্রণা নিয়ে। নিরাপদ প্রসবসেবা না পাওয়ার খেসারত দিচ্ছেন তাঁরা বছরের পর বছর।

প্রসবজনিত ফিস্টুলা কী?

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও ফিস্টুলা সার্জন বিলকিস বেগম চৌধুরী বলেন, তলপেট ও কোমরের নিচের হাড়গুলোকে একত্রে শ্রোণিচক্র বা পেলভিস বলে। প্রসূতির শ্রোণিচক্র তুলনামূলক ছোট হলে বা গর্ভের শিশুর মাথা বড় হলে প্রসবপথে শিশুর বের হতে বাধা সৃষ্টি হয়, যাকে বাধাগ্রস্ত প্রসব বলা হয়। বাধাগ্রস্ত প্রসবের কারণে দীর্ঘ সময় শিশুর মাথা প্রসবপথে আটকে থাকলে আশপাশের নরম টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে সেই অংশে পচন ধরে। কয়েক দিনের মধ্যে টিস্যু খসে পড়ে। যোনিপথের সঙ্গে মূত্রাশয় বা মলদ্বারের অস্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয়। এতে অনবরত মল বা মূত্র বা উভয়ই বের হতে থাকে। এ অবস্থাই হলো প্রসবজনিত ফিস্টুলা।

চিকিৎসকেরা বলছেন, সঠিক সময়ে চিকিৎসার আওতায় এলে প্রসবজনিত ফিস্টুলা পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু নিরাপদ প্রসবসেবা না পাওয়ার কারণে এখনো বহু নারী ফিস্টুলার ভুক্তভোগী।

হাজারো নারী যন্ত্রণায়

দেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নিয়ে কোনো স্বতন্ত্র জাতীয় জরিপ হয়নি। তবে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশসহ ৫৫টি দেশে একটি বৈশ্বিক গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ৩৫ জন প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত। এ হিসাবে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার ৩৩।

২০২২ সালে ‘বাংলাদেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলা: ক্লিনিক্যাল যাচাইকরণভিত্তিক সংশোধনসহ একটি জাতীয় জরিপের প্রাক্কলন’শীর্ষক গবেষণা ‘দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ’–এ প্রকাশিত হয়। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ১৭ হাজার ৪৫৭ জন নারী প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত।

গবেষণাগুলো বলছে, ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীদের একটি বড় অংশ বহু বছর চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় থাকে। অনেকের বয়স ৫০ বা ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁরা এখনো এই যন্ত্রণা বহন করে চলেছেন। ভুক্তভোগী নারীর প্রায় ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে নবজাতক মৃত অবস্থায় জন্ম নেয়।

ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারের প্রধান অধ্যাপক মুনা সালিমা জাহান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীর সংখ্যাটা হয়তো কম। তবে আক্রান্ত কোনো কোনো নারী ৩০ বছর ধরে যন্ত্রণা ভোগ করছেন। কাপড় বা ন্যাকড়া পরতে পরতে সংক্রমণ হচ্ছে। মূত্রপথে ঘায়ের মতো হয়ে যাচ্ছে।

মুনা সালিমা জাহান আরও বলেন, আক্রান্ত নারীর শরীর থেকে সারাক্ষণ মলমূত্রের গন্ধ, স্বামীর পরিত্যাগ, পরিবারের অবহেলা, প্রসবের সময় সন্তান হারানোর বেদনা—সব মিলিয়ে এই সব নারী এক কঠিন ও দুর্বিষহ জীবন পার করছেন।

লজ্জা ও গোপনীয়তার দেয়াল

প্রসবজনিত ফিস্টুলাকে বৈশ্বিকভাবে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীকে সুস্থ করে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো, রোগটি লুকিয়ে রাখা।

খাগড়াছড়ির মর্জিনার ছেলে আবদুল হালিম বলেন, তাঁর মা এই স্বাস্থ্য সমস্যার বিষয়টি সব সময় গোপন রাখার চেষ্টা করেছেন। এ কারণে এত দিন তাঁর চিকিৎসা হয়নি। সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী তাঁর মাকে খুঁজে বের করেন। এখন তাঁকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে।

ইউএনএফপিএর মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট চিকিৎসক অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ফিস্টুলা রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে পারলে রোগের নিরাময় সম্ভব।

এই চিকিৎসক বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় ও ইউএনএফপিএর সহায়তায় বাংলাদেশের ৩৫টি জেলা হাসপাতালে ‘ফিস্টুলা কর্নার’ চালু আছে। ফিস্টুলার উপসর্গ থাকা রোগীদের সেখানে বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠান মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা। রোগ নিশ্চিত হলে উন্নত চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারসহ সরকারি-বেসরকারি ২০টি ফিস্টুলা সেন্টারে পাঠানো হয়। রোগীদের যাতায়াত, পুনর্বাসনেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে প্রসবজনিত ফিস্টুলা রোগীদের চিকিৎসার জন্য ১৬টি শয্যা নির্ধারিত আছে বলে জানান অনিমেষ বিশ্বাস। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে ১১৬ জন মিডওয়াইফ নিয়োগ দিয়েছে ইউএনএফপিএ।

বাল্যবিবাহ ও বাড়িতে প্রসবের খেসারত

চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধে বাড়িতে প্রসব কমিয়ে নিরাপদ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু দেশে এখনো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রসব বাড়িতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী থাকেন না।

২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩’ অনুযায়ী, এখনো বাড়িতে প্রসবের হার প্রায় ৩৩ শতাংশ। বড় একটা অংশের প্রসব অদক্ষ দাইয়ের হাতে হয়ে থাকে। চার বা ততোধিক প্রসবপূর্ব সেবা নেওয়ার হার মাত্র ৩৯ শতাংশ। প্রতি এক হাজার জীবিত নবজাতকের মধ্যে ২০ জন মারা যায়। প্রতি ১ লাখ জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ১৩৬ জন মা মারা যান।

একই বছরে পিএলওএস গ্লোবাল পাবলিক হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ৫৩ দশমিক ১৮ শতাংশ প্রসব কোনো দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধান ছাড়াই বাড়িতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহেরও দায় রয়েছে।

দেশে প্রতি দুজন মেয়ের মধ্যে একজন বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। বিবিএস ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫–শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদন বলছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়েছে ৪৭ শতাংশের। ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৫৬ শতাংশ। কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার হার প্রতি হাজারে ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২ হয়েছে।

জাতীয় প্রসূতি ফিস্টুলা বার্ষিক প্রতিবেদনের (২০১৯-২০২৪) তথ্য বলছে, এই সময়ে শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৮৫ শতাংশই বাল্যবিবাহের শিকার ছিল। ৮৮ শতাংশের প্রথম সন্তান জন্ম হয়েছিল কিশোরী বয়সে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় অর্ধেকের শেষ প্রসব হয়েছিল বাড়িতে। আর ৪৮ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রসবে সহায়তা করেছিলেন অদক্ষ দাই বা স্বজনেরা। ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কুসংস্কার বা সনাতন বিশ্বাস হাসপাতালে না যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল। ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রসবের সঙ্গে সঙ্গেই ফিস্টুলা হয়েছে। আক্রান্ত নারীদের অধিকাংশই দীর্ঘ সময় চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় এই যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। ২৩ শতাংশ নারী ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিস্টুলায় ভুগছিলেন।

চিকিৎসায় সাফল্য ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূলের বৈশ্বিক উদ্যোগে যুক্ত হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ফিস্টুলামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউএনএফপিএ, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও সুইডিশ সিডার সহায়তায় সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে।

সরকারের তৃতীয় জাতীয় কৌশলপত্রে (২০২৩-২০৩০) প্রসবজনিত ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীর সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা এবং সব আক্রান্তকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রতিরোধ কার্যক্রম সম্প্রসারণ, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদার, তৃণমূল পর্যায়ে মিডওয়াইফ নিয়োগ, জেলা হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা জরুরি প্রসূতি ও অস্ত্রোপচার সেবা নিশ্চিত করাসহ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ৩ হাজার ৮০৭ জন ফিস্টুলা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এই সময় ৩ হাজার ২৭ জনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৭৯৫ জন সুস্থ হয়েছেন। অস্ত্রোপচারে সাফল্যের হার ৯২ শতাংশের বেশি।

অন্যদিকে জাতীয় ফিস্টুলা সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এখানে (সেন্টার) ৩৬৬টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। এর মধ্যে ৩০৭ জন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। ১৬ জন আংশিক সুস্থ হয়েছেন। রোগীদের হাসপাতালে অবস্থানের গড় সময় ছিল ৫০ দিন।

‘কোনো মা যেন এই ভুল না করে’

চিকিৎসা শেষে স্বাভাবিক জীবন পেয়েছেন শেরপুরের জুলেখা বেগম। গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় শেরপুরে জুলেখার বাড়িতে বসে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, বাড়িতে প্রসব করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন তিনি। অদক্ষ দাইয়ের টানাহেঁচড়ায় নবজাতকের মাথা আটকে গিয়েছিল। এরপর শুরু হয় অনবরত মলমূত্র ঝরার যন্ত্রণা।

সন্তান জন্মের পর সাত মাসের বেশি সময় ফিস্টুলার যন্ত্রণা সহ্য করেন ২৬ বছর বয়সী জুলেখা। মলমূত্র ধরে রাখতে না পারায় দিনে কয়েকবার তাঁকে গোসল করতে হতো। এই সমস্যার কারণে কখনো কখনো গভীর রাতেও গোসল করতে বাধ্য হতেন তিনি। মানুষ ভয় দেখাত, স্বামী তাঁকে তালাক দেবেন বা দ্বিতীয় বিয়ে করবেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তেমনটা ঘটেনি।

জুলেখা বলেন, তাঁর মেয়ের জন্ম হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবেই হয়েছিল। ছেলের জন্মের সময় ভেবেছিলেন, বাড়িতে প্রসবে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। এই ভুলের খেসারত তাঁকে দিতে হয়। তিনি ফিস্টুলায় আক্রান্ত হন।

জুলেখা আরও বলেন, ‘লজ্জায় কারও বাড়িতেও যেতাম না। শুধু কাঁদতাম। আমি যে ভোগা ভুগছি, আর কোনো মা যেন এই ভুল না করে।’

স্থানীয় এক স্বাস্থ্যকর্মীর (‘শারমীনা আপা’) মাধ্যমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিস্টুলা সেন্টারের খোঁজ পান জুলেখা। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর এক মাস চিকিৎসা নিয়ে এখন তিনি সুস্থ। পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় তিনি একটি ছাগল পেয়েছেন।

ইউএনএফপিএর সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) গত বছর থেকে শেরপুরে ফিস্টুলা প্রতিরোধ ও রোগী শনাক্তকরণে কাজ করছে।

শেরপুরের সিভিল সার্জন মুহাম্মদ শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, গত এক বছরে জেলার নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতি উপজেলায় ৩১ জন ফিস্টুলা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে ২২ জন চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। ১৭ জনকে সেলাই মেশিন ও ছাগল দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে নালিতাবাড়ীকে ফিস্টুলামুক্ত উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি মাসের সভার আলোচ্যসূচিতে ফিস্টুলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অনেকটা সুস্থ জামেনা-জোমেলা

শেরপুরের দুই বোন জামেনা ও জোমেলা দীর্ঘদিন ফিস্টুলায় আক্রান্ত ছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর এখন তাঁরা উভয়ে অনেকটা সুস্থ।

জামেনা বলেন, প্রস্রাব আটকে রাখতে পারতেন না বলে একসময় তাঁকে সবাই বিদ্রূপ করত। তবে এখন প্রায় স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছেন।

জোমেলা ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিস্টুলার যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। তিনি বলেন, সারাক্ষণ প্রস্রাব ঝরার কারণে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ পেলেও বারবার চাকরি হারাতে হয়েছে। তাঁর প্রথম সন্তান মৃত জন্ম নেয়। পরে যমজসহ আট সন্তানের জন্ম দিলেও বেঁচে আছে দুজন।

জুলেখার মতো এই দুই বোনও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন ‘শারমীনা আপা’–কে। তিনি সিআইপিআরবির জেলা সমন্বয়কারী (ফিস্টুলা) শারমীনা পারভীন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীদের খুঁজে বের করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, হাসপাতালে পাঠানোর কাজ চলছে।

বাড়ছে সচেতনতা

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে দেখা হয় ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মেহের বানুর সঙ্গে। ভাতিজা সাইফুল ইসলামের বাড়িতে তিনি থাকেন।

সাইফুল বলেন, তাঁর ফুফুর বিয়ে হয়েছিল ছোটবেলায়। প্রথম সন্তানের জন্মের পর থেকেই তিনি ফিস্টুলায় ভুগছেন। ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে তাঁর অস্ত্রোপচার হয়। তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি।

ফিস্টুলা নিয়ে এখন মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে বলে মনে করেন সাইফুল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর প্রথম সন্তানের জন্ম বাড়িতে হয়। জন্মের পর নবজাতক মারা যায়। এর পরে তাঁর দুই সন্তান হয়। উভয় ক্ষেত্রে প্রসবের জন্য তিনি তাঁর স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।

খাগড়াছড়ির মর্জিনার ছেলে আবদুল হালিমও বলেন, মায়ের দীর্ঘদিনের কষ্ট দেখে তিনি সচেতন হয়ে যান। এই সচেতনতা থেকেই তিনি তাঁর স্ত্রী ও বোনকে প্রসবের সময় হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।

জুলেখা, জামেনা, জোমেলা, মেহের বানুরা জানালেন, অনিরাপদ প্রসবের কারণে নিজেদের দুর্বিষহ ভোগান্তির কথা তাঁরা নিজেদের চেনা-জানা প্রসূতিদের বলছেন। সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

No comments

Powered by Blogger.