মুক্তির শেষ রণাঙ্গনে বাঙালী জাতি by মাসুদা ভাট্টি

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই রায়, যা বাংলাদেশকে করল কলঙ্কমুক্ত। একটি জাতির জন্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পুরো জন্ম প্রক্রিয়াকে হত্যা, নির্যাতন আর ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের মাধ্যমে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে যারা অভিযুক্ত, তাদেরই একজনের বিচারের রায় হলো গত ২১ জানুয়ারি।
এই যুদ্ধাপরাধীর নাম মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার। সে অর্থে এই দিনটি বাঙালী জাতির জীবনে একটি অন্যতম প্রধান দিন, ইতিহাসের নতুন শুভারম্ভ। ইতিহাসের এই নতুন পথচলাকে যাঁরা স্বাগত জানাতে পারবেন না, তাঁরা বিস্মৃত হবেনÑ একথা আমার কলামে আমি বহুবার উল্লেখ করেছি। নতুন করে বলার কথা তা নয়; নতুন করে যা বলতে চাই, তাহলো, যে রায় এসেছে সে রায়ের আলোকে জাতি যে নতুন পথে ও মাত্রায় অভিষিক্ত হলো, তার গুরুত্ব বুঝতে না পারাটাও হবে এক ধরনের মূর্র্খামি এবং তার বিরোধিতা করাটা হবে অনাধুনিকতা। সুখের কথা এই যে, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারী দল আওয়ামী লীগ বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে এবং সে অনুযায়ী কাজ করছে। বোধকরি জন্মলগ্ন থেকেই এই দলটি এই আধুনিকতার চর্চা করে আসছে এবং যখনই এর থেকে খানিকটা বিচ্যুত হয়েছে, জনগণই দলটিকে তাচ্ছিল্য দেখিয়েছে এবং চাপের মুখে হলেও ফিরিয়ে এনেছে পথে। উল্লেখ করার মতো উদাহরণ হিসেবে আমরা ফতোয়া চুক্তির কথা বলতে পারি।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সব দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব প্রাপ্তির দাবি রাখে, এমনটি বলার কোনই কারণ নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রেই দলটির ত্রুটি-বিচ্যুতি বাঙালী জাতির জন্য বহু ক্লেশের কারণ হয়েছে অতীতে। কিন্তু দলটির প্রশংসায় যে কথা বলা জরুরী বলে মনে করি, তাহলো একেবারে শুরু থেকেই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করেনি। যে ভুল আমরা দেখেছি দেশের বাম রাজনৈতিক শিবিরে। শুধু দেশের কথা বলছি কেন, উপমহাদেশের বাম রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের অতীব প্রয়োজনীয় মুহূর্তে এমন সব হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে কিংবা নিস্তেজ থেকেছে যে, ক্রমশ তারা মানুষের মন থেকে দূরে সরে গিয়েছে। যার ফলে এ দেশে বুর্জোয়া রাজনীতি পথ করে নিয়েছে অনায়াসে। আওয়ামী লীগ একটি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল, এ কথা সকলেই স্বীকার করবেন। কিন্তু কোথায় যেন দলটির ভেতর তির তির করে বয়ে যায় একটি সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা। এর কারণ হয়ত এটাই যে, এই দলটিতে বার বারই সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসীদের অবস্থান নেয়ার সুযোগ ছিল এবং এই সুযোগে দলত্যাগী বামেরা এখানে এসে নিজেদের অবস্থানকে দৃঢ় করার সুযোগ লাভ করেছেন। যেমনটি এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, আওয়ামী লীগের ভেতর সাবেক বাম রাজনীতিকদের অবস্থান সত্যিকার অর্থেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সুদৃঢ়। কিন্তু অন্য অনেক দলের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে, একদা বামপন্থী কিন্তু দলত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গেই তার মুঠো থেকে বেরিয়ে আসছে ভোগবাদের ধারালো নখ, বিকশিত হচ্ছে আগ্রাসনবাদের ভয়াল দাঁত। তারা নিজেদেরকে দলের পুরনো ভোগবাদীদের চেয়ে আরও শক্তিশালী প্রমাণের জন্য এমনভাবে ধর্মবাদী চেতনায় বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন যে, অতীতে তারা কখনও যে বাম রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন, এমনটি কেউ যেন আর মনে রাখে, তার সকল ব্যবস্থাই তারা নিশ্চিত করেছেন। আওয়ামী লীগ এখানে বিস্ময়করভাবে ব্যতিক্রম থাকতে পেরেছে। এটাই বোধ করি, দলটির এতদিন পর্যন্ত টিকে থাকার অন্যতম মূল কারণ।
একথা এ জন্য বলছি যে, বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িত দলগুলো সংশ্লিষ্ট দেশটি স্বাধীনতা লাভের পর পরই, বিশেষ করে প্রথম কিংবা দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পর পরই স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দলগুলো হয় ক্রমশ প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে কিংবা জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছে। হাতের কাছে উদাহরণ হিসেবে কংগ্রেসের কথা বলা যেতে পারে। কংগ্রেস আর কোনভাবেই সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল নয়। ভারতে আর কোনদিনই হয়ত একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কোন রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে না। হতে পারে ভারত বিশাল এবং এর বৈচিত্র্যও ব্যাপক। কিন্তু অনেক দেশেই বিপ্লোত্তর সমাজে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া দলের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম, সন্দেহ নেই। ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে বিজয় বাঙালী অর্জন করেছে যে কোন মাত্রা বিচারেই তার তুলনীয় কিছু নয়, ভবিষ্যতেও আসবে না। সে বিচারে আওয়ামী লীগ জাতির ‘হিরো’; কিন্তু ‘হিরো’কে ‘জিরো’ করার ইতিহাসও কম নেই আমাদের সামনে। বাংলাদেশেও এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে এবং তাকে সপরিবারে হত্যা করে বিজয়োল্লাসে মেতেছিল একদল বাংলাদেশবিরোধী মানুষ। আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন হতেই পারত তখন, হয়নি, কারণ মানুষ আওয়ামী লীগের বিকল্প কিছু পায়নি, যারা আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে তারা এই দলটির বিকল্প কিছু দাঁড় করাতে পারেনি। পারার কথাও নয়, কারণ, এই ছোট্ট ভূখ-ের মানুষের কাছে আওয়ামী লীগ ‘ভাত’-এর মতো, আমাদের প্রধান খাদ্য যেমন ভাত, আর ভাতের সঙ্গে আমরা যেমন অন্য কিছু খাই, কিংবা ভাতের অভাব হলে আমরা রুটি খাই, তেমনই রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ হয়েছে ‘ভাত’ আর যখন এর অভাব পড়ে বা পরিকল্পিতভাবে একে সরিয়ে দেয়া হয় তখন মানুষ অন্যকিছুর দিকে ঝোঁকে। নইলে ৭৫-এর পরে যে আওয়ামী লীগের দাঁড়ানোর কথা ছিল না, সেই আওয়ামী লীগই কেবল ঘুরে দাঁড়ায়নি, বরং আরও দৃঢ়তর হয়ে ফিরেছে এবং দেশের মানুষের কাছে নিজেকে আরও প্রয়োজনীয় করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। স্বাধীনতা আনার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা যে কঠিন এবং এই কঠিন কাজটিই যে আওয়ামী লীগ করে চলেছে তা বিগত দুই-তিন দশকে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। অনেকেই হয়ত বিষয়টি অস্বীকার কিংবা এড়িয়ে যেতে চাইবেন, কিন্তু তাতে সত্যকে বিকৃত বা অস্বীকার করাই হবে কেবল।
হ্যাঁ, দলটির ত্রুটি-বিচ্যুতি কিংবা ভুলের সংখ্যাও কম নয়। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর জঠরে জন্ম নেয়া রাজনৈতিক প্ল্যাটফরমের সঙ্গে ক্ষমতা যাওয়া এবং ক্ষমতায় গিয়ে ক্ষমতাকে নগ্নভাবে ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় নামতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নামও এখন ওদের কাতারভুক্ত হয়ে উচ্চারিত হতে শুরু করেছে। এটা অনেকটাই কিছু মানুষের ইচ্ছাকৃত উচ্চারণ; কারণ, তারা নিজেদেরকে ‘বিল্বপত্র’ মনে করে থাকেন, তারা দু’পক্ষের পুজোতেই কাজে আসতে চান; কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদেরকে ডাকে না বলে ‘বিল্বপত্র’ হিসেবে তাদের অবস্থান বেশ টলোমলো হয়ে পড়ে মাঝে মাঝে, সে কারণেই তারা দলটির ওপর নাখোশ থাকেন বেশিরভাগ সময়। কিন্তু আওয়ামী লীগও যে তার সাবেক জননন্দিত চরিত্রটি সম্পূর্ণ অক্ষুণœ রাখতে পেরেছে তাই-ই বা বলি কী করে? একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে তার সমর্থকগোষ্ঠীদের টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে দুর্নিিত, জায়গা দখল আর হত্যা-নির্যাতনের ঢালাও লাইসেন্স দিয়ে দেয় এবং আওয়ামী লীগ এক্ষেত্রে সাধু-সন্তের মতো ‘শাকাহারী’ আচরণ করে বিপুল সমর্থকগোষ্ঠী ধরে রাখতে সক্ষম হবে, এমনটি ভাববার কোন কারণ আছে বলে মনে করি না। কারণ, মানুষের মনোজগতের যে বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে তাতে ভোগবাদী সমাজ কিছু না পেয়েই কাউকে সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখবে কোন্্ মায়াবলে? আমরা উদাহরণ হিসেবে ছাত্রলীগের কথা বলতে পারি। আজকে আওয়ামী লীগের সমস্ত অর্জনে বিসর্জনের কালো পানি ঢেলে দিয়েছে দলটির ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। সরকারে থেকে আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনায় যে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে ঠিক একই পরিমাণ কাঁচামির উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ছাত্রলীগকে প্রশ্রয় দিয়ে। আখেরে এই প্রশ্রয় ও আশ্রয় দলটিকে কিছুই দেবে না, বরং দলটির জনপ্রিয়তার ভাঁড়াড়েই হাত বাড়াবে ছাত্রলীগের কর্মকা-Ñদলের মাথারা এই বিষয়টি বোঝেন না, তা আমি মনে করি না। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে কেন কার্পণ্য করছেন, সেখানেই সবকিছু বোধের অগম্য থেকে যায়।
যে কোন ভোগবাদী সমাজেই রাজনৈতিক দলগুলো কতটা সুযোগ-সুবিধা জনগণকে দিতে পারছে তার ওপর নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর টিকে থাকা। আজকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ ভালোর দিকে ধাবমান, নীতি-নির্ধারণী ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে পেরেছে যেমন শিক্ষানীতি ও নারীনীতি। সুশাসনের ক্ষেত্রে আরও অনেক কিছুই করার ছিল কিন্তু সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন তা সৃষ্টি করাটা বিশেষ জরুরী, শেষ ফলাফল পাওয়ার ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ সে পথে এগুচ্ছে। সমাজের বিভিন্ন সেক্টর থেকে আসা নেতৃত্ব আর সমর্থকগোষ্ঠীসমৃদ্ধ একটি রাজনৈতিক দল রাতারাতি নিজেদের লোভ-লালসা বর্জন করে গান্ধীবাদী হয়ে উঠবে, এমনটি আশা করা বোধ করি অনুচিত হবে, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধেও আজকে যেসব অভিযোগ-অনুযোগ, সেসব এই নিরিখে মাপলে আমরা খানিকটা ছাড় দলটিকে দিতেই পারি। এখানে অনেক তুলনা টেনে বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করা যেত কিন্তু সেদিকে না যাই। বরং আজকে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সে কথা দিয়েই শেষ করি। ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং এই নেতৃত্বে যুদ্ধ করতে গিয়েই লাখ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছে, আওয়ামী লীগের যুদ্ধ-আহ্বানে অংশ নিয়েই মানুষ শিকার হয়েছে নির্যাতনের, লুটপাটের, অগ্নিসংযোগের, ধর্ষণের। সুতরাং ঐতিহাসিকভাবেই আওয়ামী লীগের ওপরই এই মানবতাবিরোধীদের বিচারের আওতায় আনার দায়িত্বটি বর্তায়। আজকে আনন্দ লাগছে এই ভেবে যে, দলটি সেই দায়িত্ববোধ থেকে সরেনি, ভুলে যায়নি বাঙালী জাতির কাছে দেয়া তাদের প্রতিশ্রুতির কথাও। মুক্তির সংগ্রামের শেষ রণাঙ্গনে এনে হাজির করেছে আওয়ামী লীগ আমাদের। আজ যে রায় জাতি পেতে যাচ্ছে তা আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে এবং ভবিষ্যতে এই দলটির প্রয়োজনীয়তাকেই কেবল তীব্রতর করবে- সন্দেহ নেই।
লেখক : সম্পাদক, একপক্ষ
সধংঁফধ.নযধঃঃর@মসধরষ.পড়স

No comments

Powered by Blogger.