রাজধানীতে শিক্ষকদের মহা অবস্থান ধর্মঘট-আন্দোলন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতঃ শিক্ষামন্ত্রী

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা বাড়ানোর সরকারি ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে রাজধানীতে শিক্ষকদের মহা-অবস্থান ধর্মঘট চলছে।
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভূঁইয়া। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে সরকারের নীতি-কর্মসূচির সমর্থক সংগঠনগুলোও গতকাল সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। আজ জেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হবে। ২৬ জানুয়ারি সরকার সমর্থক শিক্ষক-কর্মচারী পরিষদ পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য প্রতিনিধি সম্মেলন ডেকেছে। ২৭ জানুয়ারি প্রবীণ শিক্ষক নেতা কাজী ফারুক আহমদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্ট সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার জন্য। শিক্ষকদের সব সংগঠনই সরকারি সুবিধার ঘোষণা প্রত্যাখ্যান এবং শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যকে অসম্মানজনক-অমর্যাদাকর আখ্যায়িত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

এ দিকে গতকাল  শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আবারো দাবি করেন, ঘোষিত সুবিধায় শিক্ষকেরা খুশি হয়েছেন এবং তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে কোন কোন সংগঠন অভিনন্দন জানিয়েছে তা বলেননি মন্ত্রী। এ ছাড়া মন্ত্রী গতকাল সচিবালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের বলেছেন, চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে শিক-কর্মচারীদের আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক  উদ্দেশ্য রয়েছে।

শিক্ষকদের এই আন্দোলনকে ‘অবাস্তব’ অ্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, এর মধ্য দিয়ে বিভ্রান্তি  ছড়ানো হচ্ছে। হঠাৎ করে এসে জমায়েত হয়ে এই দাবি জানানো অবাস্তব। চাকরি জাতীয়করণের আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভূঁইয়াকে উদ্দেশ করে  মন্ত্রী বলেন, তার দলের সরকার তো ২৮ বছর ক্ষমতায় ছিল। বিষয়টি যদি এতই জরুরি মনে করা হয়ে থাকে তাহলে তার দল কেন জাতীয়করণ করেনি। মন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়ায় এমপিওভুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরাও তাদের চাকরি জাতীয়কণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন। তিনি বলেন, প্রাইমারি আর মাধ্যমিক এক নয়। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক। বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা দিতে সরকার বাধ্য।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন,  বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্যই উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটা করা হচ্ছে। তিনি শিক্ষকদের বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান।

সরকারি পলিটেকনিক কলেজের শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে রুদ্ধদ্বার আলোচনা শেষে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং করেন।

চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে লাগাতার ১২ দিন দেশব্যাপী শিক্ষক ধর্মঘট পালনের পর বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সর্ববৃহৎ শিক্ষক সংগঠন শিক-কর্মচারী ঐক্যজোট গতকাল সকাল ১০টা থেকে জাতীয় প্রেস কাবের সামনে শিক-কর্মচারী ‘মহা-অবস্থান’ কর্মসূচি শুরু করেছে। এমপিওভুক্ত ৩০ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-কারিগরি প্রতিষ্ঠান) চার লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারী প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত বলে জানিয়েছেন সরকার ও বিরোধী দল সমর্থক শিক্ষক-কর্মচারী নেতৃবৃন্দ।

সকাল ৮টার পর থেকেই শিক্ষক-কর্মচারীরা জাতীয় প্রেস কাবের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। বেলা ১১টার দিকে জাতীয় প্রেস কাবের সামনের পুরো চত্ব¡র এবং সামনের সড়ক কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর ১২টার পর থেকে সন্ধ্যা পৌনে ৭টা পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা এখানে অবস্থান করেন। শিকদের অবস্থানের কারণে শিাভবন, কদম ফোয়ারা থেকে শুরু করে  প্রেস কাবের পূর্ব এবং তোপখানা রোড পর্যন্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। যার জন্য শাহবাগ, মৎস্য ভবন, হাইকোর্ট, প্রেস কাব, পল্টনসহ আশপাশের এলাকার রাস্তায় প্রচণ্ড যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র মতিঝিল-দিলকুশাসহ আশপাশের এলাকায় দিনভর যানজট লেগেই ছিল। পুরো এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে শিক্ষকদের অবস্থান কর্মসূচির কারণে।



মহা-অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অধ্য সেলিম ভূঁইয়া বলেন, শিকদের বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা বাড়ানোর নামে শিামন্ত্রী তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। শকুন পাঁচ হাজার মাইল ওপর দিয়ে চললেও তার নজর থাকে নিচের দিকে। শিামন্ত্রীর নজরও যে নিচের দিকে তিনি তার প্রমাণ করেছেন। গত চার বছরে এ শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের জন্য কার্যত কোনো অবদান রাখেননি। তিনি বারবার বলেছেন, শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো ও শিক্ষা কমিশন গঠন করবেন। কিন্তু গত চার বছরে তিনি এর কোনো কিছুই করতে পারেননি।

মহা-অবস্থান কর্মসূচিতে শিক সমিতির সভাপতি কাজী আব্দুর রাজ্জাক, কলেজ শিক সমিতির সভাপতি প্রিন্সিপাল রেজাউল করিম, মাদরাসা শিক সমিতির মহাসচিব মাওলানা মো: দেলোয়ার হোসেন, শিক-কর্মচারী ঐক্যজোটের অতিরিক্ত মহাসচিব মো: জাকির হোসেন, জোট নেতা অধ্যাপক মো: আলমগীর হোসেন, অধ্যাপক তফাজ্জল হোসেন বাদল, অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম দেবু, এম এ ছফা চৌধুরী, শহীদুল ইসলাম, আব্দুল হাকিম, হাসিম তালুকদার, আবুল কাশেম, আব্দুর রব মিয়া, অজিত কুমার সরকার, অধ্য নিজামউদ্দিন তরফদার, শামসুল হক ফারুক, আব্দুল গণি, অধ্যাপক আবু সাঈদ, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, অধ্য মো: জাকির হোসেন, অধ্যাপক আসাদুজ্জামান আকাশ, ফজলুল হক, রাবেয়া খাতুন, আজিজুল হক রাজা, মিজানুর রহমান ও বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে আগত নেতৃবৃন্দ দিনভর বক্তব্য রাখেন।

এ দিকে সরকারের নীতি-কর্মসূচির সমর্থক শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সমন্বয়কারী রঞ্জিত কুমার সাহা গতকাল নয়া দিগন্তকে  জানান, আজ বৃহস্পতিবার দেশের সব জেলা সদরে শিক্ষকেরা বিক্ষোভ করবেন শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ও সুবিধার ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে। তিনি আরো জানান, আগামী ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় ঐক্য পরিষদের সারা দেশের শিক্ষক প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছে। ওই প্রতিনিধি সম্মেলনে এ ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

No comments

Powered by Blogger.