ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়-অনেক প্রশ্নের জবাব মেলেনি

মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রথম রায়টি ঘোষণা করেছেন। ট্রাইব্যুনাল-২-এ মাওলানা আবুল কালাম আযাদের রায় ঘোষণার পর সারা দেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে।
সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে স্বল্পতম কর্মদিবসে ফাঁসির মতো আদেশের বিষয়টি অনেকের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি। বিশ্বমিডিয়াও রায়টিকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেছে।

এ রায় ক্ষমতাসীন দলের কাছে ছিল প্রত্যাশিত। তা ছাড়া ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ যারা এই ইস্যুতে সরব ছিলেন তারা সবাই রায়টিকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখেছেন। অপর দিকে আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যর্থ একজন পলাতক বা অনুপস্থিত অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ব্যাপারটিকে অনেক আইন বিশেষজ্ঞ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন না।

মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ ট্রাইব্যুনাল আমলে নিয়ে রায়টি দিয়েছেন সেই ব্যাপারেও তার অনুপস্থিতিতে সরকার নিয়োগ দেয়া আইনজীবী কোনো আর্গুমেন্টে যাননি। তিনি রীতিসিদ্ধভাবে বলেছেন, তার মক্কেল নির্দোষ। তাই এ রায় নিয়ে বিশ্লেষণমূলক অভিমত দেয়া সহজ নয়। তা ছাড়া যারা দ্বিমত পোষণ করেছেন কিংবা রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছেন, তাদের বক্তব্য খণ্ডন করাও কঠিন।

বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধাপরাধের বিচার চেয়েছে। অথচ চিহ্নিত ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে চুক্তি করে ক্ষমার মাধ্যমে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আসল অপরাধীকে ক্ষমা করে দিয়ে তাদের সহযোগীদের অভিযুক্ত করা নিয়ে বিতর্কের অবসান এখনো হয়নি। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন বারবার দেশে-বিদেশে উঠেছে, তারও কোনো আইনি যুক্তি উপস্থাপন করে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত তুলে ধরে বলেছেন, এই আদালত আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়, আন্তর্জাতিক রীতি মেনেও করা হয়নি। আবার আন্তর্জাতিক যুদ্ধপরাধের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারপর দেশের অনেক আইন বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেনÑ এটি না আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, না ডমেস্টিক আইনের মাধ্যমে এই বিতর্ক প্রশ্নাতীত করার চেষ্টা করা হয়নি। সঙ্গত কারণেই এসব আলোচনা-সমালোচনা এই রায়কে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারল কি না তা ভেবে দেখার সুযোগ আছে।

বর্তমান সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে এই বিচারকে তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার কিংবা এজেন্ডা হিসেবে নিয়েছে। অপর দিকে প্রায় সব বিরোধী দল বিচার চেয়েছে কিন্তু এই ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এভাবে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ করে বিচারকাজ এগিয়ে নেয়ার কাজকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা ও প্রতিপক্ষ দমনের অপপ্রয়াস হিসেবে প্রতিনিয়ত মন্তব্য করেছে বিরোধী দল। স্কাইপ বিতর্কের পর বিরোধী দলের বক্তব্যের সত্যতা উড়িয়ে দেয়া কঠিন, তা ছাড়া দায় নিয়ে বিচারপতি নিজামুল হকের পদত্যাগ কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তার পরও একটি নীতিগত প্রশ্ন আমলে না নেয়ার কারণে এ রায় জনমতের ওপর কোনো প্রভাব রাখেনি। এ রায় যে জনগণের মাঝে কোনো বাড়তি চাঞ্চল্য ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি তা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রী ওয়াদা পূরণের জন্য স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। আওয়ামী লীগ ও তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মিত্ররা উল্লাস প্রকাশ করেছে কিন্তু উল্লেখযোগ্য জনগণ এর সাথে তাদের আবেগ প্রকাশের উপকরণ খুঁজে পায়নি।

আমরা মনে করি, ইতিহাসের রায় খণ্ডানো যায় না। আলোচ্য রায়ের মাধ্যমে কী অর্জিত হলো, জাতি গ্লানিমুক্ত হলো কি না, তা জানার জন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে। সময়ের আপেক্ষিকতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ ইতিহাসে অসংখ্য ঘটনায় বিজয়ীর আদালতের রায়কে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা হয়নি। যাকে খলনায়ক সাজানো হয়, ইতিহাসের নির্মোহ সাক্ষ্য তাকেই সময়ের ব্যবধানে নায়ক সাজানো হয়েছে।

আমরা জনগণের আবেগ অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়ার ব্যাপারেও নিষ্ঠাবান কিন্তু অসংখ্য প্রশ্নের সমাধান না করে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য একটা রায় কাক্সিত, এমনটি মনে করতে পারি না। জনগণের আশা ও প্রত্যাশা পূরণের জায়গা থেকেই এ রায়কে দেখা সমীচীন মনে করি।
       

No comments

Powered by Blogger.