কমিটি বিলুপ্তঃ খুনি বহিষ্কার by জসিম উদ্দিন

খুন করলে অপরাধ হয় না কোন দেশে? সাধারণ জ্ঞানের এ ধরনের একটি প্রশ্ন চালু হতে পারে। কোন দেশের প্রেসিডেন্ট খুনিদের প্রতি অত্যন্ত উদারÑ আরো একটি প্রশ্ন এর সাথে যোগ হতে পারে।
কুইজ প্রতিযোগিতায় প্রশ্নকর্তারা এখন আর সাধারণ প্রশ্ন করতে চান না। উত্তরদাতারা অনেক বেশি আপডেট। চোখের পলকে সব প্রশ্নের উত্তর ঝেড়ে দেন। জার্মানি বা ফ্রান্সের টিভি রিয়েলিটি শোগুলোর পরিচালকেরা একবার বাংলাদেশ ঘুরে গেলে এ ধরনের আরো অসম্ভব অবিশ্বাস্য সব প্রশ্ন জোগাড় করতে পারবেন। ওই প্রশ্ন পেয়ে উত্তরদাতারা লা জবাব হয়ে যাবেন। এ দেশে এসেই তারা রিয়েলিটি শোর পাশাপাশি নানা অদ্ভুত ও উদ্ভট অনুষ্ঠান তৈরির আইডিয়া পেয়ে যেতে পারেন সহজে।

বিশ্বের একমাত্র দেশ বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুলিশকে গুরুতর অপরাধীদের মার খেয়ে হজম করতে হয়। মার খাওয়া পুলিশদের অবশ্য কাঁদার ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি এখনো। তারা ঝরঝর করে অবলা নারীদের মতো কাঁদতে পারেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ এটা ক’দিন আগে চর্চা করেছে। প্রতিপক্ষ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বিরুদ্ধে কেন অস্ত্র তাক করে গুলি করছে না; এ ছিল পুলিশের অপরাধ। নির্দেশ না মানায় ছাত্রলীগ পুলিশকে বেধড়ক পেটায়। মারের চোটে পুলিশ সদস্যরা কান্নাকাটি করতে থাকে। ছাত্রলীগ নাছোড়বান্দা। তারা দয়মায়াহীন মাফ করতে যেন চায় না। মারখাওয়া পুলিশ সদস্যদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, ‘পেটের দায়ে মানুষের নিরাপত্তা দেয়ার কাজ করি। অথচ ছাত্রলীগ আমাদের বেধড়ক পিটিয়ে আহত করল এবং আমাদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে গুলি করল। আমাদেরই এখন নিরাপত্তা নেই এবং চাকরি হারানোর ভয়ে এখন আমাদের বোবাকান্না কাঁদতে হচ্ছে।’ ছাত্রলীগের নির্দেশ পুলিশকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়েছিল। ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বললাম এ কারণে যে, ছাত্রদলের সদস্যদের তারা মেরে ক্ষান্ত হয়নি। যারা পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে পাশের বাসাবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরও রক্ষা করেনি। খুঁজে খুঁজে আটক করে পিটিয়েছে। পুলিশের এ শাণিত আক্রমণ ছাত্রলীগকে হাতে কলমে শিখিয়ে দিতে হয়েছিল সেদিন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি প্রথমে পুলিশের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নেয়। সেটা তার সহযোগী সন্ত্রাসী এক ছাত্রলীগ সদস্যকে দিলে সে ছাত্রদলকে লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে। লজ্জা পেয়ে পুলিশ তখনই আঘাত হানতে শুরু করে।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশকে অত বেশি ফ্যাসাদে পড়তে হয়নি। উভয়পক্ষ এক ঘরের লোক। পার্থক্য একপক্ষ সভাপতি অন্যপক্ষ সেক্রেটারি গ্রুপ। ঘাড়ে রাইফেল নিয়ে নিরাপদ দূরত্ব থেকে গুলি বিনিময় উপভোগ করেই সেদিন দায়িত্ব সেরেছে পুলিশ। কিন্তু ঘটনাটি পত্রিকার প্রধান শিরোনাম করে দিলো আনাড়ি শুটাররা। ছোট রাব্বিকে তারা চোখে দেখেনি। নানীর সাথে ১০ বছরের শিশুটি ঝরাপাতা কুড়াতে এসেছিল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। একটি ভারী বুলেট তার মাথা ভেদ করে গেল। পুলিশের কাছ থেকে রাইফেল কেড়ে নেয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তাহলে সেই রাইফেলটি হয় সভাপতি গ্রুপের না হয় সেক্রেটারি গ্রুপের এ ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকার সুযোগ নেই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন একটি মাত্র গোষ্ঠী ‘ছাত্রলীগ’। বাকি সব পক্ষ পারজিত হয়ে ঝরে পড়েছে। ছাত্রদলকে তাড়িয়েছে, শিবিরকে তাড়িয়েছে ছাত্রলীগ। ভিসি-প্রক্টর তখন ছাত্রলীগের সাথে কাঁধ মিলিয়ে অভিযানে ছিল। পুলিশও ভাড়াটে বাহিনীর মতোই ব্যবহার হয়েছে। ইতস্তত করলে ছাত্রলীগ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুগুরনীতি প্রয়োগ করেছে। সব মিলিয়ে প্রশাসনের লোকেরা যেন ছাত্রলীগের গুডবুকে থাকার প্রতিযোগিতা করেছে। প্রক্টর-ভিসি, পুলিশ অফিসার সবাই এ প্রতিযোগিতায় ছিল। এত সহযোগিতার পরও নিয়োগবাণিজ্যে ভাগ বসাতে পারেনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি। বিজ্ঞাপিত পদের দ্বিগুণ নিয়োগ দিয়ে ছাত্রলীগের পেট ভরাতে হয়েছে তাকে। অপবাদও কপালে জুটেছে তার। নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করেও রেহাই পাননি প্রক্টররা। রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যলায়ের প্রক্টরদের ওপর যে লজ্জা ও অপমানজনক আচরণ হয়েছে তা ইতিহাস হয়ে থাকবে।

ভিসি-প্রক্টর, পুলিশ সবাই কুপোকাত। এরপরও একটা পক্ষকে সরব প্রতিবাদী হিসেবে পাওয়ার আশা হয়তো অনেকে করেছেন। যেকোনো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গরম করে দেয়ার জন্য সিদ্ধহস্ত হিসেবে বাম ছাত্রসংগঠনের খ্যাতি রয়েছে। অনেক সময় নন-ইস্যুকেও এরা ইস্যু বানিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অস্থিতিশীল করে ফায়দা লোটে। এবার তাদের সেই ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। শিশু রাব্বি যে ক্যাম্পাসে প্রাণ হারালো কিছুদিন আগে, সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বামদের তাড়িয়েছে ছাত্রলীগ। তখন ভিসি-প্রক্টর, পুলিশ সবাই এক। রাব্বি হত্যাকারীদের পক্ষে তাদের কী অটুট একতা। কয়জন ছাত্রী সাহসী হয়ে উঠেছিল। তারা হয়তো মনে করেছিল ‘নারী’ বিষয়ক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। তাদের হিসাব ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে ছাত্রলীগ। ক্যাম্পাসে এ মেয়েদের পিটিয়ে ছাতু করে দিয়েছে তারা। অচেতন অবস্থায় সেই ছাত্রীরা ক্যাম্পাসে পড়েও ছিল। সেই ঘটনাকে নারীর ওপর আক্রমণ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নারী আন্দোলনকারীরা এগিয়ে আসেনি। ঢাকার রাস্তা কাঁপানো বাঘা বাঘা নারী অধিকার কর্মীদেরও এর প্রতিবাদ করতে দেখা গেল না। তারা সম্ভবত শারীরিক মানসিক আক্রমণের ভয়ে রাস্তায় নামেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাস এখন যেন গভীর জঙ্গল। সেখানে শুধু হায়েনা আর নেকড়েদের শাসন। একটি ছাত্রসংগঠনের কাজ হবে গঠনমূলক। তারা সাধারণ ছাত্রদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরব থাকবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষাসহায়ক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। এর ধারেকাছেও তাদের দেখা যাচ্ছে না। তারা করছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, নিয়োগবাণিজ্য। তবে বিশুদ্ধ সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের সাথে তাদের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সন্ত্রাসীদের সাথে পুলিশের সম্পর্ক হয় দা-কুমড়া। পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তারা অপরাধ করে। পুলিশ নাগালের মধ্যে পেলেই তাদের পাকড়াও করে। ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে বিষয়টা উল্টো। ছাত্রলীগ পুলিশ বন্ধুসুলভ সম্পর্ক। অনেক সময় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পুলিশ তাদের সহযোগী। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা নেই। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের হুকুমের কর্মী।

একমাত্র ভরসা ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব

আওয়ামী লীগ প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোস্সা করে বহু আগে নিজের অভিভাবকত্ব প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন ছাত্রলীগের ওপর থেকে। এখন তারা এর চেয়ে বহু গুণে বেশি অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। শুধু গোস্সা করলে কি এখন হবে? দলের সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, ছাত্রলীগের কুকর্মের দায় আওয়ামী লীগ নেবে না। তাও বছর দুয়েক গড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে কত রক্ত ঝরেছে। কতজনের ইজ্জত, মানসম্মান লুট হয়েছে তার হিসাব নেই। রাজনৈতিক নেতাদের এসব কথা যে লোক দেখানো তার প্রমাণ মেলে ক্ষমতাসীনদের স্নেহমাখা বিস্ময়কর হাতখানা দেখে। যেটি আড়ালে-আবডালে সব সময় ছাত্রলীগের মাথার ওপর রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনে ছাত্রলীগের তাঁবেদারির পেছনে রহস্য অন্য কিছু নয়। এ সুযোগ নিয়েই প্রতিযোগী সব ছাত্রসংগঠনকে বিতাড়িত করেছে তারা। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিসহ সাধারণ শিক্ষকদের মারধর ও লাঞ্ছনা করতেও তারা দ্বিধাবোধ করেনি। প্রতিক্রিয়াশীল বাম ছাত্র আন্দোলনকারীরা সবাই কুপোকাত ছাত্রলীগের একই জোরের ফলে।

জাতির একমাত্র ভরসা ‘ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল’! আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদক ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর এরাই কেবল তৃণমূল ছাত্রলীগের ওপর ছড়ি ঘোরানোর ক্ষমতা রাখেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নেতা পেটানো, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যুবায়ের হত্যার পর, কৃষি বিশ্ববিদ্যলায়ে মাসুম শিশু রাব্বি হত্যার পর ছড়িটি ঘুরিয়েছেন তারা। এ ধরনের আরো অনেকবার এ ছড়িটি ঘোরাতে তাদের দেখা যাচ্ছে। তাদের মোক্ষম হাতিয়ার হচ্ছে দু’টি; ‘কমিটি বিলুপ্ত’ ও ‘বহিষ্কার’। এতে কারো কোনো অসুবিধা নেই; তবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য তৈরি হয় বাড়তি সুবিধা। পদহারানোরা সাবেক ছাত্রলীগ পরিচয়ে ভালোই থকেন। থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাচারি এগুলো তাদের মোকাবেলা করতে হয় না। কারণ জীবনে তারা একবার ছাত্রলীগ করেছেন। কিন্তু নতুন কমিটি গঠনের এক্সট্রা পাওয়ার আসে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে। এটি এমন এক ‘পাওয়ার’ যা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে ছাত্রলীগ নেতৃত্বকে ব্যবহার করতে দেখা যায়। এর ফলে নতুন একদল নেতার আবির্ভাব হয়। নতুন করে তারা সার্টিফিকেট পান ‘পদহারানোরা’ যে কাজ করছিল সেসব কাজ করতে। আর এ সুযোগ করে দেয়ার জন্য নবাগতদের কেন্দ্রীয় কমিটিকে খুশি করতে হয় আর কি।

তবে নিরুপায় হয়ে জেগে উঠেছে সেই জনতা। তারা হাজারে হাজারে এসেছে। তাদের আক্রমণ সুনির্দিষ্ট ছিল না। খুনি ছাত্রলীগ চক্রের কাউকে মারতে পারছে কি না, সে খবর পাওয়া যায়নি। স্থানীয় জনতা কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে নির্বিচারে ভাঙচুর চালিয়েছে। ছাত্রদের আসবাবপত্র পুড়িয়ে দিয়েছে। এই জনতাই আসল ভরসা হয়ে উঠবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে।

jjshim146@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.