পাবনায় বাড়ি দখল-সুচিত্রা সেনের পৈতৃক ভিটায় জামায়াতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-* স্কুলের নামে দুই যুগেরও বেশি দখলেরেখেছে জামায়াত-* '৮৭ সালে কিছু জামায়াত নেতা বাড়িটির দখল নেন by আহমেদ উল হক রানা

পাবনায় বাংলা সিনেমার জীবন্ত কিংবদন্তি সুচিত্রা সেনের বাড়িটি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে দখলে রেখে জামায়াত 'ইমাম গায্‌যালী ইনস্টিটিউট' নামে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পাবনাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাবনার জেলা প্রশাসন ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের একসনা ইজারা বাতিল করে এবং অর্পিত সম্পত্তির দখল ছেড়ে দিতে নোটিশ দেয়।


নোটিশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করা হলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। এবার তারা সুপ্রিম কোর্টে রিট করে বিষয়টি ঝুলিয়ে দেয়। বাড়িটির অবস্থান পাবনা শহরের গোপালপুর হেমসাগর লেনে। জানা যায়, সুচিত্রা সেনের বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন পাবনা পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর। এই সুবাদে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে হেমসাগর লেনে একটি একতলা বাড়িতে বসবাস করতেন। তিন মেয়ের একজন সুচিত্রা সেন ওরফে রমা ১৯৪৬-৪৭ সালে পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস নাইনে পড়ার সময় কলকাতায় চলে যান। ১৯৫১ সালে গোটা পরিবারই কলকাতায় চলে যায়। এরপর জেলা প্রশাসন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য গোপালপুর মৌজার এসএ ৯৯ খতিয়ানভুক্ত ৫৮৭ এসএ দাগের ০.২১২৫ একর আয়তনের বাড়িটি অধিগ্রহণ করে। এরপর থেকে বাড়িটিতে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা বসবাস করতে থাকেন এবং সর্বশেষ ছিলেন প্রথম শ্রেণীর একজন ম্যাজিস্ট্রেট। ১৯৮৭ সালে এরশাদ সরকারের সময় স্থানীয় কিছু জামায়াত নেতা বাড়িটি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে নথিপত্র তৈরি করিয়ে এক বছরের জন্য ইজারা নেন। অভিযোগ রয়েছে, দখলকারীরা 'ইমাম গায্‌যালী ইনস্টিটিউট' নামের একটি কিন্ডারগার্টেন গড়তে গিয়ে বাড়িটির গাছপালা উজাড় তো বটেই, অবকাঠামোর বেশ পরিবর্তন করেন।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ২২ জুন পাবনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমাম গায্‌যালী ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের একসনা ইজারা বাতিল করেন এবং ৮ জুলাই ২০০৯ সালের মধ্যে অর্পিত সম্পত্তির দখল ছেড়ে দেওয়ার জন্য নোটিশ দেন। নোটিশ পাওয়ার পর ইমাম গায্‌যালী ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা হাইকোর্টে লিজ বাতিলের বিরুদ্ধে আবেদন জানিয়ে রিট করেন।
সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের অন্যতম নেতা জাকির হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, উচ্ছেদের নোটিশের পর ট্রাস্টির লোকজন ২০১১ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে সেটি খারিজ করে দেওয়া হয়। এরপর তাঁরা গত বছরই সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
সরেজমিনে গতকাল শনিবার বাড়িটিতে গিয়ে সেখানে স্কুলের কার্যক্রম চলতে দেখা যায়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওয়াজেদ আলী জানান, তিনি শুধু লেখাপড়ার দিকটি দেখেন। প্রশাসনিকসহ সব কার্যক্রম তদারকি করেন ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্কুলের ১০ সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ডের প্রধান হচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সুবহান। অন্যান্যের মধ্যে জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আবদুর রহিম, জেলা জামায়াতের আইনবিষয়ক সেক্রেটারি আলহাজ আবিদ হাসান, জেলা জামায়াতের প্রচার সেক্রেটারি মাওলানা আবদুর রউফ, জামায়াত নেতা নুরুল ইসলাম, আবুল হোসাইনসহ মোট ১০ জনের ট্রাস্টি বোর্ড স্কুল পরিচালনা করে থাকে।
দখলের বিয়য়ে জানতে চাইলে ট্রাস্টি বোর্ডের সেক্রেটারি ও জেলা জামায়াতের প্রচার সেক্রেটারি আবিদ হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমরা তো কোনোভাবেই বাড়িটি দখল করিনি। প্রায় ২৫ বছর সরকারের নিয়ম মেনে ট্যাক্স দিয়ে সেখানে স্কুলের কার্যক্রম চালাচ্ছি।' তিনি দাবি করেন, ২০০০ সালের ১৭ আগস্ট সুচিত্রা সেনের পরিবারের সদস্যরা পাবনায় এসে স্কুলটি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে।
এ কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে পাবনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি এম সাইদুল হক চুন্নু কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কোনো স্কুল উচ্ছেদ হোক আমরা তা চাই না। এই স্কুলের অল্প দূরেই জামায়াতের 'ইমাম গায্‌যালী স্কুল অ্যান্ড কলেজ' নামের আরো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। খুব সহজেই জামায়াত এই স্কুলের কার্যক্রম ওই স্কুলের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারে। তা না করে শুধু ভবনটি দখলে রাখার জন্য সেখানে এই স্কুলটি চালানো করা হচ্ছে।'
পাবনার জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, '১৯৮৭ সাল থেকে বাড়িটি একসনা লিজে ছিল। ২০০৯ সালে লিজ বাতিল করা হয়। এরপর বাড়িটি জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের জন্য সময়ও বেঁধে দিয়েছিলাম। বর্তমানে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন থাকায় তা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কিছুই করার এখতিয়ার জেলা প্রশাসনের নেই।'

No comments

Powered by Blogger.