রাজনীতিতে তৃতীয় ধারা? by এম আবদুল হাফিজ

তৃতীয় ধারার একটি দল, জোট বা ফ্রন্ট অস্তিত্বে আসার গুঞ্জন বেশ কিছুদিন ধরেই প্রবল, যদিও সেই লক্ষ্যে উদ্যোগ শ্লথ, দুর্বল এবং অস্পষ্ট। উদ্যোগীদের মধ্যে শুধু ক্ষমতাসীন দলের বিরোধিতা ছাড়া অভিন্ন আর কিছুই নেই।


আঠারো দলীয় কর্মসূচির অংশবিশেষ অর্থাৎ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অন্তত দশম সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতি সমর্থন থাকলেও বিএনপিসহ মূলধারার উভয় প্রধান দলের রাজনীতি এবং সেই রাজনীতির ছদ্মাবরণে দেশে লুটপাট ও অপরাজনীতি অব্যাহত রাখার বিরুদ্ধাচরণে বিশ্বাসী প্রস্তাবিত নতুন ধারার কুশীলবরা। তাদের প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী আগামী বছরের প্রথম মাসেই আত্মপ্রকাশ করবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অতিরিক্ত আরেকটি রাজনৈতিক শক্তি বা সংগঠন। তবে এর রূপরেখা, আঙ্গিক ও কর্মসূচি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা ছাড়াও রাজনীতিসচেতন জনগণের মধ্যেও কৌতূহলের অন্ত নেই।
এমন একটি রাজনৈতিক ধারা বঙ্গবন্ধু ও শহীদ জিয়ার একচেটিয়াভাবে প্রভাবিত এই দেশে আদৌ ক্লিক করবে কি-না তা নিয়েও সংশয় কম নয়। তাই একবার দেখা-ই যাক না কারা আছেন এই উদ্যোগের পুরোভাগে এবং কতটা তাদের গ্রহণযোগ্যতা রাজনীতির ময়দানে। তারা কি পারবেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুঃশাসনকবলিত এই দেশে বঞ্চিত ও প্রতারিত জনগণের মধ্যে একটি আশাবাদের সঞ্চার করতে বা নতুন করে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাতে? দুধ ও মধুর সম্মিলিত প্রবাহ নয় শুধু, ১৫ কোটি আশাহত মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটাতে? এগুলোই তো সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতির অনুষঙ্গ। তারা কি পারবেন আস্থা ফিরিয়ে আনতে, যে আস্থা জনগণ অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির কারণে হারিয়েছে!
তৃতীয় ধারার অন্যতম উদ্যোক্তা ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুরই আবিষ্কার ও তার আজীবন রাজনৈতিক সহযোগী। আইনমন্ত্রী হিসেবে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তিনি আমাদের সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে একটি নাজুক সময়ে সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই আইনজ্ঞ সমগ্র বিশ্বে সুপরিচিত। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে এ দেশের প্রথাগত রাজনীতিতে তিনি ম্লান, কিছু অনাদৃত।
রাষ্ট্রপতি জিয়া ১৯৮১ সালে জেনারেল মঞ্জুরের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হতে বিএনপির জাস্টিস সাত্তার ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ড. কামালের মধ্যে একটি নির্বাচনী যুদ্ধ হয়েছিল, যাতে তিনি শোচনীয় পরাজয় বরণ করেন। এরপরও তিনি আওয়ামী লীগে রুটিনমাফিক সক্রিয় ছিলেন এবং বহুধাবিভক্ত দলটির চরম দুর্দিনে দলের পুনর্গঠনে ও শেখ হাসিনাকে দলের নেতৃত্বে আনতে ভারত থেকে তার প্রত্যাবর্তনে ভূমিকা রাখেন। অতঃপর আওয়ামী লীগের একাংশের চাপে এই খ্যাতিমান রাজনীতিক শুধু দল নয়, ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকেই অন্তর্হিত হন।
তৃতীয় ধারার বাকি উদ্যোক্তা হিসেবে যারা আলোচিত হচ্ছেন তারা দেশবাসীর কাছে কমবেশি পরিচিত। তবে এদের কেউই বিতর্কের ঊধর্ে্ব নন। এদের ডাকসাইটে একজন তো এরশাদের গৃহপালিত বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করে ওই স্বৈরশাসককে কিছুটা বৈধতাও দেন। নানা মত, পথ ও জীবনশৈলীর 'হতাশ' এই রাজনীতিকরা জীবনের শেষ সময়ে এসে নিজেদের জন্য খানিকটা প্রাসঙ্গিকতা খুঁজছেন। দল থেকে ছিটকে পড়া এই রাজনীতিকরা তাদের জীবনের বর্তমান পর্যায়ে উপনীত হয়ে উদ্ভাবনী কিছু পারবেন বলে কেউ মনে করে না। তাহলে কি তৃতীয় ধারার সৃষ্টি হবে না? দেশবাসী সত্যিকারভাবে বিশ্বাস করে যে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিকল্প প্রয়োজন। কিন্তু তা পূরণ পরীক্ষিত ও বয়োবৃদ্ধদের দ্বারা সম্ভব নয়, সম্ভব নয় তাদের বিদ্যমান সমর্থকগোষ্ঠী বা সংগঠন দিয়েও। যেটা প্রয়োজন তা হলো তৃণমূল থেকে নতুন চেতনার উদ্ভব ও তাকে অবয়ব দান, যা করা কষ্টসাধ্য। আজকের নতুন ধারার উদ্যোক্তারা একসময় তা করতে সক্ষম ছিলেন, কিন্তু এখন তাদের বয়স, উদ্যম ও উদ্দীপনা তাদের প্রতিকূলে। তাই উদ্যোগ আসতে হবে নবীনদের কাছ থেকেই, যাদের এখনও বিরাজমান রাজনৈতিক কলুষতা স্পর্শ করেনি। কিন্তু ভালো হোক বা মন্দ রাজনীতির বর্তমান ধারাকেও যারা প্রবহমান রেখেছেন তাদের অবদানকে তুচ্ছ মনে করা যাবে না।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, এক-এগারোর সময়ও এ দেশে তৃতীয় ধারা সৃষ্টির উদ্যোগে অনেকেই সাড়া দিয়ে নিরাশ হয়েছিল। প্রচণ্ডভাবে এর প্রয়োজন থাকলেও তা আয়ত্ত করার প্রক্রিয়াটি কেউ অনুধাবন করতে পারছেন না। শুধু একটি ব্যান্ড ওয়াগনে চেপে বসলেই তা অর্জিত হবে না। এখনও সেটা সত্য যে, চলমান ধারা বদলাতে তাকে আমাদের চ্যালেঞ্জ করে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়েই তা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল হাফিজ :সাবেক পরিচালক বিআইআইএসএস ও কলাম লেখক

No comments

Powered by Blogger.