মহিউদ্দিনের বিপক্ষে তাঁরই একসময়ের ঘনিষ্ঠরা

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ও প্রবীণ নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। একসময় দলকে সংগঠিত করেছেন অক্লান্ত পরিশ্রমে। নতুন নতুন নেতা বানিয়েছেন দলে। রাজনীতিতে তাঁর যেমন সুনাম রয়েছে, তেমনি তাঁকে ঘিরে দলীয় কোন্দলও বেশ আলোচিত।


মহিউদ্দিন চৌধুরীর বয়স এখন ৭০ বছর। ৫৭ বছর ধরে রাজনীতি করছেন তিনি। অসংখ্যবার জেল খেটেছেন। বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন মোকাবিলা করে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে তিন দশকের বেশি সময় কাটিয়েছেন। সিটির মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন তিনবার। অবশেষে গত নির্বাচনে প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। কিন্তু এখন নানা কারণে আর আগের মতো সবাইকে নিয়ে পথ চলতে পারছেন না তিনি। মহানগর আওয়ামী লীগে এখন অনেক দল-উপদল। এ প্রসঙ্গে মক্কায় অবস্থানরত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী গত রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'জনগণের সেবা করাই আমার প্রধান দায়িত্ব।' মহিউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মহানগর আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য খোরশেদ আলম সুজন বলেন, 'রাজনীতিতে তিনি (মহিউদ্দিন) এক আপসহীন যোদ্ধা। তবে তাঁর মেজাজ রুক্ষ। রাজনীতির চলার পথে অনেকেই তাঁকে কাজে লাগিয়ে সরে পড়েছেন।'
আশির দশকে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর সঙ্গে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরোধের কথা দেশব্যাপী আলোচনায় ছিল। এ প্রসঙ্গে সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বলেন, 'দোষে-গুণেই মানুষ। দলে তাঁর (মহিউদ্দিন চৌধুরী) প্রতিপক্ষরা ও তিনি সংযত থাকলে ভালো হয়।'
বাবু-মহিউদ্দিন বিরোধ ১০ থেকে ১৫ বছর পর স্তিমিত হয়ে আসে। এরপর মহিউদ্দিনের সঙ্গে কোন্দল দেখা দেয় তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছিরউদ্দিনের। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা ও চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বড় সংগঠনে চিন্তার পার্থক্য থাকবেই। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দল পরিচালিত হলে এভাবে বিরোধ-বিশৃঙ্খলা হয় না। এছাড়া কেউ কেউ পদ আঁকড়ে থাকলেও দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। তবে এটা ঠিক যে, দলকে সংগঠিত করতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর ত্যাগ সবচেয়ে বেশি।'
দীর্ঘদিন ধরে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে বিরোধ চলতে থাকে কোতোয়ালি আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বিএসসির। তারপর একে একে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ডা. আফসারুল আমিন, বন্দর-পতেঙ্গা আসনের সংসদ সদস্য ও চেম্বারের সাবেক সভাপতি এম এ লতিফ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান আব্দুচ ছালামের সঙ্গেও মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। অথচ শিল্পপতি নুরুল ইসলাম বিএসসি, ডা. আফসারুল আমিন, শিল্পপতি আব্দুচ ছালাম- সবাই মহিউদ্দিনেরই হাতে গড়া।
জানা যায়, ২০০৮ সালে ডা. আফসারুল আমিন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় খুশি হয়েছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। আব্দুচ ছালামকে সিডিএর চেয়ারম্যান বানাতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন কলকাতার শোভাবাজারে মুক্তিযোদ্ধা অমলেন্দু সরকারের বাসায় বসে। মিডিয়ায় আব্দুচ ছালামের চেয়ারম্যান হওয়ার খবর প্রচারের আগেই এ বিষয়ে এই প্রতিবেদক নিশ্চিত হন মহিউদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে। ক্ষমতা পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ঘনিষ্ঠ এ দুইজনের সঙ্গে বিরোধ শুরু হয় তাঁর। সেই বিরোধের প্রভাব পড়ছে দলীয় কর্মসূচিতেও। আলাদাভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। বিগত মেয়র নির্বাচনে মহিউদ্দিনের বিরোধিতা করেন নুরুল ইসলাম বিএসসি। অন্যদিকে সংসদ নির্বাচনে নুরুল ইসলামের বিরোধিতায় ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।
বিরোধ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আব্দুচ ছালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সিডিএ চেয়ারম্যানের পদে বসে আমি দলের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করব না।'
মহিউদ্দিনের সাম্প্রতিক বিরোধ সংসদ সদস্য এম এ লতিফের সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে এম এ লতিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'উনার (মহিউদ্দিন চৌধুরী) সঙ্গে আমার রাজনৈতিক মতপার্থক্য নেই। বন্দর যাতে রাজনীতির বলি না হয় সে বিষয়ে আমি সবসময় সোচ্চার থাকি- এই যা। ব্যক্তি বা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো কোন্দল নেই।'

No comments

Powered by Blogger.