পশ্চিমবঙ্গ-ভোটের জটিল বীজগণিত by অমিত বসু

ট্রেন লেট করতে করতে মেকআপ করে, মেয়েদের মেকআপে লেট হয়। আজকাল ছেলেদেরও প্রসাধনে সময় লাগে। প্রসঙ্গটা ছেলেমেয়ের নয়, অন্য। বিপন্ন বামফ্রন্টকে নিয়ে। তারা রেল না ফিমেল? মেকআপ করে এগোতে পারবে, না পিছিয়েই থাকবে? নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার শেষ অধিবেশনে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হুঙ্কার,


এবার আমরা জোড়া কংগ্রেসকে হারাব। তার মানে, কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস বামফ্রন্টের ঠোক্করে ছিটকোবে। বামফ্রন্ট অষ্টমবার সরকার গঠন করবে।তৃণমূলও তারস্বরে চিৎকার করে জানাচ্ছে, বামফ্রন্ট শেষ, আমরাই চালাব দেশ। দেশ বলতে গোটা ভারত নয়, শুধু পশ্চিমবঙ্গ। হিটলারের অনুচর গোয়েবলস বলতেন, মিথ্যাটা তিনবার চেঁচিয়ে বললে সেটাই সত্যি হয়ে যায়। রাজনীতিকরা কথাটা এখনও মানে। তৃণমূল সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সময়টাকে নির্বাচনী ইস্যু করেছেন। তার বক্তব্য, সময় পাল্টাতেই হবে। পঁয়ত্রিশ বছরটা কি খুব কম সময়। এতদিন ক্ষমতায় থাকার পরও বামফ্রন্ট আরও থাকতে চাইবে কেন? আমরা চান্স পাব না কেন? সেটা বুঝেই মানুষ আমাদের সুযোগ দেবে। আমরাও দেখিয়ে দেব, কী করতে পারি। কথায় দম আছে, দাম কতটা। এ পর্যন্ত যতটা হেঁটেছেন তাতে তার অঙ্গীকারের আঁচ আছে? দলের সৈনিকরা কি সেই ব্রত নিয়ে এগোচ্ছেন? প্রার্থী তালিকা কিন্তু সে কথা বলছে না। সব থেকে বিতর্কিত কেন্দ্র খেজুরিতে প্রার্থী পার্থপ্রতিম দাস। যিনি খুনের আসামি। আপাতত ঠিকানা জেলহাজত। তার বিরুদ্ধে ৬টি অভিযোগ। তার মধ্যে অন্যতম মুনিয়ার কৃষক নেতা মধুসূদন হাজরাকে কুপিয়ে খুন। ৩০২ ধারায় মামলা চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ফাঁসি হবে। খুন ছাড়াও তিনি ৪টি ঘর পুড়িয়ে নিরীহ কৃষকদের বাস্তুহারা করেছেন।
তৃণমূল নেতাদের কৈফিয়ত, আমরা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলছি। সিপিএমের কফিনে পেরেক পুঁততে এ রকম লোকের দরকার। সিপিএমের বিরুদ্ধেও হিংসার অভিযোগ আছে। তাদের অনেকে গ্রেফতার হয়েছে। তবু অভিযুক্ত কোনো আসামিকে প্রার্থী করা হয়নি। সবকিছুর তো একটা সীমা থাকে। বিধানসভার মতো পবিত্র কক্ষে খুনিদের জায়গা হলে তো ভয়ঙ্কর। তৃণমূল বলছে, আমরা সবাইকে নিয়ে এগোব। সবাইয়ের মধ্যে খুনিরাও কি থাকবে? তৃণমূল অর্থমন্ত্রী হিসেবে যাকে প্রজেক্ট করেছেন তার চিন্তাধারা মমতার স্লোগানের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। মমতা বলছেন মা, মাটি, মানুষ। তার রাস্তা ভিন্ন। তিনি করপোরেট কালচারে বিশ্বাসী। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষদের মাথায় আরও তেল ঢালা দরকার। সেই তেল চুইয়ে পায়ে পড়লে সাধারণ মানুষও পাবে। তিনি ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের মহাসচিব ছিলেন। তৃণমূলের জমি আন্দোলনে সিঙ্গুরে যখন আগুন জ্বলছে, তিনি টাটা শিল্পগোষ্ঠীর হয়ে সওয়াল করেছেন। মমতা তাকে সাদরে নিজের রেলমন্ত্রকে টেনে আনেন। এবার তিনি খড়দায় বামফ্রন্টের অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে প্রার্থী। প্রচারে প্রতিদ্বন্দ্বী অমিত মিত্র বলছেন, সব বদলে দেব, পরিবর্তন করাটাই আমাদের টার্গেট।
মমতা এখন কাউকে প্রার্থী তালিকায় রাখেননি, যিনি তার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। লোকসভা নির্বাচনেও সেই কাজ করেছেন। এমনকি দিলি্লতে তৃণমূলের যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তারা সবাই প্রতিমন্ত্রী। একমাত্র মমতা পূর্ণমন্ত্রী। মমতা মুখে গণতন্ত্রের জয়গান গাইছেন, কিন্তু কাজে স্বৈরাচারকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। এই দ্বিচারিতাও কি পরিবর্তনের নামান্তর।
পাঁচজন আইএএস অফিসারকে প্রার্থী করেছেন মমতা। একজন আইপিএস বা পুলিশের কর্তাব্যক্তিকেও বিধায়ক হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরা সবাই অবসরপ্রাপ্ত। সার্ভিস রেকর্ডে তাদের উল্লেখযোগ্য অবদান নেই। কোনোদিন রাজনীতি করার অবকাশ হয়নি। তবু তাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে ধরে আনার কারণ একটাই, তৃণমূলে মাজাঘষা লোকের অভাব। মন্ত্রিসভা গঠন করতে হিমশিম খেতে হবে। যাদবপুর কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো লোক তৃণমূলে ছিল না। আনতে হয়েছে বাইরে থেকে। জ্যোতি বসু যখন মুখ্যমন্ত্রী তখন মুখ্যসচিব ছিলেন মনীশ গুপ্ত। বুদ্ধদেবের প্রতিপক্ষ এখন তিনি।
মমতা সিনেমা তারকাদের খুব পছন্দ করেন। লোকসভায় তাপস পাল, শতাব্দী রায়ের মতো নায়ক-নায়িকা নির্বাচিত তারই প্রেরণায়। এবার বিধানসভা নির্বাচনে নায়ক চিরঞ্জিত, নায়িকা দেবশ্রী রায়কে তিনি প্রার্থী করেছেন। তাদের কাজকর্মে তামিলনাড়ূর প্রভাব কল্পনাও করা যায় না। কারণ জায়গাটা পশ্চিমবঙ্গ এবং তারা বাঙালি। কথা সেটা নয়_ বিষয়টা হচ্ছে, রাজনীতিকের স্টক তৃণমূলে এতটাই কম যে, সিনেমার স্টারদের ডাকতে হচ্ছে। অর্থাৎ মমতার চোখে গ্গ্ন্যামারটা বড় ফ্যাক্টর।
ফাঁক পূরণ করতে মমতা নট এবং গায়কদের দিকে হাত বাড়িয়েছেন। তারাও যে কতটা বিশ্বাসযোগ্য বলা কঠিন। গায়ক কবীর সুমনকে হাতে ধরে তিনি সাংসদ করেছিলেন। সাংসদ হয়েই সুমন বিগড়ে গেলেন। তৃণমূলী নেতাদের বিরুদ্ধে অর্থ তছরূপের অভিযোগ আনলেন।
সিপিএম বলছে বিগড়ে যাওয়া মানুষরা ফের সিপিএমমুখী হচ্ছে। সংগঠন আগের থেকে অনেক চাঙ্গা। নির্বাচনী কেন্দ্র পুনর্বিন্যাসে ভোট ব্যাংকেরও বিভাজন হয়েছে। সেটা মাথায় রেখেই প্রার্থী ঠিক করেছে বামফ্রন্ট। দরকারে কলকাতার প্রার্থীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে উত্তরবঙ্গের কোচবিহারে। মেদিনীপুরের প্রার্থী চলে গেছেন উত্তর দিনাজপুরে। হেভিওয়েট প্রার্থীদের ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মধ্য কলকাতার অ্যান্টালি কেন্দ্রে প্রার্থী মন্ত্রী দেবেশ দাস। তাকে দেখে তৃণমূল প্রার্থী তারক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাফ কথা, আমায় উত্তর কলকাতায় প্রার্থী করুন কিংবা বাদ দিন। মমতা তাকে বুঝিয়েছেন, আমার লম্বা লম্বা কাটআউট দেখে লোকে ভোট দেবে। আমার নামেই তুমি জিতে যাবে। তৃণমূলে যারা প্রার্থী হতে পারেনি তারা ক্ষুব্ধ। ক্ষোভ আছড়ে পড়েছে মমতার বাড়িতেও। তার রেল প্রকল্পের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যা বলেছেন তা করেননি এমন অভিযোগও রয়েছে। সুতরাং মমতার ট্রেন ফুলস্পিডে ছুটছে বলা যাবে না।
শঙ্কা ছিল কংগ্রেস-তৃণমূল জোট হওয়াতে। রাজ্য কংগ্রেস নেতারা, এমনকি বর্ষীয়ান অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি পর্যন্ত যখন রফার রাস্তা খুঁজতে ব্যর্থ তখন সোনিয়া ম্যাজিকে মিটমাট।
তৃণমূল-কংগ্রেস জোট বাঁধায় বামফ্রন্টের লড়াইটা আরও কঠিন হয়ে গেল। ডিসেম্বরে যে মমতা হাওয়াটা ছিল সেটা প্রশমিত। বামফ্রন্ট এবং তৃণমূলের ইশতেহারে তফাত খুব একটা নেই। দু'পক্ষই কৃষি ও শিল্পকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে আগ্রহী। রাজ্যজুড়ে প্রচারের লাল-সবুজ স্রোত। বামদের রক্তিম, তৃণমূলের হরিৎ। বিষয়টি এখন অ্যালজিব্রা বা বীজগণিতের অঙ্ক। এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দুর্বোধ্যভাবে সংক্ষিপ্ত। অনেক সময় উত্তরটা দেওয়া থাকে, প্রমাণ করাটাই দায়িত্ব। দুই শিবির সেই চেষ্টাই করছে। কড়া পরীক্ষক ৫ কোটি ৬০ লাখ ভোটার। অঙ্কে কাঁচা হলে বিপদ। অ্যালজিব্রার জটিল অঙ্কে হাঁসফাঁস অবস্থা রাজনীতিকদের। কীভাবে কতটা মানুষকে বাগে আনা যায় তার মরিয়া প্রয়াস। ভোটাররা হাসছে আর বলছে, চালিয়ে যাও। দেখি কে আমাদের বেশি কাছে আসতে পারে।

অমিত বসু : পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক
 

No comments

Powered by Blogger.