ত্রিপলে ঢাকা রাস্তায় বন্ধ যাতায়াত- ডা. ইকবালের ভবনের কাজে রাস্তা ধসে বিশাল গর্ত by অরূপ দত্ত

রাজধানীর গুলশান নিকেতনে একটি বহুতল ভবন তৈরির কাজের কারণে ৩০ ফুট চওড়া রাস্তার একটি অংশের প্রায় পুরোটাই ধসে পড়েছে। রাস্তাটি দিয়ে এক মাসের বেশি সময় ধরে যান চলাচল বন্ধ। এমনকি পথচারীদেরও ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে।


নিকেতন ‘এ’ ব্লকের ২ নম্বর সড়কে নির্মাণাধীন এই ভবনটির মালিক আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক সাংসদ ডা. এইচ বি এম ইকবাল।
এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাস্তা ভাঙার পরপরই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এইচ বি এম ইকবালকে চিঠি দেয়। চিঠিতে দ্রুত রাস্তা মেরামত করতে বলা হলেও এখনো কোনো কিছু করা হয়নি।
গতকাল রোববার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণস্থলের পাশের সড়কের একটি বিশাল অংশ ধসে গিয়ে প্রায় অন্য পাড় পর্যন্ত গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া বালু ও অন্যান্য নির্মাণ উপকরণ ফেলে রাখায় রাস্তাটি চলাচলের একেবারে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রাস্তার অংশসহ ১৫ কাঠা আয়তনের পুরো নির্মাণস্থলটি ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে সেখানে যে ৩০ ফুট চওড়া সড়ক আছে, দূর থেকে তা বোঝাই অসম্ভব।
পাশাপাশি তিনটি প্লটের ওপর এই বাড়ি নির্মাণের জন্য নকশার অনুমোদন আছে। তবে তা কতটা রক্ষা হচ্ছে, রাজউক এ পর্যন্ত তা যাচাই করতে যায়নি বলে জানা গেছে। গত ২৮ মার্চ এইচ বি এম ইকবালের নামে দুটি বেজমেন্টসহ ১০ তলা এই বাড়ির নকশা অনুমোদন করা হয়।
এলাকাবাসী বলেছেন, এক মাসেরও বেশি সময় আগে রাস্তাটি ধসে পড়ে। তাঁদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কাটার সময় রাস্তাটি ধসে যায়।
রাস্তাটির এ অবস্থার কারণে সেখানকার বেশ কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি হচ্ছে। ওই বাড়িগুলোর গাড়ি ও বাসিন্দাদের বাড়তি পথ ঘুরে ১ ও ৩ নম্বর রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। পথচারীদের পক্ষে, বিশেষ করে নারীদের জন্য সড়কের ত্রিপলে ঢাকা অংশ দিয়ে যাতায়াত করা দুরূহ ব্যাপার। কারণ, রাস্তা ভাঙাচোরা ছাড়াও সেখানে শ্রমিক-মিস্ত্রিদের আড্ডা। আশপাশের বাড়ির বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, চলাচলে বড় সমস্যার পাশাপাশি রড কাটাসহ বিভিন্ন কাজের বিকট শব্দে রাতে ঘুমানো যায় না। একজন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বিষয়টি নির্মাণাধীন ভবনের লোকজনকে জানালে তাঁরা বাড়ি বদল করে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, প্রায় প্রতিদিনই মালিক এইচ বি এম ইকবাল নির্মাণস্থলে আসেন। কোনো কোনো দিন সকাল-বিকেল দুই বেলা আসেন।
নির্মাণাধীন ভবনের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী কামাল হোসেন বলেন, রাস্তা ভাঙার ঘটনাটি ঘটে ‘মাত্র’ মাস খানেক আগে। রাস্তার মাটি ভালো না হওয়ায় এই সমস্যা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
সিটি করপোরেশন রাস্তা মেরামতের জন্য চিঠি দিলেও এ পর্যন্ত ভবনমালিক কিছু করেননি। ৩ নম্বর অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে এ বিষয়ে বলেন, ‘পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা দেখা হচ্ছে।’
রাজউকের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, বাড়ি নির্মাণের আগেই রাজউকের শর্ত থাকে যে, নির্মাণকালে রাস্তার বা পাশের বাড়িঘরের কোনো ক্ষতি হলে তা দ্রুত মেরামত করে দিতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে গতকাল বিকেলে এইচ বি এম ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ভালো একটি কাজ করতে যাচ্ছিলাম। দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। তার পরও সমস্যা নেই।’ সরকারি রাস্তা ত্রিপল দিয়ে ঢাকা হলো কেন—এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে ইকবাল বলেন, ‘আগামী এক মাসের মধ্যে রাস্তা মেরামতের কাজ ধরে দুই সপ্তাহের মধ্যে তা শেষ করে দেব।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের সংগঠন নিকেতন সোসাইটির সভাপতি হাবিব আহসানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাস্তাধসের ঘটনার পর সোসাইটির পক্ষ থেকে জানানো হলেও প্রথমে এইচ বি এম ইকবাল বিষয়টি আমলেই নেননি। তবে পরে বর্ষার শেষে তিনি রাস্তা ঠিক করে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
১০ তলা নকশায় কয় তলা?: নির্মাণস্থলে কয়েকজন কর্মী বলেন, তাঁরা শুনেছেন এখানে ১৮ তলা ভবন হবে। আর এটি আবাসিকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহূত হতে পারে। পার্শ্ববর্তী কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দারাও বলেন, তাঁরা শুনেছেন এখানে ২৪ তলা ভবন হবে। উল্লেখ্য, এলাকার বেশির ভাগ ভবনই ছয়তলা।
বিষয়টি জানানো হলে এইচ বি এম ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘১৮ তলা করার প্রশ্নই ওঠে না। রাজউক থেকে ১০ তলার নকশা অনুমোদন করা হয়েছে, সে অনুযায়ীই ভবন হবে।’
প্রসঙ্গত, ইতিপূর্বে গুলশান এভিনিউর ৭৮ নম্বর প্লটে স্ত্রী মমতাজ বেগমের নামে ১৮ তলা ‘প্রিমিয়ার স্কয়ার’ নির্মাণ করেন ইকবাল। ওই ভবনের নকশা না থাকার দায়ে রাজউক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিলে তিনি মামলা করেন। সে মামলার এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
রাজউকের সংশ্লিষ্ট অথরাইজড বিভাগ থেকে বলা হয়, বাড়তি তলা করা হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নকশা অনুযায়ী বাড়ির সামনে দেড় মিটার, পেছনে দুই মিটার এবং দুই পাশে সোয়া মিটার করে খালি জায়গা রাখতে হবে। নির্মাণকালে তা দেখা হবে।

No comments

Powered by Blogger.