রাজধানীতে দুর্ঘটনা ও কিছু প্রশ্ন by নিয়ামত হোসেন

মঙ্গলবার রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ দিতে হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ সম্পান শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র তৌহিদুজ্জামানকে। এই মোড়সহ ধারে কাছে অন্যান্য এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন ছাত্রকে প্রাণ দিতে হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।


যে কোন মানুষের মৃত্যুই হচ্ছে অত্যন্ত শোকাবহ। সম্পদের ক্ষতি হলে একটা হিসাব ধরা যায়। বলা যায় অতো টাকার ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু মানুষের জীবনের যা ক্ষতি তার তুলনা হয় না কোন সম্পদ বা টাকায়। জিনিসের ক্ষতি হলে টাকা দিয়ে তা নতুন করে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু গোটা পৃথিবীর বিনিময়েও কোনদিন কোন হারিয়ে যাওয়া প্রাণ ফিরিয়ে পাওয়া যায় না। কোন কিছু দিয়ে প্রাণের ক্ষতিপূরণ হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রটি ভবিষ্যতের বহু স্বপ্ন চোখে নিয়ে লেখাপড়া করছে। তাকে নিয়ে তার বাবা-মার যে স্বপ্ন তা সবই চিরকালের মতো শেষ হয়ে যায় এই দুর্ঘটনায়।
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই নয়, শাহবাগ মোড়সহ অন্যান্য মোড় এবং রাস্তা অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী ছাড়াও সাধারণ অনেকেই যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে বিভিন্ন সময়ে। এসব দুর্ঘটনার খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে বা টিভিতে প্রচারিত হলে মানুষ সেসব পড়ে বা শোনে, তারপর তাদের মন বিষাদে ভারাক্রান্ত হয় এবং সকলেরই মনে একটা অভিন্ন প্রশ্ন জাগে। সেটা হচ্ছে ঢাকার রাস্তায় এভাবে আর কত মানুষকে মরতে হবে?
দেশের যে কোন পথে যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে বা দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে মৃত্যু হচ্ছে বহু মানুষেরÑ এটা আমরা সবাই জানি। পত্রিকার পাতা খুললেই প্রায়ই দেখা যায় সড়ক দুর্ঘটনার খবর। এসব মৃত্যুর পাশাপাশি রয়েছে দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার ঘটনা। বিভিন্ন সময়ে কত মানুষ যে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে তার সঠিক হিসাব কে দেবে! এ ধরনের মৃত্যু সম্পর্কে নানা সংস্থা যেসব রিপোর্ট প্রকাশ করে সেগুলোর কোনটির হিসাব ঠিক, কোনটার ঠিক নয়Ñকে বলবে! তবু সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর যে কোন হিসাব দেখলে অবাক হতে হয়। এত মানুষ মারা যাচ্ছে পথে। এসব দুর্ঘটনা কি কোনভাবেই এড়ানো যেত না?
কিছুদিন আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা হারালাম দুই বিশিষ্ট প্রতিভাবান গুণীকেÑ মিশুক মুনীর এবং তারেক মাসুদ হারিয়ে গেলেন চিরকালের জন্য।
এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়, এদেশের এক বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী এবং চলচ্চিত্র অভিনেতা গওহর জামিলের মৃত্যুর কথা। তিনিও ঢাকার রাজপথে যন্ত্রদানব এক যানের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান।
বাংলামোটর মোড়ে যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে বা ধাক্কা খেয়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে অনেকবার। মাঝে মাঝেই শোনা গেছে এ স্থানে দুর্ঘটনার খবর। স্মরণ করা যেতে পারে, বিশিষ্ট সাংবাদিক, কবি ইউসুফ পাশাকেও জীবন দিতে হয়েছে ওই মোড়ে। তাঁর দুঃখজনক মৃত্যুর পরে ওই মোড়ে একটি রাস্তা পারাপারের ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের দাবি ওঠে। সেখানে তৈরি হয়েছে ওই ব্রিজ। বহু মানুষের উপকার হচ্ছে এতে।
ঢাকা নগরীর শুধু একটি দুটি রাস্তা বা মোড়েই নয়, নগরীর নানা রাস্তায় ও মোড়ে বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে। এক একটি দুর্ঘটনায় অনেক লোক নিহত ও অনেকে আহত হয়েছে।
এক সময় ঢাকা-আরিচা রোডকে বলা হতো মৃত্যুফাঁদ। ওই রোডে প্রায়ই ঘটত দুর্ঘটনা। ক’দিন পর পরই শোনা যেত ওই সড়কের দুর্ঘটনার খবর। দুর্ঘটনা সে সময় এত ঘটত ওই সড়কে যার জন্য কোন কোন পত্রিকায় সড়কটিকে মৃত্যুফাঁদ হিসাবে আখ্যায়িত করা হতো। ওই সড়কটির ওই অবস্থা পরে অবশ্য পাল্টে যায়। এখন রাজধানী নগরীতে যে ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে তাতে এই নগরীর কোন কোন মোড়কে মৃত্যুফাঁদ হিসাবে চিহ্নিত করা যায় কিনা সেটাই প্রশ্ন। তবে প্রশ্নটির উত্তর যাই হোক, মোড় বা সড়ক যাই হোক এই অবস্থা পাল্টাতে হবে। মৃত্যুফাঁদ বা ওই ধরনের কোন নাম যাতে কোনদিনই দেয়া না যায় সেজন্য অবস্থা পাল্টানো দরকার।
শাহবাগ মোড়টিতে সেদিন যে দুর্ঘটনা ঘটল তার আগেও একাধিক দুর্ঘটনা ওখানে হয়েছে। এখনই অবস্থা পাল্টানোর উদ্যোগ না নিলে আবার একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
সড়ক দুর্ঘটনায় একটি তাজা প্রাণ হারিয়ে গেলে মানুষ যেমন ব্যথিত হয় তেমনি তাদের ক্ষোভও বাড়ে। কেন এমন ঘটল? একটু সতর্ক হলে দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। অথচ সতর্ক কেউ হয় না। মানুষের প্রাণ যায় যানবাহনের চাকায় বা ধাক্কায়। এমন দুর্ঘটনায় অবশ্য অনেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট যানটিকেই শুধু নয়, আশপাশের অনেক গাড়িও ভাঙ্গার চেষ্টা করে। ভাঙ্গেও। অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা গেছে কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা বেতনের দাবি ও অন্য কোন দাবি বা প্রতিবাদের কারণে রাস্তায় গাড়ি ভাঙ্গতে থাকে। কাজটি যে কখনই সমর্থনযোগ্য নয় সেটি বলাই বাহুল্য। যে গাড়ির চালক কোন দোষ করেনি বা যে গাড়ি কোন ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় সেসব গাড়ি ভাঙ্গার যুক্তি কি? আমাদের দেশে এই রীতিটি বেশ অনেকদিন ধরে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সকলেরই ভাবা উচিত। হাজার লোক হাজার কাজে শহরের রাস্তায় গাড়ি নিয়ে চলাচল করছে। তাদের গাড়ি হঠাৎ ভাঙ্গা শুরু হলে কেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া অন্যের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। বিনা কারণে অন্যের গাড়ির ক্ষতি করা বা ভাঙ্গা ঠিক নয়। এটা বন্ধ হওয়া উচিত।
মানুষ খামোখা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে না। তাদের রাগের কারণ বুঝতে হবে। একটা বাস বা অন্য কোন যান রাস্তায় কাউকে ধাক্কা মেরে বা চাপা দিয়ে যাবে এটা কি মেনে নেয়া যায়? অবশ্যই আটক করে শাস্তি দিতে হবে। শাহবাগের সেদিনের ঘটনায় অবশ্য অভিযুক্ত চালককে আটক করা হয়েছে। আশা করা যায়, তার যথাযথ বিচার হবে।
তবে শুধু এতেই হবে না, সংশ্লিষ্ট রাস্তা ও মোড়টিকে নিরাপদ করতে হবে। সেজন্য প্রত্যেকে যাতে ট্রাফিক আইন মানে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেক চালক যাতে সাবধানে গাড়ি চালায়, চালানোর সময় তাদের কানে কোন মোবাইল ফোন না থাকে, তারা যাতে সত্যিকার লাইসেন্সধারী চালক হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্যতা নাই অর্থাৎ যথাযথ লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক নয় এমন লোকও বাস চালায় এই নগরীতেও, এ কথা চিন্তা করলে গা শিউরে ওঠে আতঙ্কে। মনে প্রশ্ন জাগে এরা কিভাবে এই সুযোগ পেল। এমন সুযোগ পাওয়ার কথা মাঝে মাঝেই শোনা যায়।
শাহবাগের মোড়টি খুবই ব্যস্ত একটা মোড়। লোকজনের চলাচলের নিরাপত্তার জন্য ফার্মগেটের ওভার ব্রিজটির মতো বহুমুখী ওভারব্রিজ এখানেও দরকার। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখনই গুরুত্ব দিয়ে ভাবা প্রয়োজন। শুধু শাহবাগ বা বাংলামোটর মোড় নয়, সারা নগরীতে মানুষজনের চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুব জরুরী হয়ে উঠছে। এমনিতে যানজটে মানুষের চরম দুর্ভোগ। তারপর যে কোন সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা। এই দুর্ভোগ এবং আশঙ্কা পুরোপুরি দূর করতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.