দুদকে হলমার্কের এমডি, মোদাচ্ছের আলীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে- ‘মৃত্যুর আগে ব্যাংকের সব ঋণ শোধ করব’

হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, মৃত্যুর আগে তিনি সরকারি ব্যাংকের সব ঋণ পরিশোধ করবেন।


এদিকে হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীকে দ্রুত জিজ্ঞাসাবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের মতো অন্যান্য সরকারি ব্যাংকের জালিয়াতির অভিযোগও খতিয়ে দেখবে কমিশন।
গতকাল রোববার বিকেলে দুদক কার্যালয় থেকে বের হয়ে হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমি যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছি, তার চেয়ে ২০ গুণ বেশি সম্পদ রয়েছে। আর ব্যাংক থেকে নেওয়া সাড়ে ২৬০০ কোটি টাকা ঋণ মরার আগে “পাই টু পাই” ফেরত দেব।’
সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দামি গাড়ি উপহার দেওয়া প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তানভীর মাহমুদ বলেন, কাউকে তিনি গাড়ি উপহার দেননি। গ্যারেজে থাকা দামি গাড়িগুলো তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর বলে দাবি করেন তিনি। তানভীর ও তাঁর স্ত্রী যে পাজেরো জিপে করে দুদকে যান, সেটি ছিল নম্বরবিহীন। গাড়িতে নম্বরপ্লেট বা ‘এএফআর’ লেখা বোর্ডও লাগানো ছিল না। এএফআর হচ্ছে নিবন্ধনের জন্য আবেদন। এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘গাড়িটি নতুন কিনেছি, সময় পাইনি।’
সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ককে স্বাভাবিক উল্লেখ করে তানভীর বলেন, ব্যবসায়ী হিসেবে সবার সঙ্গেই সম্পর্ক থাকে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা মোদাচ্ছের আলী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টা দু-তিনবার আমার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসেছেন। আমি যে কাউকে দাওয়াত দিতেই পারি। এটা অপরাধ নয়।’
সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপের নামে প্রতিষ্ঠানটির মালিক তানভীর মাহমুদ দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে তুলে নিয়েছেন। এই অভিযোগ সম্পর্কে জানতে তানভীর মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রী জেসমিন ইসলাম এবং হলমার্কের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদকে গতকাল দুদক কার্যালয়ে ডাকা হয়। দুদকের উপপরিচালক মীর মো. জনয়াল আবেদীনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। কমিটিতে আরও ছিলেন উপপরিচালক এস এম আখতার হামিদ ভূঞা, সহকারী পরিচালক নাজমুস সাদাত ও মো. মশিউর রহমান, উপসহকারী পরিচালক মো. মজিবুর রহমান ও মো. জয়নুল আবেদীন।
এর আগে গত ১২ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখার আট কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদকের তদন্ত দল। হলমার্ক গ্রুপের সঙ্গে ওই ব্যাংকের লেনদেন ও ঋণসংক্রান্ত বেশ কিছু নথিপত্রও খতিয়ে দেখছে দলটি। এ নিয়ে এ পর্যন্ত ব্যাংকের দুই জিএমসহ ১৭ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো।
দুদকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, হলমার্কের ২৫টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান বলা হলেও তানভীর দাবি করেছেন, তাঁর মালিকানাধীন ৭০-৮০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
মোদাচ্ছেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে দুদক: হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা মোদাচ্ছের আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। গতকাল বিকেলে এ তথ্য জানান দুদকের কমিশনার এম বদিউজ্জামান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে উপদেষ্টা মোদাচ্ছের আলীর নামটি বারবার এসেছে। অন্য কারও নাম এলে তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
দুদকের তদন্ত সূত্রে জানা যায়, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার আর্থিক অনিয়মের তদন্ত করতে গত মে মাসে পরিদর্শক দল পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। তদন্ত চলাকালে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মোদাচ্ছের আলী। তিনি তদন্ত দলের সঙ্গে কথা বলেন এবং নিজের একটি ভিজিটিং কার্ড দেন।
দুদক কমিশনার বদিউজ্জামান আরও জানান, বিদেশ থেকে তৈরি পোশাক সামগ্রী আমদানি-রপ্তানির কথা বলে এলসির বিপরীতে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে হলমার্ক ওই টাকা হাতিয়ে নেয়। হলমার্কসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে তিন হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সেই টাকার কত অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তা-ও তদন্ত করা হচ্ছে।
ডিএন স্পোর্টস লিমিটেড: হলমার্কের মতো জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে ডিএন স্পোর্টস লিমিটেডের বিরুদ্ধে। এর চেয়ারম্যান মোতাহার উদ্দিন চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুর রহমান ও পরিচালক ফাহমিদা আক্তার চৌধুরীকে গতকাল দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো চিঠিতে কারসাজির মাধ্যমে নেওয়া টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করে দেখতে বলা হয়েছে। চিঠি অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের ওই শাখা থেকে তিন হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার মধ্যে হলমার্ক গ্রুপ একাই জালিয়াতি করেছে দুই হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা; তাসলিম হাসানের মালিকানাধীন টিঅ্যান্ড ব্রাদার্স গ্রুপ ৬৮৫ কোটি ৬৩ লাখ, সাইফুল ইসলামের মালিকানাধীন প্যারাগন গ্রুপ ১৪৪ কোটি ৪৪ লাখ, ফাহমিদা আকতার চৌধুরীর মালিকানাধীন ডিএন গ্রুপ ২৮ কোটি ৫৪ লাখ, আবদুল খালেকের মালিকানাধীন নকশি নিট গ্রুপ ৬৫ কোটি ৩০ লাখ এবং আবদুল জলিল শেখের মালিকানাধীন খান জাহান আলী সোয়েটারসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নিয়েছে ১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা।

No comments

Powered by Blogger.