খাদ্যে ফরমালিন-আমদানি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে

মাছে ফরমালিন, ফলে কারবাইড, মুড়িতে ইউরিয়া, সবজিতে কীটনাশক- আমরা কোথায় যাব! অনেকে বিষের ভয়ে ফল খাওয়া ছেড়েই দিয়েছেন। মানুষ ক্যান্সার, লিভার ও কিডনির রোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, এসব রোগের দ্রুত বিস্তার ঘটছে।


কখনো কখনো সরাসরি বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কিছুদিন আগে দিনাজপুরে বিষাক্ত লিচু খেয়ে ১৩ জন মারা যাওয়ার খবর গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। তার আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক বাগান মালিক আমগাছে বিষ দেওয়ার পর নিচে পড়া আম খেয়ে তাঁর নিজের সন্তানই মারা গেছে। কিন্তু যে বিষয়টি আমাদের অবাক করে তা হলো, এত আলোচনা, এত লেখালেখির পরও এ জাতীয় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ও বিষক্রিয়া প্রতিরোধে সরকারের বিশেষ কোনো উদ্যোগ নজরে না পড়া।
মর্গে মানুষের লাশ ও গবেষণাগারে প্রাণীর মৃতদেহ সংরক্ষণে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। ফরমালিনে ডুবিয়ে বছরের পর বছর প্রাণীদেহ ও তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নমুনা সংরক্ষণ করা যায়। সেই বিদ্যাটিই নিয়েছে মাছ বিক্রেতারা। মাছের পচন রোধ করার জন্য তারা ফরমালিন ব্যবহার করে। একইভাবে দুধ যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্যও ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। ইদানীং মাংসেও নাকি এটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই ফরমালিন মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ফরমালিনের সমস্যা একসময় যুক্তরাষ্ট্রেও ছিল। কিন্তু ফরমালিন মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টি করে এবং কিডনি, লিভার ও শ্বাসতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর- এসব জানার পর থেকে খাদ্যে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উন্নত বিশ্বের প্রতিটি দেশেই খাদ্যে ফরমালিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ। এমনকি নির্মাণসামগ্রী, পার্টিক্যাল বোর্ড বা অন্যান্য সামগ্রীতেও এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কারণ এসব পণ্যে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি ফরমালিন থাকলে এলার্জি, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এর আমদানি ও ব্যবহার চলছে। আর তার প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপর। আমাদের দেশে ওষুধ প্রশাসন থাকলেও খাদ্য প্রশাসন নেই। এর অর্থ হলো, আগে ভেজাল ও বিষাক্ত খাবার খেয়ে অসুস্থ হও, তারপর তো ওষুধের প্রয়োজন হবেই। সেই ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রশাসন রাখা হয়েছে এবং সেই প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।
খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত দ্রব্য মেশানোর সমস্যাটি আজ সর্বব্যাপী। মাঝেমধ্যে দু-একটি মোবাইল কোর্ট পাঠিয়ে কিংবা লোকদেখানো কিছু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্যান্য উন্নত দেশের মতো এ দেশেও শক্তিশালী খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন গঠন করতে হবে। খাদ্যদ্রব্য বাজারজাতকরণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে হবে। ফরমালিন আমদানি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিল্প ও অন্যান্য প্রয়োজনে ফরমালিনের চাহিদা কত আর আসছে কত, তা মনিটরিং করতে হবে। কীটনাশক কিংবা অন্যান্য ভেজালকারী দ্রব্যের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। এই মর্মে হাইকোর্টের কিছু নির্দেশনাও রয়েছে। সেসব নির্দেশনার মধ্যে ছিল বন্দরগুলোতে রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো ফল আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা, বাজারের আড়তগুলোতে প্রতিদিন ফলের রাসায়নিক পরীক্ষা করা ও দোষীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা ইত্যাদি। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই থেকে রাজধানীর ১০টি বাজার ফরমালিনমুক্ত রাখার ঘোষণা দেওয়া হবে। আমরা তাদের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে এটা কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা আশা করি, সরকার জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এ ব্যাপারে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

No comments

Powered by Blogger.