সড়ক প্রকল্পের দুর্নীতি তদন্ত বন্ধে চাপ ছিল বিশ্বব্যাংকের! by রেজা রায়হান

শেখ হাসিনার পূর্ববর্তী সরকারের সময় ১৯৯৭ সালে দ্বিতীয় সড়ক পুনর্বাসন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে (আরআরএমপি-২) দুর্নীতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও বিশ্বব্যাংক তদন্ত বন্ধের জন্য চাপ দিয়েছিল। সে সময় বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের 'কান্ট্রি ডিরেক্টর' পিয়ারে লেন্ডেল মিলস চিঠি দিয়ে বলেন,


দুর্নীতি তদন্তের কারণে আরআরএমপি-২-এর ঠিকাদারদের 'ভেরিয়েশন অর্ডার'-এর (বর্ধিত কাজ) বিল পরিশোধ না করলে ব্যাংক নতুন করে তৃতীয় আরআরএমপিতে অর্থায়ন করবে না। দুর্নীতির গুরুতর প্রমাণ সত্ত্বেও বিশ্বব্যাংকের চাপের কারণে সরকার তদন্ত বন্ধ রেখে ৪০ কোটি ৪০ লাখ টাকা বিল পরিশোধে বাধ্য হয়। বিল পরিশোধের পর পরিচালিত তদন্তে দুর্র্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বা ঠিকাদার কারোরই শাস্তি হয়নি।
আগে নিজেদের অর্থায়িত প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়ে মুখ না খোলা ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতিসংশ্লিষ্টতা থাকলেও ২০০৫ সাল থেকে বিশ্বব্যাংককে দুর্নীতির বিষয়ে বেশ সোচ্চার দেখা যাচ্ছে। আর পদ্মা বহুমুখী সেতুর নির্মাণ তদারকি পরামর্শক (সিএসসি) নিয়োগে দুর্নীতির চেষ্টার কারণ দেখিয়ে বিশ্বব্যাংক ওই সেতু নির্মাণের জন্য ঋণচুক্তি বাতিল করেছে।
আরআরএমপি বাংলাদেশের সড়ক খাতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত সর্ববৃহৎ সড়ক প্রকল্প। এরশাদ আমলে আরআরএমপি-১-এর বাস্তবায়ন শুরু এবং খালেদা জিয়ার প্রথম দফা প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় সমাপ্ত হয়। ওই সময়ই আরআরএমপি-২-এর কাজ শুরু এবং শেখ হাসিনার প্রথম দফা প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় সমাপ্ত হয়ে আরআরএমপি-৩ শুরু হয়। তবে তিন পর্যায়ের এ প্রকল্পের সমাপ্তি ঘটে খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বের শেষ দফায়। আরআরএমপির প্রতিটি পর্যায়েই ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় আরআরএমপিতে দুর্নীতি নিয়ে সংবাদপত্রে ব্যাপক লেখালেখি এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে একাধিক কমিটি গঠন করলেও সে সময় বিশ্বব্যাংক এ ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি বা প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করেনি। তবে আরআরএমপি-৩-এর বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে দুর্নীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংক তদন্ত করে এবং নলকা-হাটিকুমরুল-বনপাড়া সড়কে নিম্নমানের কাজের বিষয় প্রমাণিত হওয়ায় চায়না রোডস অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) কালো তালিকাভুক্তির সুপারিশ করে। সিআরবিসি সওজের প্রকল্পে এখনো কালো তালিকাভুক্ত।
আরআরএমপি-১-এর আওতায় সাতটি যানবাহন কেনায় ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকায় ৯৫টি যানবাহন ক্রয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বর্ধিত কাজ করিয়ে বিল দেওয়ার কারণে ১৯৯৫ সালের ৩০ নভেম্বর প্রাক-একনেক সভায় দুর্নীতি ও অনিয়মের জন্য অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। পরে ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এ বিষয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের যুক্তি/ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব শহীদুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্তে প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিবেদনটি দীর্ঘদিন একনেকে উপস্থাপন করতে দেওয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর একনেক সভায় এটি উপস্থাপিত হলেও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে সময়ক্ষেপণের জন্য আরেক সচিব ড. ফজলুল হাসান ইউসুফের নেতৃত্বে আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়। তিনি অবসরে গেলে আরেক সচিব আনিসুল হক চৌধুরীকে দিয়ে কমিটি পুনর্গঠিত হয় এবং ১৮ মাস পর দায়সারা প্রতিবেদন দেওয়া হলে ১৯৯৮ সালের ১৯ মে একনেক সভায় উপস্থাপিত হয়। এতে গাড়ি ও স্পিডবোট কেনা ছাড়াও তিন কোটি ৫৬ লাখ টাকায় অস্তিত্বহীন বৃক্ষরোপণের তথ্য পাওয়া যায়। একনেক দায়ী পিডির বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা দায়েরের নির্দেশ দিলেও তদানীন্তন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী একনেকের সিদ্ধান্ত শব্দের মারপ্যাঁচে এমনভাবে লেখেন যাতে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া সম্ভব না হয়।
এভাবে আরআরএমপি-১-এর দুর্নীতি থেকে পার পেয়ে গিয়ে আরআরএমপি-২-এর পিডি নিযুক্ত হন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অতিরিক্ত পরিচালক মাহতাবউদ্দিন আহমেদ। এ প্রকল্পেও তিনি পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগ করেন।
আইএমইডির মহাপরিচালক নেসার আহমেদ ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের বিভাগীয় প্রধানকে লেখা এক চিঠিতে জানান, তাঁর বিভাগ থেকে আরআরএমপি-২-এর অন্তর্ভুক্ত নাটোর-দাসুরিয়া, নাটোর বাইপাস, রাজশাহী-নাটোর, রাজশাহী-নবাবগঞ্জ এবং নবাবগঞ্জ-সোনা মসজিদ এলাকায় পাঁচটি চুক্তির কাজ পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনে প্রতীয়মান হয়েছে, পরিদর্শিত সড়কগুলো চওড়া করা হয়েছে বলে যে তথ্য পিপিতে দেওয়া হয়েছে তা সঠিক ও তথ্যনির্ভর নয়। অথচ সড়কগুলো প্রশস্তকরণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণ বলে এ সম্পর্কিত সভায় উল্লেখ করা হয়। সড়কের ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ মাটি, বালি, খোয়া/পাথর ইত্যাদির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি। অথচ পরিদর্শনকৃত পাঁচটি চুক্তির ব্যয় বৃদ্ধির বিশ্লেষণে দেখা যায়, এগুলোর চুক্তিবদ্ধ অর্থের পরিমাণ ছিল ২২০ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২৮০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এটা মূল চুক্তির তুলনায় ৫৯ কোটি টাকা বা ২৬ শতাংশ বেশি। সর্বোচ্চ নাটোর বাইপাসের ক্ষেত্রে ৩৪ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। নাটোর বাইপাসে ছয় কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের জন্য ব্যয় হয়েছে ২১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা- এত বেশি ব্যয় প্রশ্নাতীত নয়। প্রকল্পের সংশোধিত পিপিতে ব্যয় বৃদ্ধির বিস্তারিত বিবরণ ও ব্যাখ্যা কোনোটাই দেওয়া হয়নি।
এ প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া এবং ভেরিয়েশনের নামে ৫৯ কোটি টাকা ঠিকাদারকে দেওয়ার বিষয়ে ১৯৯৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় ব্যয় বৃদ্ধিতে দুর্নীতির বিষয়ে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ভেরিয়েশনের অর্ডারে দুর্নীতির বিষয়টি ধামাচাপা দিতে এবং তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব এড়িয়ে গিয়ে ৪০ কোটি ৪০ লাখ টাকার ছয়টি ভেরিয়েশন অর্ডার অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রস্তাব পাঠায়। অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সভাপতিত্বে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর ক্রয় কমিটির সভায় ভেরিয়েশেন অনুমোদনের প্রস্তাব নাকচ করে বিষয়টি তদন্তের জন্য আইএমইডি সচিবকে প্রধান করে আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হলে তদন্ত বন্ধে নানামুখী তৎপরতা শুরু হয়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান ১৯৯৭ সালের ১৩ নভেম্বর যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে লেখা এক চিঠিতে প্রস্তাবিত ভেরিয়েশেন অর্ডারগুলো অনুমোদনের পরামর্শ দেন। তা না হলে প্রস্তাবিত তৃতীয় আরআরএমপিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে না বলে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। একই সময় ২২ নভেম্বর সফররত বিশ্বব্যাংক মিশন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) 'কিক অফ' সভায় একই মনোভাব ব্যক্ত করে। বিশ্বব্যাংকের চাপের এসব কথা জানিয়ে যোগাযোগমন্ত্রী ২৩ নভেম্বর অর্থমন্ত্রীকে এক চিঠিতে ভেরিয়েশনগুলো অনুমোদনের অনুরোধ করেন। চাপের মুখে অর্থমন্ত্রী বিষয়টি ক্রয় কমিটিতে উপস্থাপনের অনুমোদন দিলে ক্রয় কমিটি তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রেখে ভেরিয়েশন অর্ডারগুলো অনুমোদনের সুপারিশ করে। এ সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে আইএমইডি সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটির তদন্তে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মাহতাবউদ্দিন দোষী সাব্যস্ত হলেও শাস্তি না হয়ে বরং সওজের প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। আর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে অবসরে যাওয়া মাহতাবউদ্দিনকে বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের (ডিইউটিপি) নির্বাহী পরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংকের ইন্টেগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সরকারকে লেখা এক চিঠিতে এ প্রকল্পের ঠিকাদারের কাছ থেকে চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ ঘুষ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

No comments

Powered by Blogger.