চার দেশীয় গ্যাস পাইপ লাইনে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ-নীতিগত সম্মতি ॥ প্রস্তাব পাঠাতে বলেছে এডিবি

রশিদ মামুন ॥ চার দেশীয় গ্যাস সঞ্চালন লাইনে সংযুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান হয়ে ভারত পর্যন্ত চার দেশীয় গ্যাস পাইপ লাইনে (টাপি প্রকল্প) বাংলাদেশের সংযুক্তির প্রাথমিক প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে এ সংক্রান্ত স্টিয়ারিং কমিটি। চলতি মাসের ২ তারিখে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে প্রেরিত এক চিঠিতে এ খবর জানানো হয়েছে।


ওই চিঠিতে বাংলাদেশকে গ্যাস কেনার জন্য তুর্কমেনিস্তানের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।
এডিবির চিঠিতে দেখা যায়, টাপি প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটি তুর্কমেনিস্তানের ডেপুটি চেয়ারম্যান অব কেবিনেট মিনিস্টার, আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদমন্ত্রী, পাকিস্তান এবং ভারতের খনিজ সম্পদ এবং জ্বালানি মন্ত্রীকে নিয়ে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটিতে সমন্বয় করছে এডিবি।
জ্বলানি বিভাগ সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ চার দেশীয় গ্যাস পাইপ লাইনে নিজেদের সংযুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এখন এ বিষয়ে কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছে। জ্বালানি বিভাগ থেকে প্রকল্পে বাংলাদেশের সংযুক্তির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক এবং কারিগরি বিষয়ে মতামত দেয়ার জন্য বাংলাদেশ গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির (জিটিসিএল) মতামত চাওয়া হয়েছে।
এডিবির পরিচালক রুনি স্ট্রোম চলতি মাসের ২ তারিখে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপ সচিব নেছার আহমেদকে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছেন, প্রকল্পে সংযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আগে তুর্কমেনিস্তানের কাছে গ্যাস কেনার প্রস্তাব দিতে হবে। জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, প্রস্তাবটি তৈরি করে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে তুর্কমেনিস্তান পাঠাতে হবে।
জ্বালানি বিভাগের চাওয়া মতামতের বিষয়ে জানতে চাইলে জিটিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুর রহমান বলেন, এ ক্ষেত্রে তথ্য প্রাপ্তি একটা বড় সমস্যা। তারপরও আমরা একটি মতামত তৈরি করেছি। আশা করছি খুব শীঘ্র তা সরকারের কাছে পাঠাতে পারব। তিনি বলেন, গ্যাস সঞ্চালন লাইনটি ভারত পর্যন্ত আসবে। আমরা সেখানে কিভাবে সংযুক্ত হতে পারি, আমাদের প্রতিদিন কি পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন এ বিষয়েই জিটিসিএল মতামত দেবে।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইআরডিতে পাঠানো এডিবির চিঠি জ্বালানি বিভাগ পেয়েছে। তবে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তৈরি করা হয়নি। তিনি বলেন, টাপি সঞ্চালন লাইনটি তুর্কমেনিস্তান থেকে শুরু হয়ে আফগানিস্তান, পাকিস্তান হয়ে ভারতের পাঞ্জাব পর্যন্ত আসবে। বাংলাদেশকে এর সঙ্গে যুক্ত হতে হলে পাঞ্জাব থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করতে হবে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, এডিবিকে (বাংলাদেশ পর্যন্ত সম্প্রসারণ) এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বলা হবে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ভারতের পাঞ্জাব থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত সঞ্চালন লাইনের ব্যয় এবং গ্যাসের দামকে প্রাধান্য দেয়া হবে।
জ্বালানি বিভাগের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, সঞ্চালন লাইন নির্মাণের ব্যয় আমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে কিনা তা আগে দেখতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ সম্প্রতি কাতার থেকে এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তুর্কমেনিস্তানের গ্যাসের দাম এলএনজি থেকে বেশি হলে আমরা লাভবান হব না। তারপরও বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদী হওয়ায় ভবিষ্যত জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি ভেবে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।
এডিবির প্রেরিত চিঠিতে বলা হয়, টাপি গ্যাস সঞ্চালন লাইন নিয়ে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির সভা গত ২৩ মে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় এই সঞ্চালন লাইনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা এ বিষয়ে গ্যাস বিক্রয়কারী দেশ তুর্কমেনিস্তানকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিতে বলেছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রস্তাবে বাংলাদেশ কি পরিমাণ গ্যাস নেবে, কখন থেকে নিতে চায়, গ্যাসের মান কি হবে এবং গ্যাসের চাপ কত হবে তা প্রস্তাবনায় উল্লেখ করতে হবে। একই প্রস্তাবনা সকল সদস্য রাষ্ট্রকেও পাঠাতে হবে।
গত বছর ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এক বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে টাপি প্রকল্পে নিজেদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোর দেয়। তবে ওই সময় বাংলাদেশের ওই প্রস্তাবে তেমন আগ্রহ দেখায়নি পাকিস্তান এবং ভারত। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে টাপি প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির কাছে প্রাথমিক প্রস্তাব পাঠানো হয়।
তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারত নিয়ে চার দেশীয় গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই সঞ্চালন লাইনকে সংক্ষেপে টাপি পাইপ লাইন বলা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০০৫ সালে চার দেশীয় গ্যাস সঞ্চালন লাইনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ফলাফল প্রকাশ করে এডিবি। এই পাইপ লাইন নির্মাণ করছে সেন্ট্রাল এশিয়া গ্যাস পাইপ লাইন লিমিটেড, যা সেন্টগ্যাস কনসোর্টিয়াম হিসেবে পরিচিত। এই কনসোর্টিয়ামের নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন কোম্পানি ইউনোকল। এক হাজার ৭৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ৫৬ ইঞ্চি ব্যাসের এই গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ব্যয় হবে সাত দশমিক ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এডিবির অর্থায়নে ২০১৭ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, তুর্কমেনিস্তান থেকে গ্যাস কেনার জন্য ১৯৯৫ সালে পাকিস্তান চুক্তি করে। পরবর্তীতে ২০০২ সালে আফগানিস্তানের আগ্রহে তুর্কমেনিস্তান যৌথভাবে পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে চুক্তি করে। ভারতও পরবর্তী সময়ে এই প্রকল্পে নিজেদের নাম লেখায়।

No comments

Powered by Blogger.