সফল হোক মিসরের গণ-অভ্যুত্থান

অবশেষে নীল নদ বিধৌত প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিসরের বুকের ওপর চেপে থাকা পাথর নেমে গেল। প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের ৩০ বছরের শাসনের অবসান ঘটল মিসরের গণ-মানুষের আন্দোলনের মুখে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো মিসরের রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কয়ারে ১৮ দিন লাখ লাখ মানুষের লাগাতার সমাবেশের মধ্য দিয়ে।


শুধু কায়রো নয়, আলেকজান্দ্রিয়াসহ দেশটির সব এলাকায় মানুষ জেগে উঠেছিল একটি দাবিতে; মুবারককে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। আন্দোলন শুরু হওয়ার পর হোসনি মুবারক তা দমন করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। নতুন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন ওমর সোলায়মানকে। তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, মিসরের জনপ্রিয় সেনাবাহিনী যাতে তাঁর পক্ষাবলম্বন করে। কিন্তু তা হয়নি। গত বৃহস্পতিবার সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বর মাসের নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করবেন না এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে, তবে সে পর্যন্ত তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না। অপরদিকে এ আন্দোলন চলাকালে তিনি পুলিশ দিয়ে আন্দোলনকারীদের দমন করতে চেষ্টা করেছেন, সাদা পোশাকে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জনগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন, এমনকি নিজের পক্ষে তিনি অল্পসংখ্যক মানুষের একটি সমর্থক বাহিনী দিয়ে সংঘর্ষ বাধাতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। মিসরের মানুষ রাজপথ ছাড়েনি। তারাও জানিয়ে দিয়েছিল, মুবারক ক্ষমতা না ছাড়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাবে না। উল্লেখ্য, এ পালাবদলে দুই পক্ষই দেশটির বিশালসংখ্যক সেনাবাহিনীর সমর্থন আদায় করতে চেয়েছে। কিন্তু সেনাবাহিনী অনেকটা নির্লিপ্তই থেকেছে। বরং রাস্তায় প্রায়ই সেনাবাহিনীকে জনগণের প্রতি সহানুভূতিশীল মনে হয়েছে। ফলে মিসরের এ গণজোয়ারকে অস্বীকার করতে পারেনি দেশটির দীর্ঘকালের বন্ধু এবং মিসর সেনাবাহিনীকে বার্ষিক ১.৩ বিলিয়ন ডলার অর্থসাহায্য প্রদানকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র। গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের বন্ধু হোসনি মুবারকের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাই উপায়ান্তর না দেখে শুক্রবার সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পরিষদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে তিনি ২৫০ মাইল দূরের শার্ম আল শেখের অবকাশযাপন-কেন্দ্রে চলে গেছেন। মুবারক সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফিল্ড মার্শাল মুহাম্মদ হুসেইন তানতাবি ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।
মিসরের এ আন্দোলনে প্রাথমিক ফল পাওয়া গেছে মুবারককে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু কোন দিকে যে চলছে মিসর, সে ব্যাপারে এখনো দেশটির ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক মহলে সংশয় কাটেনি। মিসরে একের পর এক সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থরাই ক্ষমতায় এসেছেন। হোসনি মুবারক নিজেও ছিলেন মিসরের বিমান বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আনোয়ার আল সাদাতের সময় তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নিযুক্ত হন। সাদাতের হত্যাকাণ্ডের পর মুবারক দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে উঠে আসেন। এখন পশ্চিমা বিশ্ব অনেকটা শঙ্কিত হয়ে আছে, ইসলামী র‌্যাডিক্যাল দল মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় চলে আসে কি না তা নিয়ে। সুতরাং মিসর যে আবার সেনাবাহিনী দ্বারা শাসিত হবে না_এমন কথা নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি। তবে আমরা আশা করব, মিসরে যেন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সেক্যুলার সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারে। তাহলেই মিসরবাসীর আন্দোলন সার্থক হয়ে উঠবে। মিসর মুক্ত বলে সাধারণ নাগরিকরা যে আবেগঘন চিৎকারে ফেটে পড়েছে, তা একমাত্র গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সার্থক হয়ে ওঠা সম্ভব।

No comments

Powered by Blogger.