তিন প্রতিষ্ঠানের অসামর্থ্যের স্বীকারোক্তি-জনপ্রশাসনে দুর্নীতি

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও তথ্য কমিশনার ‘স্বাধীন’ হয়েও সরকারের ভেতরের লোক। তাঁরা একযোগে একটি অপ্রিয় সত্য সামনে এনেছেন। আমাদের ধারণা, জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনা এবং দুর্নীতি দমনে কোনো অগ্রগতি নেই। সর্বত্র প্রাতিষ্ঠানিক অসহায়ত্ব ও দেউলিয়াত্ব চলছে।


তাঁরা যেসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেসবের ওপর রাজনীতিকদের অঙ্গীকার না থাকায় দুর্নীতির রাশ টানতে পারছেন না।
দুদকের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান দুর্নীতি দমনে তাঁর সংস্থার ঢিলেঢালা অবস্থার জন্য দুই বড় দলের রাজনৈতিক অঙ্গীকার না থাকাকে চিহ্নিত করেছেন। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল পরস্পরকে ঘায়েল করে চললেও বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই যাতে তাদের মর্জিমাফিক চলে, সে বিষয়ে এককাট্টা। দুদক আইনের সংশোধনী প্রস্তাব দেড় বছর ধরে ঝুলে থাকলেও কারও শিরঃপীড়া নেই। পদ্মা সেতু বিষয়ে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক অসামর্থ্য প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে।
বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটকে সাধুবাদ জানাই। কারণ, তারা একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ে সংলাপের সূচনা ঘটিয়েছে। দুর্নীতি দমনের কার্যকর উপায় উদ্ভাবনে মহাহিসাব নিরীক্ষক, তথ্য কমিশন ও দুদকের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য। গত মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত সেমিনারে এ তিন সাংবিধানিক মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারেরা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে আরেকটি পরিহাস ফুটে উঠেছে। তাঁদের বক্তব্য শুনে কারও মনে হতে পারে, তাঁরা যেসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেগুলোর হাত-পা বাঁধা এবং দুর্নীতি দমনে একেবারেই অপারগ। তাই তাঁরা উপদেশমূলক বাণী বিলাচ্ছেন।
মহাহিসাব নিরীক্ষকের দুর্নীতি দমনবিষয়ক আলোচনা একেবারেই অসার। অডিটর জেনারেল নিরীক্ষায় দুর্নীতির সূত্র খোঁজার গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, সচিবদের কাজে স্বচ্ছতা না আনতে পারলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কমার সম্ভাবনা নেই। আমরা তাঁর দেওয়া এমন কোনো রিপোর্ট বা বক্তব্য স্মরণ করতে পারি না যে সচিবেরা কেউ সেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন। প্রভাবশালী সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব, বিশেষ করে যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সচিবালয়ে কর্মব্যস্ত থাকেন, তাঁদের কারও কোনো আচরণ গত সাড়ে তিন বছরে এ তিনটি সংস্থার রুটিন-কাজে আলোচিত হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ তাঁরা এ তিন প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রণীত আইন কোনো না কোনোভাবে অমান্য করছেন।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে তথ্য অধিকার আইন চালুর পরে দুই বছরের মধ্যেই যথেষ্ট সুফল মেলে। তাদের আইন নকল করে আমরা আইন করলাম। কিন্তু এর কাগুজে উপস্থিতি ছাড়া অন্য কোনো প্রাণস্পন্দন টের পাওয়া যায় না। প্রধান তথ্য কমিশনার বলেছেন, প্রতিটি জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা সম্ভব হলে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা সম্ভব। কিন্তু এমন কোনো তথ্য উদ্ঘাটিত হয় না যে এর ফলে সরকারি কর্মকর্তাদের চোখের ঘুম পালিয়ে যায়। অবশ্য এ তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুই মাস অন্তর সমন্বয় বৈঠক অনুষ্ঠানের চলতি উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।

No comments

Powered by Blogger.