বৃত্তের ভেতর বৃত্ত-উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে এ কোন চিত্র? by দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

'এক-চতুর্থাংশ শিক্ষকই শিক্ষা কার্যক্রমে অনুপস্থিত' শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকে ৬ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে যে তথ্যচিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা উদ্বেগজনক এবং প্রশ্নবোধক। দেশের ৩১টির মধ্যে ২১টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক-চতুর্থাংশ শিক্ষকই মূল শিক্ষা কার্যক্রমে অনুপস্থিত রয়েছেন।


অভিযোগ আছে, তাঁরা ছুটি নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অথবা বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে আবার একাংশ উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে বিদেশে গিয়ে সেখানেই থেকে গেছেন অথবা ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে অন্য কোনো কাজে যুক্ত রয়েছেন। বিষয়টি নীতিগত দিক দিয়েও ন্যায়সংগত কঠোর সমালোচনার। আমরা জানি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাধীনতা অবাধ। কিন্তু স্বাধীনতা অবাধ বলেই কেউ তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে নিজের মতো করে চলবেন, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা (আমার বক্তব্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়), তা তো শুধু অকল্পনীয়ই নয়, দেশ এবং জাতির জন্য বড় ধরনের অশুভ বার্তাও বটে। উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এসব কারণেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমপ্রসার ঘটছে, যেখানে প্রবেশের সামর্থ্য সিংহভাগেরই নেই। একই সঙ্গে রয়েছে মানের প্রশ্নও।
উচ্চশিক্ষা কিংবা গবেষণার জন্য শিক্ষকরা ছুটি নিতে পারেন_এটা নিয়মসিদ্ধ। কিন্তু তা না করে কেউ যদি ছুটি নিয়ে দেশে কিংবা বিদেশে অন্য কোনো কাজে যুক্ত হয়ে নিজেদের লাভের হিসাব কষেন, তাহলে তা একেবারেই অনভিপ্রেত। আমরা এটাও জানি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ এবং ছুটি দানের কাজটি বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সম্পাদন করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিন্ডিকেট এ ব্যাপারে যে উদাসীন এবং যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ নয়, ওই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত তথ্যচিত্র তো তা-ই বলে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনেরও দায়-দায়িত্ব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এ ব্যাপারে কতটা কী করছে, তা অজানা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সিদ্ধান্ত আছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ শতাংশের বেশি শিক্ষক ছুটিতে থাকতে পারবেন না। কিন্তু এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে চলেছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই যে নিয়ম ভাঙছে, এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো জবাবদিহিতা আছে কি? অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান, এ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন যথেষ্ট তৎপর নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছুটি নেওয়ার সংখ্যার দিক দিয়ে এগিয়ে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক অননুমোদিত ছুটি নিয়ে বিদেশে আছেন, তাও জানা গেল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেটের শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও এই নেতিবাচক চিত্র যথেষ্ট পুষ্ট। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে দেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরুদ্বিগ্ন থাকার উপায় আছে কি? এমনিতেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশন জটসহ নানাবিধ কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন পর্যুদস্ত। দেশের উচ্চশিক্ষার এই যে দৈন্যচিত্র, তা দেশ ও জাতির জন্য একটি বড় ধরনের অশুভ চিহ্ন হিসেবে ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষ কি এ দায় এড়াতে পারে?
কয়েক দিন আগে একটি টিভি চ্যানেলের সংবাদে জানা গেল, পাশ্চাত্যের একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপ প্রতিবেদনে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় এশিয়ার প্রথম ২০০টির মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান হয়নি। এর আগে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গবেষণাকারী স্পেনের সবচেয়ে বড় পাবলিক গবেষণা সংস্থা 'কনসেজো সুপিরিয়র ডি ইনভেস্টিসিওন মিয়েন্টিফিকাস' তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে, বিশ্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৫৫৩১তম। ২০০৯ সালে একই সংস্থার গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ৪৯২২তম। অর্থাৎ, এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়টি ৬০৯ ধাপ পিছিয়েছে। এখন যদি ওই সংস্থাটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কততম হবে, তা না ভাবাই শ্রেয়। সাদামাটা বিশ্লেষণে বলা যায়, অধোগতির স্রোত খুবই বেগবান। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানও তুলে ধরা হয়েছে, যা সন্তোষজনক নয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি এগিয়ে আছে। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ব্র্যাক) অবস্থানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরে।
একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গর্ব করে অভিহিত করা হতো প্রাচ্যের অঙ্ফোর্ড হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক আগেই তা খুইয়েছে। অথচ ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবমণ্ডিত শিক্ষাচিত্র ও আন্দোলন-সংগ্রাম-সফলতার ইতিহাস জাতিকে আলোকিত করে। প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পর থেকে দীর্ঘকাল শিক্ষার গুণগত মানসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব কিছুই ছিল ঈর্ষণীয়_ইতিহাস আমাদের এমনটাই জানায়। কিন্তু সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব যোজন যোজন। এই ব্যর্থতার দায়ভার কার? জবাব একেবারে সহজভাবে দিলে বলতে হয়, সবার। কিন্তু আরেকটু বললে বলতে হয়, সরকার এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের। শুনতে শ্রুতিকটু মনে হলেও এটাই সত্য, এই দুই শক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ঘটছে। শিক্ষকরাও এর সুযোগ নিচ্ছেন নানাভাবে। তবে এসব সুযোগসন্ধানীর বাইরেও আদর্শবান-নীতিবান-নিষ্ঠাবান অনেক শিক্ষক এখনো আছেন, যাঁদের কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ধসে পড়েনি। কিন্তু তাঁরা কি ক্রমেই রুদ্ধ হয়ে যাওয়া পথগুলো উন্মুক্ত করতে পারবেন? কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মানদণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা আমাদের দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান কেমন, তা জানার আগে আমরা সান্ত্বনা খোঁজার জন্য হলেও বলতে চাই, এগুলো সত্যিই ভালো প্রতিষ্ঠান। যাঁরা নীতিনির্ধারক, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাঁদের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ, আমাদের স্বপ্ন, আশা ও বিশ্বাস বাঁচিয়ে রাখুন।
শুনেছি, আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উচ্চতর শিক্ষার জন্য অন্যভাবে মূল্যায়িত হতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ক্রমেই যে পর্যায়ে গিয়ে ঠেকছে, কবে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কালো তালিকাভুক্ত হয়ে পড়ে, দুর্ভাবনাটা সেখানেই। বিভিন্ন গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বিবর্ণ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা বর্তমানে সেখানে যা হচ্ছে, তারই প্রতিফলন। এটাও সত্য, প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারের কোনো কোনো ক্ষমতাবান শিক্ষক নিয়োগে কম-বেশি বৈরী ভূমিকা রেখেছেন, নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে শিক্ষার্থীদের কাউকে কাউকে ক্যাডার বানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র-উত্তরপত্রের গোপনীয়তার মোড়ক ছিন্ন করে প্রজন্মের সর্বনাশ ঘটিয়েছেন কোনো কোনো শিক্ষক। তাঁদের প্রিয়ভাজন শিক্ষার্থীকে তথাকথিত ভালো ফলাফলের জন্য দুষ্কর্ম করেছেন_এমন ঘটনাও তো ঘটেছে। এখন কথা হচ্ছে, এ থেকে পরিত্রাণের কি কোনোই পথ নেই?
পথ অবশ্যই আছে। পথ রুদ্ধ করে মানুষ, আবার পথ উন্মুক্ত-কণ্টকমুক্তও করে মানুষই। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, বিশ্বাস রাখতে চাই_এ সমাজে এখনো অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা পঙ্কিলতা, স্ববিরোধিতা আর ব্যক্তিস্বার্থের অনেক ঊধর্ে্ব। আমরা এটাও বিশ্বাস করি, অসংখ্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী আছেন, যাঁরা শিক্ষাদান এবং শিক্ষা গ্রহণকেই মহান ব্রত মনে করেন। যাঁরা এখনো এই কাতারে আছেন, তাঁদের প্রতি বিনীত অনুরোধ_আপনারা উদ্ধার করুন, দেশ-জাতি আপনাদের মনে রাখবে। বিশ্বের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই যাচ্ছে সামনের দিকে, আর আমরা যাচ্ছি পেছনে। কথায় বলে_'ভূতের পা পেছন দিকে'। আমরা তো নিজেদের মানুষ বলে দাবি করি। মানুষ পেছনে নয়, সামনের দিকে যাবে_এটাই স্বাভাবিক। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে যদি 'এখানে একদিন নদী ছিল'-র গল্পের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের অন্যান্য নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প শোনাতে হয়, তাহলে এর চেয়ে বড় পরিতাপের আর কিছুই থাকবে না। আমরা এমন দুঃসহ দিন বা সময়ের মুখোমুখি হতে চাই না। এখনো সময় আছে, সংশ্লিষ্ট সবার শুভবুদ্ধি উদয় হোক।

লেখক : সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.