মাতৃত্বকালীন ছুটি-এ কী কথা বলছে বিজিএমইএ! by মানসুরা হোসাইন

গত ১০ জুলাই প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়লে জন্মহারও বাড়বে—মনে করে বিজিএমইএ’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ অনুযায়ী, মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ ১৬ সপ্তাহ থেকে (৮+৮) বাড়িয়ে ২৪ সপ্তাহ অর্থাৎ ছয় মাস নির্ধারণ করে শ্রম আইন-২০০৬ সংশোধনের প্রস্তাবে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানি ও


প্রস্তুতকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এ ধরনের মতামত দিয়েছে। আর সেটি শ্রম মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এমনকি বর্তমানে প্রচলিত ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটিও বিজিএমইএ অযৌক্তিক মনে করে। এ ছাড়া বিজিএমইএ যুক্তি দেখিয়েছে, দীর্ঘদিন কাজে অনুপস্থিত থাকলে নারী শ্রমিকের কাজের দক্ষতা কমে যাবে এবং কাজে আবার যোগদানের প্রবণতাও কমবে। জনসংখ্যা নিয়ে বিজিএমইএর এই ধরনের তত্ত্বে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবাদ-মিছিলের ঘটনাও ঘটেছে। সংবাদটি প্রকাশের পর ৬৭টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের মোর্চা সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল এবং সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতেও বিজিএমইএর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।

বিজিএমইএ কোন যুক্তিতে এ কথা বলছে বোধগম্য নয়
শিরীন শারমিন চৌধুরী
মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী
সরকার নারীর প্রতি সংবেদনশীল হয়েই স্ববেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি চার মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করেছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ শুধু বাড়াতে বললেই হবে না, এর জন্য সহায়ক বা ইতিবাচক পদক্ষেপও নিতে হবে। যথাযথ পদক্ষেপের অভাবেই নারী বাধ্য হন কাজ ছেড়ে দিতে। নারী সবকিছু পারলেও মাতৃত্বের বিষয়ে আপস করতে পারেন না।
ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়টি এখনো সরকারি কর্মজীবী নারীর জন্য প্রযোজ্য। তবে ব্র্যাক, সিটি ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরকারের এ আইনকে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের জন্যও প্রযোজ্য করেছে।
এ ছাড়া মাতৃত্বকালীন সুবিধা শুধু দুটি সন্তানের বেলায় প্রযোজ্য, তাই বিজিএমইএ কোন যুক্তিতে বলছে, এ ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হলে জন্মহার বাড়বে, তা বোধগম্য নয়।

এটিই কোনো শেষ সিদ্ধান্ত নয়
নাহিদ হাসান
পরিচালক, বিজিএমইএ
শ্রম আইন সংশোধনে বিজিএমইএর বক্তব্যটি মতামত বা প্রপোজাল হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এটিই শেষ সিদ্ধান্ত বা তা মানতেই হবে, বিষয়টি তেমন কিছু নয়। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। ‘জন্মহার বাড়বে’-এর ব্যাখ্যা দিতে বললে আমি মনে করি, প্রপোজালটি লেখার সময় কোথাও ভুল হয়েছে। বিজিএমইএ প্রস্তাবে বলেছে, অফিস-আদালতে কেউ ছয় মাস অনুপস্থিত থাকলে কাজে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু পোশাকশিল্পে ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক কর্মরত, যেখানে কোনো শ্রমিক কোনো পোশাক এককভাবে তৈরি করে না। শার্ট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে একটি লাইনের মধ্যে একজন বডি সেলাই, একজন কলার, একজন কাফ, একজন পকেট তৈরি—এভাবে একেকজন একেকটি কাজ করে। একটি লাইনের মধ্য থেকে একজন দক্ষ শ্রমিক অনুপস্থিত থাকলে উৎপাদনের মাত্রা অনেক কমে যাবে। শূন্যস্থানে শ্রমিক নিয়োগে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়বে।

বিজিএমইএর গবেষণা সবার সামনে তুলে ধরতে হবে
শাহদীন মালিক
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সারা বিশ্বেই মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। এ ছুটি বাড়ানোর ফলে বিজিএমইএর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের বিরূপ প্রভাবের সৃষ্টি হয়েছে বলেও জানা নেই। বিজিএমইএ যদি নিজেদের জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ হিসেবে দাবি করে, তাহলে তাদের পক্ষে যেসব গবেষণা, জরিপ বা প্রকাশনা আছে, তা সবার সামনে তুলে ধরতে পারে। জাতিসংঘের নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদেও বিবাহ বা মাতৃত্বজনিত কারণে নারীর অধিকার নিশ্চিত ও বৈষম্য রোধে শরিক রাষ্ট্রকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এ সনদে গর্ভধারণ অথবা মাতৃত্ব-সংক্রান্ত ছুটির কারণে এবং বৈবাহিক অবস্থার ভিত্তিতে শ্রমিককে বরখাস্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি, চাকরির জ্যেষ্ঠতা, পদমর্যাদা, ভাতা ইত্যাদির সুযোগসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে বলেছে শরিক রাষ্ট্রকে।

বিজিএমইএর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়
শিরিন আখতার
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, কর্মজীবী নারী
প্রথম কথাই হলো, বিজিএমইএর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। এটি নারী শ্রমিকদের জন্য খুবই অবমাননাকর। নারী শুধু উৎপাদনের যন্ত্র—এ ধরনের মানসিক চিন্তার বদল না ঘটলে এ ধরনের বিকৃত চিন্তার জন্ম হয়। নারী সন্তান ধারণ করে শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজকে বহমান রাখতেই তাকে এ কাজ করতে হচ্ছে। তাই সন্তানটির দায়িত্ব নারীর একার নয়। পোশাকশিল্পে প্রায় ৩০ লাখ নারী কর্মরত। এই নারীরা কখন বিয়ে বা সন্তান নেবেন, তা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য এবং টিকে থাকার সংগ্রামে এই নারীরা পরিকল্পিতভাবে সন্তান নিচ্ছেন, তাই জন্মহার বাড়বে বলে বিজিএমইএর বক্তব্য অবশ্যই প্রত্যাহার করতে হবে।
এ ছাড়া মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে একই দেশে সরকারি ও অন্য খাতের কর্মজীবী নারীর জন্য দুই ধরনের আইন চলতে পারে না। শ্রম আইনের সংশোধনীতে অবশ্যই এ ছুটির মেয়াদ ছয় মাস করতে হবে।

এই প্রস্তাব শুধু শ্রমিকবিরোধী নয়, নারীবিরোধীও
ফরিদা আখতার
নারীনেত্রী ও উন্নয়নকর্মী
জনসংখ্যা নিয়ে কথা বলে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রস্তুতকারক সমিতি (বিজিএমইএ) শ্রমিকের অধিকার হরণের আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিজিএমইএ প্রমাণ করেছে, তারা শুধু শ্রমিকবিরোধী নয়, ঘোরতর নারীবিরোধীও। রপ্তানিমুখী পণ্যের ব্যবসায়ীদের সংগঠনটি কবে থেকে জনসংখ্যাতত্ত্বের বিশেষজ্ঞ হলো, তা-ও জানা ছিল না।
ফরিদা আখতার প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিকই কি একসঙ্গে মাতৃত্বকালীন ছুটি নেন?
এ ছুটি নেওয়ার ফলে কতসংখ্যক শার্টের কাফ বা কলার লাগানো যায়নি?

এ বক্তব্য অত্যন্ত অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন
এস কে রায়
সভাপতি, বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ)
আমরা এ বিষয়ে লিখিত প্রতিবাদলিপি দিয়েছি। সেখানে বলা হয়েছে, এ ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত অযৌক্তিক, অপ্রশংসনীয় এবং শিশুর সঠিক বৃদ্ধির বিরোধিতা ও অসহযোগিতা নির্দেশ করে। বিবিএফের প্রতিবাদলিপির কপি বিজিএমইএর মহাসচিব, শ্রম ও জনশক্তিমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। ছয় মাস মাতৃত্বকালীন বা মাতৃকল্যাণ ছুটির জন্য বাংলাদেশ পৃথিবীতে প্রশংসিত হয়েছে। কারণ, জন্মের পর থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর শরীর গঠন, রোগপ্রতিরোধ ও পূর্ণ মেধা বিকাশের সব উপাদান শুধু মায়ের দুধেই পাওয়া যায়, যা একটি শিশুকে ভবিষ্যতে সুস্থ ও বুদ্ধিদীপ্ত করে গড়ে তোলার জন্য একমাত্র পন্থা। মাতৃত্বকালীন ছুটি ২৪ সপ্তাহ করা হলে জন্মনিয়ন্ত্রণ না হয়ে জন্মহার বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করবে—এ বক্তব্য অত্যন্ত অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন। এ ছাড়া পূর্ণ ছয় মাস শিশুকে শুধু মায়ের দুধ খাওয়ালে প্রাকৃতিকভাবে (ল্যাকটেশন অ্যামেনোরিয়া) ৯৮ শতাংশ জন্মনিরোধ হয়। বিবিএফ মনে করে, ছয় মাস ছুটি দেওয়া না হলে জন্মের পর থেকে পূর্ণ ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো বাধাগ্রস্ত হবে। শিশুকে বোতলের দুধ খাওয়াতে হবে, যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। পাশাপাশি কর্মীদের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ হিসেবেও চিহ্নিত হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, একটি শিশুর মৃত্যু হলে সেই পরিবারে এর বিনিময়ে তিনটি শিশুর জন্ম হয়। তাই বোতলে দুধ খাওয়ালে শিশুমৃত্যুর জন্য প্রকারান্তরে বেশি শিশুর জন্ম হবে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার ৪৩ থেকে বেড়ে ৬৪ শতাংশ হয়েছে, যা জাতিসংঘের সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১৬ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ করার কথা ছিল। এ ক্ষেত্রে মাতৃত্বকল্যাণ ছুটি ছয় মাস করার বিষয়টি অবশ্যই গুরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

কর্মক্ষেত্র আরও শ্রমিকবান্ধব করতে হবে
মোশরেফা মিশু
সভাপতি, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম
বিজিএমইএ নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কতটা অশোভন আচরণ করে ও অবজ্ঞা করে, তা তাদের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট। শ্রম আইনে যে বিধানটুকু আছে, তা-ও মানতে চায় না মালিকপক্ষ। কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ শ্রমিকবান্ধব ও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন চলছে। তবে যেতে হবে আরও বহুদূর।

No comments

Powered by Blogger.