পরাজিতের লেখা ইতিহাস by জামান সরদার

আমাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সম্প্রতি আরেকটি বই প্রকাশ হয়েছে পাকিস্তানে_ 'নিজ দেশে আগন্তুক' (এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি : ইস্ট পাকিস্তান, ১৯৬৯-৭১)। লেখক যথারীতি জনৈক জেনারেল_ মেজর জেনারেল (অব.) খাদিম হুসাইন রাজা।


'যথারীতি' এই কারণে যে ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পাকিস্তান থেকে যেসব বই প্রকাশ হয়েছে, তার প্রায় সবই সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের লেখা। বইটির ভূমিকাতেই জানা যাচ্ছে, সেই তালিকায় রয়েছেন একজন জেনারেল, একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল, চারজন মেজর জেনারেল এবং দু'জন ব্রিগেডিয়ার।
ভূমিকা লিখেছেন প্রকাশক সংস্থা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের সম্পাদকীয় পরামর্শক এবং ইতিহাসবিদ ও সাহিত্য সমালোচক মুহাম্মদ রেজা কাজিমি। তিনি মনে করেন, সহ-লেখকদের সঙ্গে খাদিম হুসাইন রাজার পার্থক্য হচ্ছে, তিনি বই লিখে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নিজের ভূমিকা সাফাই গাইতে চাননি (বরং সংবাদমাধ্যমসূত্রে জানা যাচ্ছে, পরিবারকে বলে গিয়েছিলেন বইটি তার মৃত্যুর পর প্রকাশ করতে)। তিনি কেবল ঘটনার অকপট বর্ণনা ও উন্মোচনমূলক তথ্যই দেননি; মুক্তিযুদ্ধের কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশি পক্ষের বক্তব্যও সমর্থন করেছেন এবং অন্যদের বিবেচনা করতে বলেছেন। কিন্তু কাজিমি মনে করেন, একটি কারণে একজন সাহসী, উচিত বক্তা ও দেশপ্রেমিক যোদ্ধার এই বই ব্যক্তিগত স্মৃতি ছাপিয়ে সঠিক ইতিহাসের মর্যাদা পেতে পারে না। তা হচ্ছে, তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থার বৈধতা অস্বীকার করেননি। সাংবিধানিক যে সংকট পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী তৈরি করেছিল তার কাছে তাও ধর্তব্য নয়। তখনকার পরিস্থিতিতে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যেও নৈতিক ঘাটতি ছিল না। রাজা বরং মনে করেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি থাকলে, সামরিক বাহিনী যুদ্ধটাকে সিরিয়াসলি নিলে ১৯৭১ সালের পরিস্থিতি তৈরি হতো না বা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটত না। তার মতে, পশ্চিম পাকিস্তানি অবাঙালি ও বিহারিদের সম্পর্কে বাঙালির হৃদয়ের গভীরে গ্রোথিত জাতিগত বিদ্বেষই ১৯৭১ সালে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। সোজা কথায়, মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে পাকিস্তানের অবাঙালির প্রতি বাঙালির বিদ্বেষের ফসল!
এই জাতীয় তথ্য ও মতই তো পাকিস্তানিরা গত ৪০ বছর ধরে ইনিয়ে-বিনিয়ে পরিবেশনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে যে মুক্তিযুদ্ধ ছিল গাঙ্গেয় অববাহিকার মানুষের হাজার বছরের আকাঙ্ক্ষার ফসল, সেটা বুঝতে পাকিস্তানিদের আরও সময় লাগবে। জাতিগত বিদ্বেষ? সেও কিন্তু পাকিস্তানি মসলাই। খাদিম রাজা দেখাতে চেয়েছেন বটে ঊনসত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে সাধারণ বাঙালিরা কীভাবে কথায় কথায় 'শালা পাঞ্জাবি' বা 'শালা বিহারি' শব্দ ব্যবহার করত; তার নিজের বইয়েই পাকিস্তানিদের বাঙালিবিদ্বেষ স্পষ্ট। রয়েছে বঙ্গীয় ব-দ্বীপের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি সম্পর্কে অজ্ঞতার অনেক উদাহরণ।
রাজার মতে, বাঙালি ও অবাঙালির মধ্যে নৃতাত্তি্বক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক যে পার্থক্য ছিল, 'হিন্দু সংখ্যালঘুরা' সেটার 'সুযোগ' নিয়ে পাকিস্তানে ইসলাম ধর্মের বন্ধন সুদৃঢ় হতে দেয়নি। তিনি বলেছেন কীভাবে 'প্রথমেই আঘাত এসেছিল উর্দু ভাষার ওপর।' তার আফসোস_ 'বাঙালিদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার কোনো সুযোগ বিহারিদের দেওয়া হয়নি।' অথচ 'তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির মাধ্যমে' বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান এক হয়ে গিয়েছিল! বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কেন 'সমস্যার তলাবিহীন কুয়াকে' সোনার বাংলা বলতেন এবং প্রত্যেক বাঙালি কেন তা বিশ্বাস করত_ সে নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে বইটিতে। তার বিরক্তি, গলির মধ্যে অট্টহাসি দিলেও 'বাঙালিরা পিঁপড়ার সারির মতো এসে হাজির হয়!' আরও আছে_ বাঙালির স্বাস্থ্য ভালো না, জমি এত ছোট যে ট্রাক্টর দূরে থাক গরু দিয়ে চাষ করা যায় না ইত্যাদি।
বাঙালিদের ব্যাপারে পাকিস্তানির এই মনোভাব নতুন কী? খাদিম হুসাইন রাজার মতো অনেকেই মুক্তিবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে দেশে ফিরে এভাবে ঝাল মেটাতে চেয়েছেন।
কথায় আছে, ইতিহাস বিজয়ীর লেখা। পরাজিতরা লিখলে কী দাঁড়ায়, তার নমুনা বোধহয় এই বইটি।
zsardar2012@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.