পদ্মা সেতুতে আবার বিশ্বব্যাংকের আলো! by পার্থ সারথি দাস

সৈয়দ আবুল হোসেন মন্ত্রীর পদ ছাড়ায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের সম্ভাবনা আবারও উঁকি দিচ্ছে। মালয়েশিয়া ও চীনের প্রস্তাব পেছনে ফেলে এখন অনেকের চোখ বিশ্বব্যাংকের দিকে। গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে অর্থায়ন স্থগিত করে।


ওই সময়ই বিশ্বব্যাংক চেয়েছিল, শুধু আবুল হোসেনকে যেন মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়। সরকার এরপর ডিসেম্বরে আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়। কিন্তু আবুল হোসেনকে মন্ত্রীর পদে রেখে দেওয়ার বিষয়টি বিশ্বব্যাংক ভালোভাবে নেয়নি। গত জুন মাসে বিশ্বব্যাংক আবুল হোসেনের ব্যাংক হিসাব এবং তিনি কোন কোন দেশ সফরে গেছেন তা খতিয়ে দেখার জন্য চাপ সৃষ্টি করে বাংলাদেশ সরকারের ওপর। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তাদেরও পরামর্শ দেয় বিশ্বব্যাংক। এই পর্যায়ে সরকার মালয়েশিয়ার অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে উৎসাহী হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাংক কর্তৃপক্ষ চলে যায় চরম অবস্থানে।
গত ২৯ জুন বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে তাদের ঋণচুক্তি বাতিল করে। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নের কথা বলতে শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য অর্থ তোলা শুরু হয়। এই অবস্থায় আবুল হোসেনের পদত্যাগ অনেক হিসাব পাল্টে দিয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও সেতু বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আমলাদের একটি অংশ বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আসছিল। তাঁদের মধ্যস্থতায় বিশ্বব্যাংকের কাছে অর্থায়নের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য নানাভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অবশ্য এর মধ্যে সরকারও বিশ্বব্যাংকের দেওয়া সব শর্ত পূরণ করেছে। আবুল হোসেনের পদত্যাগ এর সর্বশেষ ঘটনা।
জানা গেছে, আবুল হোসেনের পদত্যাগের বিষয়টি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের ওয়াশিংটনের দপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ দপ্তরের যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহরীন মাহবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আবুল হোসেনের পদত্যাগের বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের অফিসের মাধ্যমে ওয়াশিংটন অফিসকে জানিয়েছি। আবুল হোসেনের পদত্যাগের বিষয়টি আমরা আগে থেকে জানতাম না। গণমাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি।' এই মুহূর্তে এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আবুল হোসেনের পদত্যাগের বিষয়টি এখনো ম্যাচিউর হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আবুল হোসেনের পদত্যাগের পর পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের বিষয়ে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গতকাল সেতু ভবনে গেলে অনেক কর্মকর্তাই এ আশাবাদ প্রকাশ করেন। সরকার বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের বিষয়টি সামনে রেখেই এখন এগোচ্ছে। এর পাশাপাশি সেতু ভবনে মালয়েশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাবনার যাচাই-বাছাইও চলছে। গতকাল সেতু ভবনে প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন মেনে শুরু থেকে এগোলে ১০ মাস সময় নষ্ট হতো না। আবুল হোসেনকে সরানো বিশ্বব্যাংকের অন্যতম শর্ত ছিল। কিন্তু সেই শর্তই সরকার মেনেছে অনেক জল ঘোলা করে। এখন যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করবেই এরও কোন নিশ্চয়তা নেই।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. সফিকুল ইসলাম গতকাল বলেন, 'আমরা প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য কাজ করছি। প্রকল্প এলাকাও প্রস্তুত। এখন সরকার যেভাবে অর্থায়ন করবে সেদিকেই আমাদের চেয়ে থাকতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে মালয়েশিয়ার কাছ থেকে চলতি মাসের মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব আসার কথা রয়েছে। এর বাইরে চীনের একটি ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব এসেছে। আমার কাছে এ ধরনের চারটি প্রস্তাব রয়েছে।'
জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করার পর সরকারের সামনে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প উপায় হয়ে দাঁড়ায় মালয়েশিয়ার প্রস্তাবটি। আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে মালয়েশিয়া পদ্মা সেতু নির্মাণের দায়িত্ব পেতে গত বছরের নভেম্বর থেকেই সচেষ্ট রয়েছে। সর্বশেষ গত ২৮ জুন মালয়েশিয়ার ১৩ সদস্যের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে ঋণচুক্তির উদ্দেশ্যে এই প্রকল্পের প্রস্তাব যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের হাতে তুলে দেয়। সেতু বিভাগের চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে মালয়েশিয়া সফর করে এসেছে। এই দলে প্রকল্প পরিচালক সফিকুল ইসলামও ছিলেন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে।
পদত্যাগের পর আবুল হোসেন : এদিকে পদত্যাগের পর নিজের গুলশানের বাসায়ই অবস্থান করছিলেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। সোমবার দিনের বেশির ভাগ সময়ই তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। গত রবিবার মন্ত্রী হিসেবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে তিনি তাঁর দপ্তরে সর্বশেষ অফিস করেন।
গতকাল সকালে মোবাইল ফোনে আলাপকালে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, 'কয়েক দিন আগে আমি আমার নির্বাচনী এলাকা কালকিনিতে গিয়ে আমার এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম। আসলে আমার ওপর কোনো ধরনের চাপ ছিল না। কিন্তু প্রতিদিনই টেলিভিশন টক শো, বিভিন্ন সংবাদপত্রের লেখায় অনেক বুদ্ধিজীবী আমার পদত্যাগের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। মূলত তাঁদের পরামর্শ বা মতামতের ভিত্তিতেই আমি নিজে সরকারি কাজের সঙ্গে আর সম্পৃক্ত থাকতে চাইনি। বিশ্বব্যাংকের তোলা দুর্নীতির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনে আমি সরে এসেছি।'
আবুল হোসেনের ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে জানা গেছে, পদত্যাগপত্র দেওয়ার পর থেকেই তিনি অনেককে এড়িয়ে চলছেন এবং নীরবে-নিভৃতে সময় কাটাচ্ছেন।
জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত সোমবার রাতে হঠাৎ করেই গুলশানে সৈয়দ আবুল হোসেনের বাড়িতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সময় আবুল হোসেন বাসায় ছিলেন না। অনেকের ধারণা, তিনি ইচ্ছা করেই অর্থমন্ত্রীকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। তবে এ ব্যাপারে গতকাল আবুল হোসেন বলেন, 'অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ। এ জন্যই তিনি আমার কাছে এসেছিলেন। আমারই তো তাঁর কাছে যাওয়ার কথা ছিল। তবে দুঃখজনক যে তিনি যখন রাতে আমার বাসায় এসেছিলেন, তখন আমি ছিলাম ছোট ভাইয়ের বাসায়।'

No comments

Powered by Blogger.