অস্থির বাজার

বাজার অস্থির। বাজার এখন সবার মাথাব্যথার কারণ। এমন কিছুই নেই যার দাম বাজারে বাড়েনি। চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী, দাম বেড়েছে চিনির। তেলের দাম তো সাধারণের আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে অনেক আগেই। এখন তেলই বাজার থেকে উধাও হওয়ার পথে। শুধু চাল-তেল-চিনি নয়, মৌসুমের সবজির দামও এখন আকাশছোঁয়া।


দাম বাড়ারও একটা সীমা থাকে। এখন সেটা চলে গেছে রীতিমতো বাড়াবাড়ির পর্যায়ে। নিম্নবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত নয়, সমাজের নিয়ামক শক্তি ও সংখ্যাগুরু মধ্যবিত্ত শ্রেণীও এখন দ্রব্যমূল্যের চাপে রীতিমতো নিষ্পেষিত। এমনকি খোদ সরকারপ্রধানও বাজার নিয়ে চিন্তিত। ওদিকে ওএমএসের ট্রাকের সামনে চাল নিতে আসা মানুষের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। এই সারি দেখেই সার্বিক অবস্থা অনুধাবন করা যায়। দ্রব্যমূল্য সহনশীল রাখতে ওএমএস এবং আরো অনেক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। কিন্তু কোনো দাওয়াই কাজে আসছে না। কোনোভাবেই আর বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অদৃশ্য নিয়ন্ত্রকদের হাত থেকে বাজারকে বশে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
গত কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, বাজার কোনোভাবেই বশে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বাজারে এক অদৃশ্য শক্তির কথা শোনা যায়। সিন্ডিকেট নামের সেই অদৃশ্য শক্তিকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সিন্ডিকেট বাজারজুড়ে সক্রিয়। কিছুদিন আগে এক মন্ত্রী মহোদয় বেশ হুংকার দিয়েছিলেন। সিন্ডিকেট ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর এখন খুব একটা শোনা যায় না। রহস্যজনক মৌনব্রত নিয়েছেন তিনি। বাধ্য হয়েই বোধ হয় বাজার নিয়ে মুখ খুলতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে উন্নয়ন বন্ধ রেখে খাদ্য আমদানি করা হবে। সংসদে তাঁর এমন বক্তব্যের যৌক্তিক কারণটিও সহজে বোধগম্য। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার মুখে লাগাম দিতে ব্যর্থ সব সরকার। এমনকি ব্র্যাকেটে সেনা সমর্থন নিয়ে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর দেশ শাসন করেছে, সেই সরকারও বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। উল্টো ওই সরকারের আমলেই যেন বাজার বেশি অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। দ্রব্যমূল্যের সেই ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা রুখতে ব্যর্থ এই গণতান্ত্রিক সরকারও।
উপলক্ষের পাশাপাশি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কিছু অজুহাতও অনেক সময় তৈরি করা হয়। একটি মোক্ষম অজুহাত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি। কিন্তু চালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও দেশের বাজারে বাড়ছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা বিশ্ব খাদ্য পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বলেছে, প্রতি টন চালের রপ্তানিমূল্য চার শতাংশ কমেছে। আবার এবারে আমাদের দেশে উৎপাদন যা হয়েছে, তাতে আমদানির ওপর খুব একটা নির্ভর করতে হবে না। এ অবস্থায় বাজার কেন অস্থিতিশীল হবে? আবার বাজারে শুধু চালের দাম বাড়ছে না। চাল-আটার সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সব জিনিসের দাম। অর্থাৎ ধরেই নেওয়া যায় যে একটি পক্ষ সরকারকে বিপাকে ফেলতে সক্রিয়। বাজার অস্থির করে সরকারকে ব্যর্থ ও অজনপ্রিয় করতে চায় এই পক্ষ। বাজার নিয়ে গত দুই বছরে সরকারের যে অভিজ্ঞতা তাতে নিজস্ব একটি বিকল্প বাজার সরকারকে গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজন টিসিবিকে সক্রিয় করা। কিন্তু সে দিকে সরকারের মধ্যে দায়িত্বশীলদের কোনো ভূমিকা আছে বলে মনে হয় না। টিসিবি বা বিকল্প বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। সেটা কেন হচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে সিন্ডিকেটের কথা ওঠে। আলোচনায় চলে আসে সিন্ডিকেট। সর্ষের মধ্যে যেমন ভূত থাকে, সে রকম সরকারের মধ্যে সিন্ডিকেটের কেউ লুকিয়ে নেই তো?

No comments

Powered by Blogger.