কচ্ছপ দ্বীপ by আহমেদ হেলাল

বালি দ্বীপের জেটি থেকে গ্লাস বটম বোটে করে যেতে হবে ‘পুলাও পেনু’তে। ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় পুলাও মানে দ্বীপ আর পেনু মানে কচ্ছপ। বিরল প্রজাতির কচ্ছপ সংরক্ষণ এবং প্রজননের জন্য তিনটি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে তৈরি এই ‘কচ্ছপ দ্বীপ’। অবশ্য এর মধ্যে কেবল সেলিংগান দ্বীপটি ট্যুরিস্টদের জন্য উন্মুক্ত। আমাদের গন্তব্য সেখানেই।


গ্লাস বটম বোট মানে হচ্ছে নৌকার তলাটা স্বচ্ছ কাচের। ইঞ্জিনচালিত বোটটি চালু হওয়ার পর তেমন কিছু বোঝা গেল না। সমুদ্রের মাঝামাঝি এসে চালক আমাদের হাতে বেশ বড় বড় দুই প্যাকেট পাউরুটি দিলেন, সঙ্গে ছিলেন ডা. হাসনাত স্যার, বয়সে আমাদের সবার চেয়ে প্রবীণ হলেও মনটা পুরোপুরি তরুণ, তিনি তাঁর উত্তরবঙ্গের ভাষায় মাঝিকে সাফ জানিয়ে দিলেন—না, আমাদের ক্ষিধে নেই! মাঝি ভাষা বুঝল কি না জানি না, তবে ভাঙা ভাঙা ইংরেজি আর ইশারায় আমাদের বোঝাল যে রুটিগুলো আমাদের খাওয়ার জন্য নয়, এগুলো পানিতে ফেলতে হবে; তাতে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ আসবে আর নিচের কাচ দিয়ে সেসব দেখা যাবে। আমরা রুটি ফেলতে শুরু করতেই অসংখ্য ছোট-বড় রঙিন মাছ জমা হলো নিচে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য—কালো-লাল-হলুদ নানা রঙের মাছ আর প্রবাল। আকাশে উড়ছে নানা রঙের প্যারাস্যুট। ট্যুরিস্টরা স্পিডবোটের সঙ্গে বাঁধা এসব প্যারাস্যুট ব্যবহার করে চিৎকার করতে করতে উড়ছেন।
দূর থেকে দেখা যাচ্ছে কচ্ছপ দ্বীপ। আস্তে আস্তে আমাদের নৌকা পাড়ের কাছাকাছি এল। প্রায় এক হাঁটুপানির মধ্য দিয়ে হেঁটে দ্বীপে উঠলাম। পুরো দ্বীপটিই কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র। প্রজনন মৌসুমে বালুময় সাগরতীরে হাজার হাজার কচ্ছপের বাচ্চা হেঁটে বেড়ায়। সে সময় দ্বীপের ওই অংশে ট্যুরিস্টদের যেতে দেওয়া হয় না। দ্বীপে ঢোকার মুখেই একটি গেট, সেখান দিয়ে ঢুকে পড়লাম ‘টার্টল ফার্ম’-এ। সেখানে কেবল কচ্ছপ নয়, আছে কমোডো ড্রাগন, বড় বড় বাদুড়, অজগর, বাজপাখিসহ নানা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী। ছোট ছোট প্লাস্টিকের বালতিতে রাখা আছে শত শত কচ্ছপ; সেগুলোকে ডিম উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। এরপর নতুন বাচ্চা-কচ্ছপগুলোকে কিন্তু কোনো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হয় না, ছেড়ে দেওয়া হয় সাগরে। এভাবে বছরে ৫০ হাজারের মতো কচ্ছপ সমুদ্রে ছাড়া হয়। প্রকৃতির নিয়মে তার কিছু অংশ অন্য জলজপ্রাণীর খাদ্যে পরিণত হয় ঠিকই, কিন্তু সাগরে রয়ে যায় বেশির ভাগ। একটি ছোট জায়গায় কয়েকটি বড় বড় কচ্ছপ রাখা আছে। এর মধ্যে একটির বয়স ৭০ বছর বলে জানালেন ফার্মের সদা হাসিখুশি কর্মী অ্যানা। সবাই দূর থেকে দেখছিলাম, অ্যানা হঠাৎ আমাদের বলল, ‘তোমরা এখানে নেমে কচ্ছপগুলোকে ধরতে পারো।’ সঙ্গে সঙ্গে নামার জন্য প্রস্তুত সবাই, কেবল ক্যামেরা হাতে তৈরি নিপসমের ডা. শামীম আর সব ছবিতেই মডেলের মতো দাঁড়াতে পছন্দ করেন বগুড়ার ডা. মিশু ভাই। এরপর শুরু হলো বাজপাখির সঙ্গে ছবি তোলা এবং শেষ পর্যন্ত বাদুড় ধরে ধরে সেগুলোর সঙ্গে ছবি তোলার পর্ব। ডা. হাসনাত স্যারের ঘাড়ে প্রায় জোর করে অজগর চাপিয়ে দেওয়ার পর স্যারের নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়। চোখ বন্ধ করে স্যার হঠাৎ ইংরেজিতে বলা শুরু করলেন, ‘রিমুভ ইট, রিমুভ ইট...।’ আমি সাহস দেখিয়ে সাপ ঘাড়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম, অন্য কোনো ভয় নেই, কিন্তু এর ওজন অনেক বেশি। কেবল কমোডো ড্রাগনকে বাইরে থেকেই দেখতে হলো, হাতে ধরা গেল না, ওগুলোর লালায় নাকি অনেক বিষ। একটা জায়গায় দেখলাম বেশ খানিকটা বালু ঘেরাও করে রাখা আছে। ওখানে কচ্ছপের ডিম রয়েছে, বাইরে থেকে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। এদিকে আমাদের সময় শেষ হয়ে আসছে, ফিরতে হবে। আবার নৌকায় চড়ে ফেরার পালা। ফিরে যাচ্ছি বালি দ্বীপের মূল ভূখণ্ডে।

No comments

Powered by Blogger.