পশ্চিমবঙ্গ-ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা by পার্থ চট্টোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েকটি নির্বাচনে ভোট মানেই ছিল বুথ জ্যাম, ছাপ্পা ভোট অথবা লাশ পড়ে যাওয়া। ত্রাস আর লাশের রাজনীতি এখনও চলছে এ রাজ্যে; কিন্তু এবার অনেক কম। বিশেষ করে এই 'পিসফুল ভোট'কে অনেকে বলেছেন, এটা ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।


এটা সম্ভব হয়েছে শুধু কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীর জন্য আর নির্বাচন কমিশনের 'শ্যেন চক্ষু'র ফলে। কিন্তু দেখুন না এরপর কী হয়।


পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে আবার উঠল বাংলাদেশের প্রসঙ্গ। বামফ্রন্ট সরকারের আবাসনমন্ত্রী গৌতম দেব কলকাতার একটি প্রধান টিভি চ্যানেলে (স্টার আনন্দ) অভিযোগ করে বসলেন, মমতার যে নির্বাচনী স্লোগান_ 'মা-মাটি-মানুষ' সেটি মোটেই তার মৌলিক নয়, বাংলাদেশের নেত্রী খালেদা জিয়ার 'মা-মাটি-মানুষ' স্লোগান থেকে টোকা। খালেদা নাকি তার নির্বাচনে এ স্লোগানটি প্রথম ব্যবহার করেন। সিপিএমের এই মন্ত্রী সাম্প্রতিককালে বিতর্কমূলক কথাবার্তা বলে এবং অঙ্গভঙ্গি সহকারে মমতার বিরুদ্ধে নানা রসাল কথা বলে রাতারাতি লোকসমক্ষে এসে গেছেন। সিপিএম দলের অনেকে বলতে শুরু করেছেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিকল্প হিসেবে ওকেই এখন ভাবা যেতে পারে। কাজেই মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও আবাসনমন্ত্রী গৌতম দেবের মধ্যে এখন প্রতিযোগিতা চলছে কে কত তীব্র ভাষায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলকে আক্রমণ করতে পারেন। গৌতম বাবু ইতিমধ্যেই মমতার বিরুদ্ধে কালো টাকা ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন নির্বাচন কমিশনারের কাছে। পাল্টা সুর চড়িয়ে বুদ্ধদেব বলেছেন, মমতার টাকা পাপের টাকা।
মমতা যেদিন থেকে রাজনীতি শুরু করেন সেদিন থেকে তিনি নিজের দলের ভেতর (তখন তিনি কংগ্রেসে ছিলেন) ও দলের বাইরে সিপিএমের প্রধান আক্রমণের লক্ষ্য। এক সময় কংগ্রেস নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায় তার নাম দিয়েছিলেন 'বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না' (একটি বাংলা ছবির নাম)। কংগ্রেসে থাকার সময় তার সঙ্গে বিরোধ বাধে তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্রের। এই বিরোধ যখন তুঙ্গে তখন মমতা একবার প্রকাশ্য সভায় গলায় রুমাল বেঁধে সভার মধ্যে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন। সে সময় অনেকে ঠাট্টা করে বলত, সোমেন ও মমতার বিয়ে দিয়ে দাও, তাহলেই ওদের ঝগড়া থামবে। সে সময় সোমেন মিত্র সুযোগ্য ব্যাচেলর। মমতাও কুমারী। তারপর সোমেন বাবু বিয়ে করেন। তার পত্নী শিখাও তার সঙ্গে রাজনীতি করেন। তবে মমতা আজও চিরকুমারী। ভাগ্যের এমন পরিহাস সোমেন মিত্র এখন মমতার তৃণমূলে। তিনি তৃণমূলের টিকিটে এখন সাংসদ। আর তার পত্নী তৃণমূলের বিধায়ক পদে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনী পোস্টারে তার জনপ্রিয় স্বামীর পরিচয় নেই, আছে তার পাশে তৃণমূল নেত্রী মমতার ছবি। এখন তৃণমূলের সব প্রার্থীর ছবির পাশে মমতার ছবি থাকা আবশ্যক। তৃণমূলের প্রত্যেক প্রার্থী ও নেতা বক্তৃতায় বারবার মমতার নাম করেন। অবশ্য প্রচারে লাইফ সাইজ ছবির কাটআউট ব্যবহার ও নেতা-নেত্রীর ছবি ব্যবহার করা ইন্দিরা গান্ধীর সময় থেকে কংগ্রেসের কালচার ছিল। এখন একমাত্র সিপিএম ছাড়া সবাই এই কালচার গ্রহণ করেছে। তৃণমূল তবু এক ঈশ্বরীবাদী। সেই ঈশ্বরী মমতা। কিন্তু কংগ্রেসের তো ট্রিনিটি বা ত্রিঈশ্বর। সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী আর মনমোহন সিং। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের চতুর্মুখ। এই চতুর্থ মুখটি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের। প্রণব বাবু কংগ্রেসের ৬৫ জন প্রার্থীকে জেতানোর জন্য বেশিরভাগ দিনই দিলি্ল-কলকাতা ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করছেন। বিশেষ করে তার ছেলেকে তিনি তার জেলা থেকে বিধানসভায় দাঁড় করিয়েছেন। ছেলেকে জিতিয়ে রাজনীতিতে থিতু করে তবে তার ছুটি। তবে লোকে বলে তিনি ছেলেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বেশি দিন ফেলে রাখবেন না। ২০১৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে তিনি ছেলেকে দাঁড় করিয়ে দিলি্ল নিয়ে আসবেন। এখন ভারতের অনেক প্রবীণ নেতাই এটি করছেন। ছেলে বা মেয়েদের রাজনীতিতে নিয়ে আসছেন। পশ্চিমবঙ্গেও এটি শুরু হয়ে গেছে। বিদায়ী বিধানসভার স্পিকার হাসিম আবদুল হালিম তার ছেলেকে কলকাতার একটি কেন্দ্র থেকে দাঁড় করিয়েছেন। কেন্দ্রীয় তৃণমূল মন্ত্রী মুকুল রায় তার ছেলেকে দাঁড় করিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন পাঁচটি পর্যায়ে হচ্ছে। এর মধ্যে ৪টি পর্যায়ের নির্বাচন শেষ হয়ে গেছে। আজ ১০ মে শেষ পর্যায়ের নির্বাচন। ১৩ মে একদিনেই ভোটের ফলাফল বের হবে। তখনই জানা যাবে মমতার পরিবর্তন না খোকা বাবুর প্রত্যাবর্তন? বামফ্রন্টের নেতারা সোচ্চারে দাবি করে যাচ্ছেন এবারও বিপুল ভোটাধিক্যে তারা অষ্টম বামফ্রন্ট গঠন করে ধীরে ধীরে নবম তারপর দশম বামফ্রন্ট তৈরি করে বাম শাসনের অর্ধশতাব্দী উদযাপন করবেন। এ দিকে লক্ষ্য রেখে তারা এবার ১৪৯টি আসনে নতুন মুখ দিয়েছেন। পোড়খাওয়াদের সরিয়ে এমনসব তরুণ মুখ আমদানি করেছেন, যারা দশম বামফ্রন্ট পর্যন্ত টিকে থাকবেন। কিন্তু জনসাধারণের সন্দেহ, ২০১১ সালের ধাক্কা বামরা সামলাতে পারবে তো?
তবে আর যাই হোক একথা বলা যায়, নির্বাচন কমিশনের অতি সতর্কতার ফলে এবারের নির্বাচন খুব শান্তিতে হয়েছে। ভোটও পড়েছে গড়ে ৭৫ শতাংশের মতো। জেলাগুলোতে ভোটদানের শতকরা হার ৮০ ছাড়িয়ে গেছে। কী করে এত ভোট পড়ছে? আগে অনেকে গোলমালের ভয়ে ভোট দিতে বেরুত না। এবার সে ভয়টা নেই। বিরোধীরাই বরং মারমুখী; কিন্তু বামফ্রন্টও চুপ করে বসে নেই। তারাও কতগুলো স্পর্শকাতর জায়গায় পালটা মার দিচ্ছে। তবে মোটের ওপর ভোটের পর তেমন উত্তেজনা ঘটেনি। কিন্তু লোকে আশঙ্কা করছে ভোটের পর কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনী ফিরে যাবে তাদের ব্যারাকে, তখন সেই সুযোগে দুই প্রতিযোগী শক্তি পরস্পরকে পাল্টা আক্রমণ করতে পারে। সিপিএম ক্যাডারদের মধ্যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তৃণমূল ক্ষমতায় এলে তাদের অনেককে পাড়াছাড়া হতে হবে। ১৯৭২ সালে ঠিক এমনটি হয়েছিল। মমতার এ জন্য স্লোগান : 'বদলা চাই না, বদল চাই'। বাঙালি খুবই রসিক। তাই একজন রঙ্গ করে কাগজে লিখেছেন, 'বদলা চাই না, শুধু বাদলা চাই'। এই এপ্রিল-মে মাসে বাংলা তেতেপুড়ে থাকে। এ সময় নির্বাচন করতে কালঘাম ছুটে যায়। কিন্তু সত্যিই কী আশ্চর্য! এ সময়টা প্রায় দিনই মেঘে মেঘে বেলা কেটে যাচ্ছে। কলকাতায় গত ২৭ এপ্রিল ভোটের দিন তো ঝম ঝম করে বৃষ্টি। তা ওই বৃষ্টির মধ্যেও ছাতা মাথায় লাইন দিয়ে ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। আবার প্রচণ্ড রোদে ঠায় দাঁড়িয়ে ৮০ শতাংশের ওপর ভোটার ভোট দিলেন গ্রামবাংলায়। ভোটের দিনগুলোতে এ প্রতিবেদক একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলে ভাষ্য দিচ্ছিলেন। সেখানে কয়েকজন বাংলাদেশি যুবকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছিল। কলকাতায় ভোট কেমন দেখছেন বলুন। তারা বললেন, ভোটের দিন খুব উত্তেজনা থাকবে ভেবেছিলাম, এখানে এসে ভোট হচ্ছে বলে মনেই হলো না। শুধু রাস্তাঘাট সুনসান। ভোটকেন্দ্রে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভোট দিয়ে চলে যাচ্ছে।
এটি আমারও মনে হয়েছে। ১৯৫২ সাল থেকে সবক'টি ভোটই তো দেখলাম। অন্য রাজ্যের ভোটও তো দেখেছি। ভোট মানে হৈ-হট্টগোল। পোস্টার-ফেস্টুন-পার্টি পতাকায় মুড়ে ভোটকেন্দ্রের চেহারা একেবারে আলাদা করে দেওয়া। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েকটি নির্বাচনে ভোট মানেই ছিল বুথ জ্যাম, ছাপ্পা ভোট অথবা লাশ পড়ে যাওয়া। ত্রাস আর লাশের রাজনীতি এখনও চলছে এ রাজ্যে; কিন্তু এবার অনেক কম। বিশেষ করে এই 'পিসফুল ভোট'কে অনেকে বলেছেন, এটা ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা। এটা সম্ভব হয়েছে শুধু কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীর জন্য আর নির্বাচন কমিশনের 'শ্যেন চক্ষু'র ফলে। কিন্তু দেখুন না এরপর কী হয়।
'সিনিকে' কি-না বলে, ছাগলে কি-না খায়। সবার মুখে মুখে পরিবর্তনের হাওয়া, কিন্তু 'সিনিক'রা বলছেন, দাঁড়ান না, ১৩ তারিখ আসতে দিন। বামফ্রন্ট অপরাজেয় ভোটশিল্পী। তাদের হারানো অত সহজ নয়। মমতার একটি পোস্টার আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়। সিনিকের কথা, এ স্লোগানটি জীবনানন্দ থেকে মমতাপন্থিরা চুরি করলে কী হবে, এটি আসলে বামফ্রন্টের স্লোগান।
এবার ভোটে অবামপন্থি বিদ্বজ্জনরা ভীষণ সরব একটি ইস্যুতে। প্রকাশ্য সভায় মমতার বিরুদ্ধে লোক ক্ষ্যাপাতে গিয়ে সিপিএমের এক সাবেক সাংসদ অনিল বসু মমতাকে সোনাগাছির (কলকাতার বিখ্যাত নিষিদ্ধ পল্লী) আবাসিকাদের সঙ্গে তুলনা করে বললেন, ওরা পয়সাওয়ালা, নতুন নাগর পেলে পুরনোদের দিকে আর ফিরে তাকায় না। মমতা সেই রকম নতুন নাগর আমেরিকাকে পেয়েছেন। পয়সাওয়ালা এই খরিদ্দারকে পেয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি একটু রেখে-ঢেকে লিখলাম। আরও কাব্যভাষায় বেশ অঙ্গভঙ্গি করে বলেছিলেন ওই সাবেক সাংসদ। সিপিএমের কিছু নেতা আছেন যারা সভা-সমিতিতে প্রাকৃতজনের খোলামেলা ভাষা প্রয়োগ করতেই অভ্যস্ত। তুই-তোকারিতেও উভয় পক্ষই কম যান না। যেমন একবার সিপিএমের ১নং নেতা বিমান বসু এক জজসাহেব সম্পর্কে (তার পদবি লালা) ছড়া কেটে প্রকাশ্য সভায় বলেছিলেন_ 'লালা বাংলা ছেড়ে পালা'। আবার নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় আরেক সিপিএম নেতা বিনয় কোনার সিপিএম মহিলাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন বিরোধীরা এলে ওদের নিতম্ব দেখাবে। সব বারই এসব মন্তব্যে খবরের কাগজগুলো ছ্যা ছ্যা করে। এবার সাবেক সাংসদ অনিল বসুর মন্তব্য সরাসরি টিভিতে প্রচারিত হয়। আর যায় কোথায়_ টিভি চ্যানেলগুলো সাহিত্যিক শিল্পীদের মুখোমুখি বসিয়ে দিলেন, সবাই ছ্যা ছ্যা করতে লাগলেন। একজন মহিলা সাহিত্যিক বললেন, মমতাকে 'ওদের' সঙ্গে তুলনা মানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নারী জাতিকে অপমান। আর সোনাগাছির সেসব নারীও এখন যথেষ্টই ক্ষমতায়িত। তারা হাইকোর্টে একটি দরখাস্ত করেছেন : 'অনিল বাবু আমাদের প্রফেশনকেই হেয় করেছেন। এর বিচার চাই।' এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, সারাবিশ্বে এখন যৌনকর্মীরা তাদের পেশাকে আর পাঁচটা বৈধ পেশার মতো সম্মানজনক পেশা বলে গণ্য করার দাবি করে আসছেন। এ নিয়ে তারা পশ্চিমবঙ্গে নিয়মিত মিটিং-মিছিলও করেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য অনিল বাবুর ওই মন্তব্যের নিন্দা করে বলেছেন, ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। পার্টি তাকে বলেছে ঢের হয়েছে। আপনি আর মুখ খুলবেন না। অনিল বাবু এরপর থেকে বসে গিয়েছেন অর্থাৎ চুপচাপ আছেন। যদিও পার্টি তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সাহস করেনি। কিন্তু মন্ত্রী গৌতম দেব সমানে টিভিতে তার বিস্ফোরক অভিযোগগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকার কলকাতার কনসাল জেনারেল নাকি কবে ওয়াশিংটনে মমতা সম্পর্কে গোপন তারবার্তায় জানিয়েছিলেন, মমতা পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। ওনাকে একটু 'কালটিভেট' করবেন। এই গোপন তারবার্তা উইকিলিকসের কল্যাণে ফাঁস হয়ে যায়। গৌতম বাবু ওই তারবার্তার গূঢ়ার্থ ব্যাখ্যা করেছেন মমতার সঙ্গে মার্কিনিদের আশনাই আছে। এদিকে সিপিএম থেকে বিতাড়িত লোকসভার সাবেক স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রমাণ করেছেন জলের চেয়ে রক্ত গাঢ়। তিনি গৌতম দেবের হয়ে নির্বাচনী প্রচারে নেমে পড়েছেন। সব দিক থেকে নাটক এখন জমজমাট।

ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায় :পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক
 

No comments

Powered by Blogger.