সপ্তাহের হালচাল-বহিষ্কারের রাজনীতি by আব্দুল কাইয়ুম

বহিষ্কারের পর ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘কথা বলার জন্য এত বড় শাস্তি হয়, তা আমার জানা ছিল না।’ এটা তাঁর অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু না। বিএনপির গঠনতন্ত্রে কী আছে, সেটা যদি তিনি না জানেন, তাহলে কে জানবে? শিশুসুলভ কথাবার্তা কোনো কাজে আসবে না।


বিএনপির রাজনীতি নিয়ে তাঁর ভিন্নমত থাকতেই পারে। তিনি সেটা যদি চেয়ারপারসনের সঙ্গে আলোচনা করতেন, তাহলে হয়তো এত বড় সমস্যায় পড়তে হতো না। তারপর তিনি যদি বলতেন, একমত হতে পারলাম না, আসুন, আমরা দ্বিমত পোষণে একমত হই, তাহলে কি চেয়ারপারসনের পক্ষে একেবারে সরাসরি নেতিবাচক অবস্থান নেওয়া সম্ভব হতো?
নাজমুল হুদা হয়তো তাঁদের দলের বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বহুমতের সহাবস্থানের প্রচারিত কথার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝতে পারেননি। ব্যাপার হলো, কাগজপত্রে থাকবে বহুমতের সমন্বয়ের কথা, কিন্তু তার চর্চা যদি দলের মূল নেতৃত্বের জন্য সমস্যা হয়, তাহলে মাথায় খড়্গ নেমে আসবে। নাজমুল হুদাকে এখন সে রকম এক দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে। ভিন্নমত প্রকাশ করতে গিয়ে এখন তাঁর মাথায় দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির অভিশাপ নেমে এসেছে। তিনি বলছেন, ‘দলের গঠনতন্ত্র মেনে আমার ব্যাপারে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সবকিছু জেনে আমি পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’ তিনি এই ‘অগঠনতান্ত্রিক’ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন। সেটা তিনি করতে পারেন। কিন্তু লাভ হবে না। কারণ, গঠনতন্ত্রের ৫(গ) ধারা অনুযায়ী তাঁকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সর্বস্তরের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এটা করার গঠনতান্ত্রিক অধিকার দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির আছে। এর জন্য কোনো কারণ দর্শানোরও প্রয়োজন পড়ে না।
এখন নাজমুল হুদা বলতে পারেন, গঠনতন্ত্রে লেখা না থাকলেও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া উচিত ছিল। এর ওপর আদালতে শুনানি চলবে কি না, তা আদালতই ঠিক করবেন। তবে সাধারণ বিবেচনায় বলা যায়, এর প্রতিকার পেতে হলে ব্যারিস্টার সাহেবকে দলের চেয়ারপারসনের দরবারেই যেতে হবে। গতকাল সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি সে রকমই আশা প্রকাশ করেছেন। ভুল স্বীকার করে তিনি শাস্তির কঠোরতা প্রশমনের ব্যবস্থা করতে পারেন। চেয়ারপারসন চাইলে দলের স্থায়ী কমিটিও সব রদ করে দিতে পারেন।
এখানেই প্রশ্ন। দেশের মূল দলগুলো গণতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু দলের মধ্যে ভিন্নমত মেনে নিতে চায় না। সমালোচনা সহ্য করে না। দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা আমাদের দেশে প্রায় নেই বললেই চলে। কমিউনিস্ট পার্টিসহ বাম ধারার দলগুলোর গঠনতন্ত্রে পরিষ্কার বলা আছে, বহুমত বা দ্বিমত থাকলে তা দলের ভেতর আলোচনা করা যাবে, বাইরে নয়। প্রকাশ্যে দ্বিমত প্রচারের স্বাধীনতা নেই। দলের এই নীতিকে বলা হয় ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ (ডেমোক্রেটিক সেন্ট্রালিজম)। কেউ দলের নীতি বা অবস্থান নিয়ে দলীয় ফোরামের বাইরে সমালোচনা করলে, গৃহীত নিয়ম অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়। বাংলাদেশ বা এমনকি সমাজতন্ত্রের সূতিকাগার খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নেও এই নীতি দলের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারেনি। সুতরাং এটা কোনো কাজের না।
বিকল্প হলো, অন্তত এক শতাব্দীর পরীক্ষিত গণতান্ত্রিক রীতিনীতি। দেশের মূল রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ঘোষণা অনুযায়ী এই নীতিতেই চলে। কিন্তু তারা মুখে একরকম, কাজে উল্টো। ঘোষিত নীতি অনুযায়ী তারা খোলামেলা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। সে জন্য দলের মধ্যে নানা মত, নানা গ্রুপ থাকে। আবার মূল নেতৃত্বের পছন্দ না হলে তির্যক মন্তব্যের জন্য কাউকে দল থেকে বহিষ্কারও করে। এটা স্ববিরোধিতা। যদি গণতন্ত্রের কথা বলেন, তাহলে তো দলীয় লোকজনের সমালোচনা মাঝেমধ্যে উপেক্ষা করতে হবে। গণতন্ত্রের গোলাপ ফুল ফোটাতে চান, কিন্তু কাঁটার ঘা সইবেন না, তা তো হয় না।
দলের প্রভাবশালী নেতা মওদুদ আহমদের সঙ্গে নাজমুল হুদার মতবিরোধ চলছিল। প্রায় আড়াই মাস আগে তিনি বিএনপি-সমর্থক আইনজীবী সমিতি থেকে পদত্যাগ করেন। গণতান্ত্রিক দলের ভেতর এ ধরনের দলাদলি, রেষারেষি চলেই। এ জন্য নাজমুল হুদাকে বহিষ্কার হতে হবে কেন? আর যদি নানা রকম কথার জন্য তাঁকে বহিষ্কার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটা হবে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার। কারণ, নাজমুল হুদার এ রকম বেলাইনে কথা বলার ঘটনা নতুন নয়। এর আগে বহুবার তিনি এ রকম করেছেন। ১৯৯৫ সালে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আন্দোলন চলছিল, আর বিএনপি বলে চলেছিল যে ওই ধরনের সরকার অসম্ভব, কারণ কেবল ‘শিশু ও পাগল’ ছাড়া দেশে ‘নিরপেক্ষ’ বলে কেউ থাকতে পারে না; সেই সময় নাজমুল হুদা বিএনপির বক্তব্যের বিরুদ্ধে গিয়ে গণমাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক তত্ত্ব হাজির করেন। পরিণামে তাঁকে মন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিতে হয়। এর পরও আবার সেই নাজমুল হুদা বিএনপির নেতৃত্বে ফিরে আসেন, ২০০১ সালে সাংসদ নির্বাচিত হন, মন্ত্রী হন। সবকিছুই ঠিকঠাক রয়ে যায়।
এবার নাজমুল হুদা কিন্তু খুব অন্যায় কিছু বলেননি; বরং সুস্থ রাজনীতির পক্ষেই তিনি অবস্থান নিয়েছেন। যেমন—তিনি ঈদের আগে বিএনপির হরতালের সমালোচনা করেছেন। হরতাল কে চায়? মানুষ তো কখনো হরতাল চায় না। বিএনপি নিজেও তো বলেছে যে তারা হরতাল দিতে চায় না, কিন্তু হঠাৎ সরকারের অবিবেচনাপ্রসূত পদক্ষেপের কারণে তাদের হরতাল দিতে হয়েছে। এতে যে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে, সেটা নাজমুল হুদা যেমন বলেছেন, বিএনপিও বলেছে। গত ১৬ অক্টোবর জোটের শরিক তিনটি দলের মধ্যে আলোচনা হয়। চারদলীয় জোটের এক নেতা বলেন, আলোচনায় মনে হয়েছে, শুধু জিয়া পরিবারকেন্দ্রিক আন্দোলন হোক, তা খালেদা জিয়াই চান না। জনদুর্ভোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছেন তিনি (প্রথম আলো, ১৮.১০.২০১০)। তাহলে নাজমুল হুদার দোষ কোথায়?
এর আগে নাজমুল হুদা দুই নেত্রীর বৈঠকের কথা বলেছেন। দেশে যে সংঘাতের রাজনীতি চলছে, সেটা তো কারও জন্য মঙ্গলজনক নয়। এর সমাধানের পথ খোঁজা দরকার। এ বিষয়ে যদি নাজমুল হুদা দুই নেত্রীর বৈঠকের আয়োজন করতে চান, সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে চান, তাহলে তো ভালো কথা। সংঘাতের পথ পরিহার করার জন্য বিএনপি নিজেও তো সব সময় সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। সরকার একতরফাভাবে সংঘাত পরিহার করবে, তা আশা করা যায় না। এ জন্য বসুক না দুই পক্ষ। নাজমুল হুদার প্রস্তাব তো বিএনপির জন্য একটা তুরুপের তাস হতে পারে। বিএনপি বলবে, আসুন, বসি। সুস্থ রাজনীতিচর্চার জন্য কী কী করা দরকার, সে বিষয়ে একটা জাতীয় সনদ তৈরি করি। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা চালানো যাবে না ইত্যাদি। তখন সরকারের কোর্টে গিয়ে বল পড়বে। সরকারকে বলতে হবে হ্যাঁ অথবা না। সরকার যদি সুস্থ রাজনীতির চর্চা না চায়, তাহলে সরকারের ভাবমূর্তিই নষ্ট হবে।
সরকার অবশ্য তখন বলতে পারে, তারা আলোচনা করতে প্রস্তুত, দুই নেত্রীর বৈঠকে রাজি, তবে সেটা হতে হবে সংসদে। তাতে অসুবিধা কী? বিএনপি নির্বাচন করেছে কি সংসদে না যাওয়ার জন্য? যাবে সংসদে। বসবে সেখানে দুই পক্ষ। অথবা দুই নেত্রী। কিছু কথা হবে। এতে তো বিএনপির হারানোর কিছু নেই।
নাজমুল হুদা আরেকটা কথা বলেছেন। সেনানিবাসের বাড়ি ছেড়ে দিতে হওয়ায় সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারপারসনের আবেগাপ্লুত হয়ে ভেঙে পড়া উচিত হয়নি। এটা ঠিক যে পার্টি-প্রধানের ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি নিয়ে মন্তব্য করা উচিত নয়। এখানে যদি নাজমুল হুদার ভুল হয়েও থাকে, তার প্রতিকার অন্যভাবেও হতে পারত। আসলে এখানে তাঁর বলা উচিত ছিল যে সরকার ভুল করেছে। বাড়ি ছাড়ার ব্যাপারে তাদের তাড়াহুড়া করা উচিত হয়নি।
আপাতত আমাদের মাথাব্যথা দুটি বিষয় নিয়ে। বিএনপি হরতাল, ঘেরাও, অবরোধ, লংমার্চের রাজনীতিতে অটল থাকতে চায় কি চায় না? যদি না চায়, তাহলে নাজমুল হুদাকে বহিষ্কারের দরকার কী? আর যদি চায়, তাহলে কি এটাই মেনে নিতে হবে যে বিএনপি দেশকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়াকে ভালো মনে করে?
বিএনপির নেতৃস্থানীয় কেউ কেউ মনে করেন, অস্থিতিশীলতা বা রাজনৈতিক সংঘাত সৃষ্টি তাঁদের কাম্য নয়। তাঁরা আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করেন যে সরকার যদি বিরোধী দলের প্রতি সহনশীল হয়, তাহলে অনেক সমস্যারই সমাধান হতে পারে। বিএনপি সংসদেও যাবে। রাজপথের আন্দোলনও তাঁদের কর্মসূচিতে প্রাধান্য পাবে না। হয়তো বিরোধী দল হিসেবে তাঁরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা বলবে। কিন্তু সেটা তাঁদের মূল কর্মসূচি হবে না।
বিএনপির কোনো কোনো নেতার এই মনোভাব দলের মূল নেতৃত্বের কাছে সমাদৃত হওয়া উচিত। পাশাপাশি সরকারেরও উচিত, বিএনপির ভেতরের লোকজনের মনোভাব ভালোভাবে যাচাই করা। সুস্থ রাজনীতির ধারায় দেশকে ধরে রাখার জন্য বিরোধী দলের প্রতি নমনীয় মনোভাব গ্রহণ করা দরকার। আওয়ামী লীগ তো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে রয়েছে। বিরোধী দলকে কথায় কথায় অপদস্থ করা কোনো সরকারের শক্তির পরিচয় নয়; বরং এ ধরনের আচরণ সরকারের দুর্বলতারই প্রকাশ।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক
quayum@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.