বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৪৩৭ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন।শহীদ গুল মোহাম্মদ ভূঁইয়া, বীর প্রতীক ভাতগাঁও যুদ্ধের বীর মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে প্রতিরোধযুদ্ধ চলাকালে একদল মুক্তিযোদ্ধা প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়েছিলেন সৈয়দপুর-দিনাজপুর সড়কের ভূষিরবন্দরে।


এখানে তাঁরা দুই দিন থাকার পর আরও সামনে এগিয়ে চম্পাতলীতে অবস্থান নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলে ছিলেন গুল মোহাম্মদ ভূঁইয়া। তাঁরা বেশির ভাগই ছিলেন ইপিআরের সদস্য। ৯ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা চম্পাতলীতে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করে। তখন সেখানে তুমুল যুদ্ধ হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে দশমাইলে অবস্থান নেন। দশমাইল টি জংশন।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও পিছে পিছে আসে এবং সেখানে পুনরায় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করে। আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। চলে পরদিন পর্যন্ত। মুক্তিযোদ্ধারা সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। কিন্তু পাকিস্তানি আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হন।
এ অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত পশ্চাদপসরণ করে অবস্থান নেন ভাতগাঁওয়ে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেখানেও আক্রমণ করে। ট্যাংক ও অন্যান্য ভারী অস্ত্রশস্ত্রের গোলাগুলিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থা ক্রমশ সংকটময় হয়ে পড়ে। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের গোলাবারুদ প্রায় শেষ হওয়ার পথে। তার পরও তাঁরা ভাতগাঁওয়ে অবস্থান করে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন।
এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা খবর পান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি দল তাঁদের পেছন থেকে আক্রমণ করার জন্য খানসামার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তখন তাঁরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে এক দল অবস্থান নেন খানসামার কাছে। অপর দল ভাতগাঁওয়েই থাকে। গুল মোহাম্মদ ভূঁইয়া যান খানসামায়।
খানসামায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি সেনারা কিছু অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পিছু হটে যায়। সেগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদের অভাব কিছুটা পূরণ হয়। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা ভাতগাঁওয়ে ফিরে যান।
এদিকে পাকিস্তানি সেনারা পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে একদল দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরের পাশ দিয়ে এবং অপর দল সোজা পাকা রাস্তা হয়ে ভাতগাঁও সেতুর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
১৪ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধারা অগ্রসররত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করেন। তখন কান্তজির মন্দির ও ভাতগাঁও এলাকায় তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধ চলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। গুল মোহাম্মদ ভূঁইয়াসহ মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল বিক্রমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেন।
এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর গুল মোহাম্মদ ভূঁইয়াসহ তিনজন শহীদ এবং ১০-১২ জন আহত হন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরও বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতগাঁও প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে। তাঁরা ছত্রভঙ্গ হয়ে ভারতে চলে যান। গুল মোহাম্মদ ভূঁইয়া ও অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের মরদেহ স্থানীয় গ্রামবাসী পরে সেখানেই দাফন করেন।
গুল মোহাম্মদ ভূঁইয়া ইপিআরে সিপাই পদে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন দিনাজপুর সেক্টরের অধীন ঠাকুরগাঁও ৯ উইংয়ে (বর্তমানে ব্যাটালিয়ন)। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য শহীদ গুল মোহাম্মদ ভূঁইয়াকে মরণোত্তর বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ২৫৩।
শহীদ গুল মোহাম্মদ ভূঁইয়ার পৈতৃক বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার সলিমাবাদ গ্রামের তেবাড়িয়াপাড়ায়। ২০০৪ সালের গেজেটে যে ঠিকানা দেওয়া আছে সেটি তাঁর এক ভাইয়ের চাকরিকালের ঠিকানা। তিনি অবিবাহিত ছিলেন। তাঁর বাবার নাম একাব্বর আলী ভূঁইয়া, মা সাহেরা খাতুন।
শহীদ গুল মোহাম্মদ ভূঁইয়ার ছবি পাওয়া যায়নি।
সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ৬ এবং মুুক্তিযুদ্ধে রাইফেলস ও অন্যান্য বাহিনী, সুকুমার বিশ্বাস।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.