দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-মিয়ানমারে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ by আহসান হাবীব

আজকের দুনিয়ায় গণতন্ত্রের আন্দোলনে সবচেয়ে আলোচিত নাম অং সান সু চি। আশা ও পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে তাঁর মুক্তি বিশ্ববাসীর কাছে ছিল অত্যন্ত আনন্দের ও সুখকর মুহূর্ত। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা অন্যদের থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে গেছে। তিনি হাল ছাড়েননি।


মুক্তির পর জনগণের যে উদ্দীপনা দেখা গেছে, তাতে বোঝা যায় তাঁর জনপ্রিয়তা এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে। কিন্তু এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি কি পারবেন মিয়ানমারে রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে? স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটাতে কিংবা জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব অগ্রগতি কি হবে?
মিয়ানমারের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য এখনো সু চি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কিন্তু শেষবার ২০০৩ সালে যখন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, তারপর অনেক কিছু বদলে গেছে। আরও বেশি বদলেছে ১৯৮৮ থেকে, যখন তিনি প্রথমবারের মতো রাজনীতির ময়দানে আলো ছড়ান। সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতায় তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও সংহত করেছে। নতুন পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তারা নতুন রাজধানী গড়ে তুলেছে; গ্রহণ করেছে নতুন পতাকা ও নতুন জাতীয় সংগীত, এমনকি দেশের নামও পাল্টে ফেলেছে। ২০০৮ সালে যে নতুন সংবিধান এবং নির্বাচনী আইন তৈরি করা হয় তাতে নিশ্চিত করা হয়েছে সামরিক শাসকদের স্বার্থ। পার্লামেন্টের এক-চতুর্থাংশ আসন সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। মিয়ানমারের কমান্ডার ইন চিফের হাতে রয়েছে ভেটো প্রদানের ক্ষমতা; এর আওতা অত্যন্ত ব্যাপক। সরাসরি শাসন জারি করার ক্ষমতাও তার আছে। তাই নির্বাচনে যে-ই জিতুক না কেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব ছিল সুরক্ষিত। এই নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থায় জান্তাবিরোধী গণতন্ত্রপন্থী কিংবা জাতিগত সংখ্যালঘু বিরোধী দলগুলোর কোনো জায়গা নেই। সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রেখেই এ রূপান্তর ঘটে চলেছে।
সু চি এই পরিবর্তনের বিষয়ে ওয়াকিবহাল এবং পরিবর্তনগুলোকে গভীরভাবে বোঝার ইচ্ছেও ব্যক্ত করেছেন। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক অবরোধের প্রশ্নে তাঁর অবস্থানে পরিবর্তন ঘটেছে।
অন্যদিকে সু চি চান নিপীড়ক রাষ্ট্রের সঙ্গে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর বিরূপতা কেটে যাক। মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা ও সংস্কারের মৌলিক বিষয় এটা। এ অবস্থায় কতগুলো গুরুতর বিষয়ে তাঁকে শিগগিরই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে: বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করা, সশস্ত্র সংখ্যালঘু জাতিগুলোর দাবি-দাওয়া, কোন ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে চান, কিংবা সরকারের প্রতি কতটুকু চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবেন। সু চি মুক্তি পাওয়ার পরই জান্তার সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। সামরিক জান্তার সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। জান্তার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে ওয়াশিংটনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। এগুলো দেশটির উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক।
ঘুড়ির নাটাই ক্ষমতাসীনদের হাতে। সু চির মুক্তির বিষয়টিকেও অনেকে সামরিক জান্তার জনসংযোগ কর্মকাণ্ড হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। খেয়ালখুশিমতো আইনের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে সামরিক জান্তার জুড়ি নেই। জেনারেলরা চাইলে নানা বাহানায় যত দিন ইচ্ছা তাঁকে আটকে রাখতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা তাঁকে মুক্তি দিলেন; বিতর্কিত এক নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর। ৭ নভেম্বরের সেই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি। আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা ছিল, ভোট কেনাবেচা, কারচুপির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এ নিয়ে কেউ আজ কথা বলছেন না।
কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে জান্তা তার ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করল।
সামরিক জান্তা এবং বিরোধীদের মধ্যে ক্ষমতার যে ভারসাম্যহীনতা বিরাজমান, তাতে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে মিয়ানমারে উদার গণতন্ত্র আসবে—এমন আশা বাস্তবসম্মত নয়। বিরোধী দলগুলোর বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট। রাজনৈতিক ও জাতিগত দিক থেকেও রয়েছে বিরাট পার্থক্য। এমন কোনো সুগঠিত বিরোধী পক্ষ নেই, যারা ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে পারে। এশিয়ার বহু দেশের মতোই মিয়ানমারের সামাজিক কাঠামোতেও রয়েছে গভীর অসমতা। এটা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার পথে প্রতিবন্ধক।
মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ দীর্ঘ ও দুরূহ। নভেম্বরের নির্বাচনের চেয়ে অবাধ নির্বাচন হলেই তাতে গণতন্ত্রের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
যেকোনো প্রকারেই হোক, সামরিক শাসক তার টিকে থাকার সামর্থ্য দেখিয়েছে। প্রায় পাঁচ দশক ধরে যে কর্তৃত্বের অধিকারী, তারা সহসাই ব্যারাকে ফিরে যাবে না। শিগগিরই সামরিক কর্তৃত্বের অবসান ঘটবে—এমন আশা করা বাড়াবাড়িই হবে। তবে, সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মের হাতে চলে আসা এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চালু হওয়ায় গণতন্ত্রের আন্দোলনের জন্য নতুন ময়দান তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিরোধীদের মধ্যে বিভক্তি এবং ক্ষমতার ওপর সামরিক বাহিনীর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে তাদের সঙ্গে সেতুবন্ধ তৈরি ছাড়া আপাতত সু চির এগিয়ে চলা দুরূহ।
মিয়ানমারে রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আসার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ ফলপ্রসূ হয়নি। দুই দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্ব চাপ প্রয়োগ করে গেলেও বিশেষ কিছু অর্জিত হয়নি। বরং সামরিক বাহিনীর দখলি মানসিকতাকেই জোরালো করেছে। মিয়ানমারকে কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টার মাধ্যমে পশ্চিমারা হয়তো তাদের বিবেকের অস্বস্তির ওপর শান্তির প্রলেপ দিতে পেরেছে; নানা জায়গায় তাদের মনে যে চোট লেগেছে, তা প্রশমন করতে পেরেছে, আরাম পেয়েছে।
কিন্তু তাতে কি মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হয়েছে? অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফল হয়েছে একেবারে উল্টো: মিয়ানমারে বণিক শ্রেণী কিংবা সুশীল সমাজ গড়ে ওঠেনি এবং একমাত্র কার্যকরী প্রতিষ্ঠান হিসেবে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আরও দৃঢ়ভাবে ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরেছে। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে শাসকগোষ্ঠী যতটা না বিপদে পড়েছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ। আর এসব নিষেধাজ্ঞা সমর্থনের কারণে এই অর্থনৈতিক দুরবস্থার দায় পরোক্ষে সু চির ওপরও অনেকে দিতে চান। যে অর্থনীতির বিকাশ রুদ্ধ, সেখানে তো গণতন্ত্র শেকড় গাড়া সম্ভব নয়। পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও এখন এমন উপলব্ধি দেখা যাচ্ছে।
এসব ঘটনায় স্পষ্ট যে, গণতন্ত্র ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করে মিয়ানমারের মৌলিক সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবর্তন আসতে হবে ভেতর থেকে। সু চির মুক্তি বিশ্ববাসীর কাছে আদর্শের পক্ষে লড়াইয়ে তাঁর অভয় আর সাহস উদ্যাপনের যে উপলক্ষই হাজির করুক না কেন, স্বদেশবাসী কীভাবে নিচ্ছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সু চির এখন কোনো রাজনৈতিক দল নেই। ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে মানুষকে কতটুকু আকর্ষণ করতে পারবেন, তা বলা কঠিন। সেন্সরশিপ আইন বলবৎ থাকার কারণে তার সব কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে পৌঁছার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। এই সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে তিনি সচেতন। প্রায় দুই হাজার গণতন্ত্রকামী নেতা এখনো কারাগারে বন্দী। তাঁরা সু চির মতো বিখ্যাত নন, তবে পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে তাঁদের গুরুত্ব কম নয়। সু চির ভাষ্যেও তা উঠে এসেছে, ‘আমি মনে করি না যে, একজন ব্যক্তির প্রভাব ও ক্ষমতা দেশকে এগিয়ে নেবে। জনগণের যে আস্থা আমার ওপর আছে, তাতে আমি সম্মানিত বোধ করি, কিন্তু কোনো ব্যক্তি একা কোনো দেশে গণতন্ত্র নিয়ে আসতে পারে না।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘পরিবর্তন আসবে জনগণ থেকেই। আমি আমার ভূমিকা রাখতে চাই। মিয়ানমারের জনগণের সঙ্গে মিলে কাজ করতে চাই। তারাই এ দেশটাকে বদলাবে।’
জন-আন্দোলন এবং নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের সক্রিয়তা অতীতে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, ভবিষ্যতেও ঘটাবে, এই বিশ্বাস পরিবর্তনকামীদের আশার মূল সূত্র। ২০০৭ সালে বৌদ্ধভিক্ষুরা শুধু শহরের রাস্তা দিয়ে হাঁটলেন, তার জবাবে দেখা গেল সামরিক জান্তার সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া। জেনারেলরা জনগণের সংহতিকে বড় ভয় পায়। মিয়ানমারের পরিবর্তনকামী জনগণ সর্বব্যাপী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে বারবার, কিন্তু হাল ছাড়েনি। ছোট ছোট প্রতিরোধ আর মুক্তির বৃহৎ পরিকল্পনা জারি আছে।
তবু এত দীর্ঘ সময় সামরিক বাহিনী ক্ষমতা ধরে রাখল কী করে? সু চির উত্তর, ভীতির পরিবেশ তৈরি করে। নিপীড়ন থেকে মুক্তির আবশ্যিক শর্ত হলো সাহস। তাই তিনি মিয়ানমারের জনগণকে নিজেদের ভয়কে অতিক্রম করে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুুগিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৯০ সালে তাঁর সেই বিখ্যাত বক্তৃতা ‘ফ্রিডম ফ্রম ফিয়ার’-তেও এর ওপরই জোর দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি: ‘ক্ষমতা নয়, ভয়ই মানুষকে কলুষিত করে। যাদের হাতে ক্ষমতা, তাদের ক্ষমতা হারানোর ভয়; আর যারা এর অধীন, তাদের ভয় ক্ষমতার কঠোরতা।’
সু চি বরাবর অহিংস পথে পরিবর্তন নিয়ে আসার পক্ষপাতী। বন্দী হওয়ার পরও অহিংস প্রতিরোধকেই উৎসাহ দিয়ে গেছেন। যে দেশে শাসকের ভাষা বিরোধীদের দমন-পীড়ন-নির্যাতন, বাধ্যতামূলক শ্রম আর নির্বাসনে কিংবা কারাগারে পাঠানো আর প্রতিপক্ষের গায়ের রং, মুখের ভাষা এক, সেখানে এ পথে পরিবর্তনের গতি ধীর হওয়ারই কথা। স্বৈরতন্ত্রকে প্রতিরোধ করে এবং দীর্ঘ বন্দিত্ব উতরে এসে সু চি প্রতিপক্ষের চেয়ে উচ্চতর নৈতিক শক্তির অধিকারী হয়েছেন। একে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারে পরিবর্তন নিয়ে আসতে এবং রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ওপর কিছু মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হলে দরকার সূক্ষ্ম বিচারবোধ। তাঁর অসীম সাহস এবং আত্মত্যাগের প্রতিজ্ঞা তাঁকে মহৎ করেছে; কিন্তু গণতন্ত্রায়ণের চ্যালেঞ্জ এখানেই যে, এ সমস্যার কোনো সমাধান নৈতিক স্তরে ঘটে না। এটা আসলে দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবস্থার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো বদলে ফেলার প্রশ্ন। সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ। লক্ষ্যে পৌঁছার পথে নানা হতাশা কতটা সাহসিকতার সঙ্গে উতরে যাওয়া যাবে, তার ওপরই নির্ভর করছে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ।
আহসান হাবীব: সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.