চারুশিল্পবাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও ছক্কা আর্টিস্ট গ্রুপের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী-পোড়া মাঠের স্নান by মোবাশ্বির আলম মজুমদার

মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সেই মানুষই প্রকৃতির হন্তা। পৃথিবীব্যাপী প্রাকৃতিক বিপর্যস্ত বিপর্যয় যাপিত জীবনে নিয়ত আঘাত হানছে। ‘পরিবেশের প্রতিবেশ’ শীর্ষক শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম, স্থাপনাশিল্প, ভাস্কর্য, ভিডিও আর্ট আমাদের জানিয়ে দেয় পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ এবং এ থেকে উত্তরণের উপায়।


গত ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও ছক্কা আর্টিস্ট গ্রুপের যৌথ আয়োজনে নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে শুরু হয়েছে এই প্রদর্শনী। ছক্কা আর্টিস্ট গ্রুপ বাংলাদেশের আশির দশকের ছয়জন শিল্পীর গড়ে তোলা সংগঠন। এই প্রদর্শনীতে ছয়জন শিল্পী মোখলেসুর রহমান, মাহবুব জামাল শামিম, জাহিদ মুস্তাফা, অশোক কর্মকার, লাল রুখ সেলিম, উত্তম কুমার কর্মকার ছাড়াও ইতালির শিল্পী ফ্রান্সিসকো করদোবা ও জার্মান শিল্পী হর্স্ট উহলেমানের ছাপচিত্র, ভাস্কর্য, তেলচিত্র, অ্যাক্রিলিক, স্থাপনাশিল্পেও ভিডিও আর্ট প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানবসমাজে সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে। শিল্পীর অনুসন্ধিৎসু মন খুঁজে ফেরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণগুলো। সমুদ্রতলের জলজ প্রাণীর আর্তনাদ, জলজ উদ্ভিদ, শামুক-ঝিনুকের মৃত খোলস ভেসে আসছে প্রতিনিয়ত, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বেয়ে চলা ঝরনার কলকল ধ্বনি স্তব্ধ হয়ে গেছে। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণের রূপ নির্মিত হয়েছে প্রদর্শিত শিল্পকর্মে। মানুষের পরিবেশের প্রতি এই আক্রমণাত্মক আচরণকে শিল্পীরা মনে করেন নিজের প্রতি নিজেরই আঘাত। মিসরীয় সভ্যতার চিত্রকলায় আমরা মানুষ ও প্রকৃতির আরাধনা দেখতে পাই। প্রথাগত চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য ও সমসাময়িক শিল্পকর্মে প্রকৃতি ও মানুষের উপস্থিতি লক্ষণীয়। শিল্পের ভাষা স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক। প্রদর্শনী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে ইতালির অধ্যাপক ফ্রান্সিস এলিসেই তাঁর পঠিত প্রবন্ধে এ কথাই উল্লেখ করেন। প্রদর্শনীর শিল্পী মোখলেসুর রহমানের রঙিন কাঠখোদাই চিত্রের সঙ্গে অ্যাক্রিলিক ও তেলরঙের কাজে প্রকৃতিই প্রধান হয়ে উঠেছে। বিস্তৃত সবুজ মাঠের গায়ে খেলে যাওয়া রোদের ঝিলিক শিল্পীর শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী এক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পীর শৈশবের স্বপ্নে আজ আঘাত হানছে সুনামি, অকাল বন্যা। চারটি ছাপচিত্রের বিষয় ‘টিয়ার্স্ অব নেচার’ বা প্রকৃতির কান্না। সবুজ মাঠের বিস্তৃত ক্যানভাসে জল নেমে আসে, বিপর্যস্ত করে সবুজ মাঠকে। শিল্পী মাহবুব জামালের ভাস্কর্যের বিষয় মানব, মানবীর কাঁধে সওয়ার আতঙ্কিত শিশু। বৃক্ষনিধন, পাহাড় কেটে আবাসভূমি তৈরি, নদীদূষণ আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। তাই সময় এসেছে আমাদের সচেতন হওয়ার। কাগজের মণ্ডে তৈরি মাহবুবের শিল্পকর্মের সামনে সমুদ্রপৃষ্ঠে গর্জে ওঠা জলের ঢেউ বোঝাতে সাদা বোর্ডের তৈরি ফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ উর্বর আবাদি ভূমির দেশ। শস্য-শ্যামল এই দেশে ভূমিধস, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীর নাব্যতা হ্রাস মানুষেরই সৃষ্টি। শিল্পী মাহবুব জামাল এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন এই প্রদর্শনীতে। জাহিদ মুস্তাফার অ্যাক্রিলিকের চারটি কাজে ভূমিকম্পে আক্রান্ত প্রকৃতির ঘূর্ণাবস্থাকে দেখিয়েছেন। শিল্পীভাবনায় প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা মানুষের ঠাঁই পাওয়ার জন্য আরও সবুজ অরণ্যের কথা প্রকাশ পেয়েছে। স্থাপনাশিল্পে শিল্পী অশোক কর্মকার আমাদের বৈষয়-বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বক্তব্যপ্রধান শিল্পকর্ম উপহার দিয়েছেন। পাতাবিহীন মৃত গাছের ডালে ঝুলে থাকা অক্সিজেন মাস্ক আমাদের অশনিসংকেত দেয়। পোড়া মাঠের গায়ে বেড়ে ওঠা গাছ পত্রহীন, শুকনো সবুজ পাতার অনুপস্থিতিতে অক্সিজেন আমাদের ধার নিতে হবে। গ্রিনহাউস ইফেক্ট মানবসভ্যতায় ক্রমে সংকট তৈরি করছে। সভ্যতার নির্মাণে সবুজ ধ্বংস হয়ে যাপিত জীবনের অংশ হচ্ছে কৃত্রিম নিত্যপণ্য। অশোক কর্মকারের স্থাপনাশিল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কোথায় যাচ্ছি। এয়ারব্যাগ, অক্সিজেন মাস্ক, মৃত গাছ, শুকনো পাতা, প্লাস্টিকের গ্লাস, স্টিকার ব্যবহারে এই স্থাপনাশিল্পটি শিল্পিত প্রতিবাদ। শিল্পী লালা রুখ সেলিমের স্থাপনাশিল্পের মূল প্রতিপাদ্য ‘প্রতিদিনের পরিবেশ’। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা মানবশরীরের অংশ লাল মরিচের সঙ্গে শিলপাটার ব্যবহার নিত্যদিনের চিত্র। প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে শিল্পী প্রকৃতি থেকে আহরিত উপাদানের প্রয়োজন বোঝাতে চেয়েছেন। উত্তম কুমার কর্মকার দুটি ক্যানভাসে পানিই জীবন ও মাতৃভূমির সংকট পানীয় জলকে প্রধান করে দেখিয়েছেন। গাঢ় নীলাকাশ ভেদ করে গড়িয়ে আসা বৃষ্টিস্নানরত রমণীর গায়ে ভেসে যায় পুষ্পিত সৌরভ। এমন ফুলেল মায়ার স্বপ্নকে রচনা করেছেন শিল্পী উত্তম। ইতালির শিল্পী ফ্রান্সিসকো করদোবা তাঁর সাম্প্রতিক কাজে ভূতলে জলের সংকটের কথা বলেছেন। প্রদর্শিত ভিডিও আর্টিস্ট এর আগে ভেনিস বিয়েন্নালে প্রদর্শিত হয়েছে। অতিবৃষ্টি, খরা, সাগরের তলদেশে সৃষ্ট সংকট, নদীর নাব্যতা হ্রাসকে সুর ও ধারাবর্ণনার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। জার্মান শিল্পী হর্স্ট উহলেমানের কাজে ঝুলন্ত প্লাস্টিকশিটে আঁকা চোখের বিস্ময়, উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেয়েছে। রেখাচিত্রে আঁকা প্লাস্টিকশিটের বাইরে ছয়টি জলরং চিত্রের বিষয়, কৃত্রিম ব্যবহার্য দ্রব্যের ব্যবহার, বিমূর্ত ঢঙে আঁকা শিল্পকর্মে পরিবেশবান্ধব দ্রব্যের পরিবর্তে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বস্তুর ব্যবহারের বিপক্ষে নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন। শিল্পীর শিল্পকর্ম দর্শকদের জন্য যেমন আনন্দবার্তা দেয়, এই প্রদর্শনী তেমন আনন্দদায়ক না হলেও বিষয়নির্ভর। পৃথিবীব্যাপী আলোচিত বিষয়কে নিয়ে শিল্পীদের এই প্রদর্শনী থেকে বোঝা যায়, শিল্পীর দৃষ্টি শুধু সুন্দরে নয়, সমাজভাবনাও নিয়ত তাড়িত করে সব শিল্পীকে। প্রদর্শনীটি শেষ হবে ৯ মে।

No comments

Powered by Blogger.