স্মরণ-পাথেয় হোক এম এন লারমার পথ by হরি কিশোর চাকমা

মানুষের জন্ম হলে মৃত্যু অনিবার্য। তবে এমন কিছু মানুষের জন্ম-মৃত্যু আসে, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তেমনই একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, যিনি এম এন লারমা নামেই বেশি পরিচিত। এম এন লারমার জন্ম ও কর্মময় জীবন পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরনিপীড়িত নির্যাতিত আদিবাসী মানুষকে জাগিয়ে তুলে শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ে সচেতন করেছিলেন। আর তাঁর মৃত্যুর যে ক্ষত, তা কোনো দিনই পূরণ হওয়ার নয়।
আজ ১০ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সাংসদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত এই নেতা আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বে অপর আট সহকর্মীসহ নিহত হন। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা এই দিনটিকে জুম্ম জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তরাঞ্চল আসন থেকে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও পার্বত্য চট্টগ্রাম আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেছিলেন।
এম এন লারমা কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষিত ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করে ‘গ্রামে চলো’ স্লোগান সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও আদিবাসীদের শিক্ষায় মনোনিবেশ করার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি নিজেও ১৯৬৬ সালে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে ১৯৬৯ সালে এলএলবি পাস করার পর চট্টগ্রাম বার কাউন্সিলে যোগদান করেন। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সংবিধান প্রণয়নকালে এম এন লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ অঞ্চলের মর্যাদা দেওয়ার দাবি এবং পাহাড়িদের বাঙালি হিসেবে জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ করার প্রতিবাদ করেন। কিন্তু সংবিধান প্রণয়ন কমিটি তাঁর দাবি ও প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে। এসব দাবি আদায়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গঠন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। তিনি হন সমিতির সাধারণ সম্পাদক। পরে ১৯৭৩ সালে জনসংহতি সমিতির সভাপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটলে এম এন লারমা পাহাড়ি ছাত্র-যুবকদের নিয়ে আত্মগোপনে যান। আত্মগোপন অবস্থায় নিজ দলের বিভেদপন্থী একটি অংশের হাতে এম এন লারমা নিহত হন। দাবি আদায়ে সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তুললেও এম এন লারমা সব সময় চেষ্টা করেছিলেন আলোচনার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের। সেই পথ ধরে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে সই হয় পার্বত্য চুক্তি, যা পরে পার্বত্য শান্তি চুক্তি নামে পরিচিতি পায়। পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে এম এন লারমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথের দেখা পেলেও শাসকগোষ্ঠীর নানা ছলচাতুরীতে তা হচ্ছে না। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদ আবার অশান্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এম এন লারমা পারিবারিক গণ্ডি থেকে গণতান্ত্রিক ভাবধারার অধিকারী। ছাত্রজীবন থেকে সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তাঁর অনেক সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি ছিলেন সব জীবের প্রতি সহানুভূতিশীল ও প্রকৃতিপ্রেমী। ছিলেন পরিবেশ-প্রতিবেশ সচেতন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের যে গভীর অরণ্যে আত্মগোপনে ছিলেন, তার আশপাশ এলাকা ছিল বনের পশুপাখির অভয়ারণ্য। তিনি সহকর্মীদের কোনো অবস্থাতে বন্য পশুপাখির বিরক্ত বোধ হবে এমন আচরণ করতে বারণ করতেন।
এম এন লারমা ছিলেন খুবই অধ্যবসায়ী। সব সময় থাকতেন পড়াশোনায় নিমগ্ন। এম এন লারমার সহপাঠী বাঘাইছড়ি তুলাবান এলাকার বাসিন্দা বিনয় কুমার খীসা একবার আমাকে জানিয়েছিলেন, পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামের পাথরঘাটার পাহাড়ি হোস্টেল থেকে যখন এম এন লারমাকে গ্রেপ্তার করা হয়, তখনো হাতে ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি। আর প্রয়াত সাংসদ চাইথোয়াই রোয়াজার কাছ থেকে জানতে পেরেছি, জাতীয় সংসদ সদস্য থাকাকালে এম এন লারমাকে সব সময় খুঁজে পাওয়া যেত জাতীয় সংসদ লাইব্রেরিতে।
একটি জাতিকে সচেতন করে তুলতে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি জরুরি, তা হলো শিক্ষা। সেটিই প্রথম করেছিলেন এম এন লারমা। সে কারণে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ-পরবর্তী সময়ে ছাত্র-যুবকদের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং শিক্ষক হিসেবে আত্মনিয়োগ করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি নিজেও বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতা পেশা। মূলত সেই সময় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের শিক্ষার বিস্তার শুরু হয়েছিল।
এম এন লারমা ছিলেন মহান মনের মানুষ। তিনি সবাইকে বিশ্বাস করতেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিতে যখন অন্তঃকোন্দল শুরু হয়, তখনো তিনি কুচক্রী ও বিভেদপন্থীদের বিশ্বাস করেছিলেন। সে কারণে তিনি দলের মধ্যে ‘ক্ষমা করো ও ভুলে যাও’ নীতি প্রচার করেছিলেন। তবে মানুষের প্রতি তাঁর সেই বিশ্বাস পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে নিয়ে এসেছে কলঙ্কময় অধ্যায়। তাঁরই কিছু বিপথগামী সহকর্মী এই মহান নেতার মহানুভবতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে হত্যা করেছিলেন।
হরি কিশোর চাকমা: প্রথম আলোর রাঙামাটি প্রতিনিধি।

No comments

Powered by Blogger.