দুই দু’গুণে পাঁচ-নামের মাহাত্ম্য by আতাউর রহমান

সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও টেস্ট ম্যাচ খেলায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অন্যতম খেলোয়াড়ের নাম ছিল খেমার রোচ। তো টেলিভিশনের ধারাবর্ণনায় ওর নাম উচ্চারিত হলেই আমার মনে পড়ে যেত দূরপ্রাচ্যের দেশ কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক দল খেমার রুজের কথা, সত্তরের দশকে সে দল তার নেতা পলপটের নেতৃত্বে ওই দেশে স্টিম রোলার চালিয়েছিল। সে জন্য পরে পলপটকে আসামির কাঠগড়ায়ও দাঁড়াতে হয়েছিল।


খেলোয়াড়টির মাতা-পিতা বোধ করি খেমার রুজের নাম থেকেই ছেলের নাম রাখতে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকবেন। এটা অস্বাভাবিক কিংবা অপ্রত্যাশিত নয়। মানুষ সাধারণত নামীদামি লোকের নামানুসারেই তাদের সন্তানদের নামকরণ করে থাকে। বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই, আমাদের বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের এক সদস্যের নামই তো সোহরাওয়ার্দী।
নাম সম্পর্কে অনেকে অনেক কথা বলে গেছেন। তবে আমার বিবেচনায় সবচেয়ে সুন্দর কথাটি বলেছেন মহাকবি শেক্সপিয়ার। তিনি তাঁর রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট নাটকে বলেছেন: নামে কী আসে যায়? আমরা গোলাপ বলে যেটাকে ডাকি, অন্য নামে ডাকলেও সেটা তার সুগন্ধ ছড়াবেই। অজ্ঞাতনামা কেউ আরেকজনও বলেছেন আরেকটি মূল্যবান কথা: সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার সর্বোত্তম উত্তরাধিকার হচ্ছে একটি ভালো ও অর্থবোধক নাম। সম্ভাব্য সব মাতা-পিতা কথাটা স্মরণ রাখলেই হয়।
তো গল্প আছে: বিয়ের বছর খানেক পর প্রথম সন্তান লাভ করে সন্তানের গর্বিত মাতা স্বামীর উদ্দেশে বললেন, ‘আমি মেয়ের নাম স্থির করে ফেলেছি, আমরা তাকে ডাকব শারমিন।’ এই নামটি স্বামীর তেমন পছন্দ না; কিন্তু তিনি ছিলেন খুব চালাক। তাই তিনি বলে উঠলেন, ‘ভালো হয়েছে। আমি জীবনে প্রথম যে মেয়েকে ভালোবাসি, ওর নাম ছিল এটা: কাজেই মেয়েকে এ নামে ডাকলে পুরোনো সুখস্মৃতিগুলো মনে পড়বে।’ স্ত্রী প্রায় মিনিট খানেক নীরব থেকে অবশেষে বললেন, ‘বেশ, আমরা তাকে আমার মায়ের নামানুসারে মরিয়মই ডাকব।’
এবং বলা হয়ে থাকে যে মানুষের সাধারণত তিনটি নাম থাকে—যে নামটা সে বংশ সূত্রে পায়, যে নামটা তার মাতা-পিতা তাকে দিয়ে থাকেন, আর যে নামটা সে নিজে কামায়। বিদ্যাসাগর, বঙ্গবন্ধু, শেরেবাংলা যেমন নিজেরা নাম কামিয়েছিলেন, তেমনি মুরগি মিলন, কালা জাহাঙ্গীর, গালকাটা কামাল—এরাও নিজেদের নাম নিজেরা কামিয়েছে। ভালো নাম কামানো খুব কঠিন, কিন্তু খারাপ নাম কামানো অত্যন্ত সহজ।
ভারতের তামিলনাডু রাজ্যের লোকদের নাম সচরাচর লম্বা হয়, কেননা ওরা নিজের নামের সঙ্গে বাপ-দাদারও নাম জুড়ে দেয়। ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্টের নাম আবুল পাকির জইনুদ্দিন আবুল কালাম—জইনুদ্দিন ও আবুল পাকির হচ্ছে যথাক্রমে তাঁর বাবা ও দাদার নাম। আমার মানিব্যাগে বহুদিন এক দক্ষিণ ভারতীয় লোকের নাম রক্ষিত ছিল (সম্প্রতি ওটা ফেলে দিয়েছি), যার নামের অংশবিশেষ ছিল ‘অমুক গ্রামের বটগাছওয়ালা বাড়ি’। আর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতালীয়দের নামও থাকে বেশ লম্বা। আমেরিকায় আন্তদেশীয় এক বিয়েতে গির্জার ধর্মযাজক যখন ইতালীয় বরের নাম উল্লেখ করে প্রথানুযায়ী কনেকে বললেন, ‘তুমি কি ফ্রেনেকা ইয়োসেফ আন্তোনিওকে বিয়ে করতে রাজি আছ’, তখন মেয়েটি নাকি আর্তচিৎকার করে বলেছিল, ‘ফাদার, নিশ্চয় কোথাও ভুল হচ্ছে; আমি কেবল ফ্রেনেকাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি।’
একসময় আমাদের এতদঞ্চলেও লম্বা নাম রাখার রেওয়াজ ছিল; অনেক ক্ষেত্রে এটার পেছনে যুক্তিসংগত কারণও ছিল। আমার পিতা ও পিতৃব্য ছিলেন যমজ ভাই এবং যেহেতু পিতা আগে ধরাধামে এসেছিলেন, সেহেতু আমার পিতামহ মাওলানা সাহেব পিতার নাম রেখেছিলেন আবুল খয়রাত কবির আহমদ এবং পিতৃব্যের নাম আবুল মোবাররাত ছগির আহমদ—‘কবির’ অর্থ বড় এবং ‘ছগির’ অর্থ ছোট। লম্বা নাম বলতে মনে পড়ে গেল: ক্যারিয়ারের শুরুতে যখন সরকারি কলেজে প্রভাষক পদে কাজ করতাম, তখন এক সহকর্মী ছিলেন, যাঁর নাম ছিল কুদরতে রব্বানি শরফুল ইসলাম শাহ মোহাম্মদ আবুল আলা আবুল হোসেইন আল-হাক্কানি আল্লাখান চৌধুরী এলিয়াস এ কে বাকিংহাম। আমরা কয়েকজন অতি কষ্টে তাঁর নাম মুখস্থ করেছিলাম এবং তাঁকে আসতে দেখলেই মোগল সম্রাটদের দরবারের অনুকরণে পুরো নাম উচ্চারণ করে পরিশেষে যোগ করতাম হুঁশিয়ার।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নাকি একবার বলেছিলেন, বাঙালি মুসলমানদের নাম বাংলায় হওয়া উচিত। তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা অতঃপর তাঁকে আচার্য বলীনারায়ণ নামে ডাকতে শুরু করে দিল। ড. শহীদুল্লাহর কথা মানতে হলে আমার নাম হওয়া উচিত আতাউর রহমান-এর পরিবর্তে ঈশ্বরদত্ত; আর হিন্দুর ঘরে জন্মালে তৎসঙ্গে থাকত একটা পদবি—‘রায়’, ‘চক্রবর্তী’ কিংবা ‘ব্যানার্জি’। শংকরের লেখায় পড়েছিলাম: কলকাতায় মুখার্জি আছে, চ্যাটার্জি আছে, ব্যানার্জি আছে; কিন্তু কোনো এনার্জি নেই। তেমনিভাবে বোধ করি বলা যায়—আমাদের ঢাকায় আবুল আছে, খান আছে; কিন্তু মন বা প্রাণ কোনোটাই নেই। তবে প্রাণ ম্যাংগো জুস আছে।
‘নাম’-এর আরবি ও ফারসি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘ইস্ম’। তাই আগেকার দিনে আমাদের অঞ্চলে কারও নাম জিজ্ঞেস করতে হলে ‘তকল্লুফ’ করে বলা হতো, ‘আপনার ইসেম শরিফ কী?’ তো একজনকে এভাবে জিজ্ঞেস করায় সে নাকি জবাব দিয়েছিল, ‘ভালো কিছু কইলে তো কইছেনই; তবে খারাপ কিছু কইলে আপনার চৌদ্দগুষ্টি ইসমে শরিফ।’ তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, ঢাকায় আমার প্রতিবেশী জনৈক অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তাকে আমি অনুরূপভাবে প্রশ্ন করলে প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, ‘আমার বাড়ি চাটগাঁয়।’
সে যা হোক। নাম সম্পর্কে অনেক অনেক মজার গল্প আছে, তার মধ্যে আমার ব্যক্তিগত পছন্দেরটি এখানে পরিবেশন করছি: জনৈক জাপানি গেছে আমেরিকায় বেড়াতে। যাওয়ার আগে সে জেনে গেছে, টাইটানিক জাহাজডুবির জন্য দায়ী ছিল একটি আইসবার্গ। ইংরেজি ভাষায় জাপানিদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। তাই আমেরিকায় গিয়ে মি. গোল্ডবার্গের সঙ্গে পরিচিত হতেই জাপানি ভদ্রলোক তাঁকে উদ্দেশ করে বলে উঠল, ‘ওহ্, তাহলে আপনার কাজিন মি. আইসবার্গ বুঝি টাইটানিক জাহাজটি ডুবিয়েছিল?’
আর একটি গল্প। দুজন লোকের রাস্তায় হঠাৎ দেখা হতেই একজন অপরজনকে উদ্দেশ করে বলতে লাগল, ‘হায় হায়, তুমি কত বদলে গেছ! তোমার মাথায় ঘন কালো চুল ছিল, আর এখন বিরাট টাক। তোমার চেহারা ছিল উজ্জ্বল বর্ণের, আর এখন চেহারা একেবারে ম্রিয়মাণ। তুমি বেশ নাদুসনুদুস ছিলে, আর এখন দেখা যাচ্ছে হাড্ডিসার। আমি সত্যিই তোমার পরিবর্তন দেখে অবাক, জামালুদ্দিন।’
‘কিন্তু আমার নাম তো জামালুদ্দিন নয়।’
‘হায় আল্লাহ্! তুমি বলতে চাও যে তুমি তোমার নামটাও পরিবর্তন করে ফেলেছ?’
আতাউর রহমান: ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক। রম্যলেখক।

No comments

Powered by Blogger.