সাফটা ও জলবায়ু বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত কাম্য-সপ্তদশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন

সার্কের ২০ দফা আদ্দু ঘোষণায় দক্ষিণ এশীয় জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন তেমন ঘটেনি। এবারকার সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল সেতুবন্ধ। কিন্তু এই সেতুবন্ধ বাস্তবে কীভাবে সৃষ্টি হবে, তার বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা নেই ঘোষণায়। আন্তসীমান্ত চলাচলে নতুন কোনো সিদ্ধান্তেও পৌঁছাতে পারেননি সার্ক নেতারা।


অবাধ বাণিজ্য কিংবা অভিন্নভাবে জলবায়ুর হুমকি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপিত হয়নি। সার্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতি হচ্ছে, যথাসময়ে এর শীর্ষ বৈঠকে বসার অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জলবায়ু সম্মেলন হতে যাচ্ছে। সেখানে সার্ক দেশগুলো জলবায়ু প্রশ্নে একটি অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করতে পারত। কিন্তু সে ধরনের চেষ্টাও ছিল না আদ্দু সম্মেলনে। বহু বছর ধরে আমরা সাফটা নিয়ে প্রতিশ্রুতি শুনছি। এবারেও স্পর্শকাতর পণ্যের তালিকা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাফটার মন্ত্রীপর্যায়ের কমিটিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মাত্র। এ ধরনের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।
সার্ক বহু বছর কাশ্মীরকেন্দ্রিক পাক-ভারত বৈরিতার আবর্তে জবুথবু হয়ে ছিল। সেই অবস্থাটি বর্তমানে নেই। ফলে সার্কে কিছুটা গতি সঞ্চার ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীনের মতো দেশ সার্ক-প্রক্রিয়াকে বেগবান করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। চীন সার্কে ব্যাপকভিত্তিক ভূমিকা রাখতে চাইছে। এসবই ইতিবাচক। তবে নির্দিষ্ট তারিখ না দিয়ে ‘যত দ্রুত সম্ভব’ সাফটার বাস্তবায়নের ফাঁকা কথায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলো আশ্বস্ত হবে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং তাঁর পাকিস্তানি প্রতিপক্ষ ইউসুফ রাজা গিলানিকে ‘শান্তিবাদী মানুষ’ হিসেবে ঘোষণা করায় পাকিস্তানি গণমাধ্যমে একটা সন্তুষ্ট ভাব লক্ষ করা গেছে। কিন্তু তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি বিষয়ে বাংলাদেশ এবারেও মৌখিক আশ্বাসের চেয়ে বেশি কিছু পায়নি।
সন্দেহ নেই যে, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা জিইয়ে রেখে সার্ক-প্রক্রিয়াকে বেগবান করা যাবে না। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গঙ্গার পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির জন্য নেপালে ত্রিদেশীয় যৌথ জলাধার নির্মাণের পুরোনো পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। এ জন্য ৬৮ হাজার ৬০০ কিউসেক পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনাময় কোসি বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন। এতে যে সবারই লাভ, সেটা ভারতেরও ভালো জানা আছে। কিন্তু ভারত বরাবরই পানিসম্পদের ব্যবস্থাপনা দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সমাধানে অটল থেকেছে। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলেছে বাংলাদেশ।
দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ মতবিরোধ মিটিয়ে ফেলা গেলে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সার্ক এখনো হয়তো আসিয়ানের চেয়েও একটি কার্যকর সংস্থায় রূপান্তরিত হতে পারে। আঞ্চলিক রেলওয়ে যোগাযোগ চুক্তি চূড়ান্তের তাগিদ যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে এই অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবে। তবে এর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে বড় দুটি দেশের সদিচ্ছার ওপর।
মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি অঙ্গীকার করেছেন, তাঁর দেশের সভাপতিত্বের মেয়াদে তিনি প্রতি মাসে অন্তত একটি করে সার্ক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন। এই চেতনা ও উদ্দীপনা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। আমরা আশা করব, বাণিজ্য ও জলবায়ু বিষয়ে সার্ক নেতারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উপযুক্ত কর্মকৌশল গ্রহণে সচেষ্ট হবেন।

No comments

Powered by Blogger.