মার্কিন অবস্থানে পরিবর্তন আসছে?-আন্তর্জাতিক by ব্রুস স্টোকস

যারা বুশের আমলে আমেরিকার একতরফা হস্তক্ষেপের সমালোচনায় সরব ছিলেন, তাদের মার্কিন স্বতন্ত্রবাদ তথা পররাষ্ট্রের ব্যাপারে নাক না গলানোর নীতি দেখার সৌভাগ্য হতে পারে। বিশেষত, ২০১২ সালে রিপাবলিকানরা হোয়াইট হাউস পুনর্দখল করতে পারলে। যুক্তরাষ্ট্র তার ইতিহাসজুড়ে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিশ্ব, এমনকি ঘনিষ্ঠ মিত্রদের থেকেও মুখ ঘুরিয়ে থেকেছে।
এখন আমেরিকার জনগণ যে ধরনের আচরণ করছে তা অব্যাহত থাকলে আমেরিকা আবার একই কাজ করতে পারে।
এশিয়া, ইউরোপ, ন্যাটো, আফগান যুদ্ধ ও বিশ্বের বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে এই নতুন অন্তর্মুখী আমেরিকা গভীর রেখাপাত করতে পারে। বিশ্ব নির্দিষ্ট সময় অন্তর আমেরিকার এহেন আচরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটা আবারও ঘটতে দেখা যেতে পারে।
বিশ্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ্রোচ বিবেচনায় নিলে স্বাতন্ত্র্য অবস্থান নেওয়াকে তেমন নতুন বিস্ময়কর ঘটনা মনে হবে না। ১৮০১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন তার উদ্বোধনী ভাষণে আন্তর্জাতিক 'জোটে জড়ানোর' বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। আর এ ধরনের সতর্কবাণী আমেরিকার ইতিহাসজুড়ে বারবার উচ্চারিত হয়েছে। নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার এই সেন্টিমেন্ট প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার অংশগ্রহণকে বিলম্বিত করেছিল। আর এটা ১৯১৯ সালে লীগ অব নেশনস-এ আমেরিকার সদস্যপদ কংগ্রেসের প্রত্যাখ্যান করা পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। এর পর ভিয়েতনামে আমেরিকার হতাশাজনক ও মারাত্মক অভিজ্ঞতা এবং অপমানজনক বিদায়ের পর দেশটির ভবিষ্যত ভূমিকা নিয়ে বিশ্বের উদ্বেগ আবার চরমে পেঁৗছে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব আবার আমেরিকানদের মধ্যে ফিরে এসেছে।
চলতি বছরের মে মাসে পিউ রিসার্স সেন্টার পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, আমেরিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৮ শতাংশ লোক মনে করে, দেশের বাইরের সমস্যার প্রতি কম মনোযোগ দেওয়া উচিত। এই হার ২০০৪ সালে পরিচালিত জরিপের চাইতে ৯ শতাংশ বেশি। একই জরিপে দেখা যায়, ৬৫ শতাংশ আমেরিকান মনে করে, আমেরিকার বৈদেশিক সামরিক অঙ্গীকার হ্রাস করা উচিত এবং ৭২ শতাংশ আমেরিকান মনে করে, তাদের বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ কমানো উচিত। অথচ, সাম্প্রতিক দশকে আমেরিকান বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ তাদের ২০০৯ সালের গড় জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক দুই শতাংশে নেমেছে।
আমেরিকার জনগণের এই উল্টো মনোভাবটা আফগান যুদ্ধের বেলায় বেশি করে প্রকট হয়। এই যুদ্ধ শুরু করেন ডবি্লউ বুশ আর বেগবান করেন বারাক ওবামা। এখন আমেরিকার জনগণের ৬৫ শতাংশ মনে করে, তাদের আফগানিস্তান থেকে সৈন্য হ্রাস বা পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া উচিত।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডবি্লউ বুশের অলক্ষুণে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় হোক অথবা তাদেরকে ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট ওবামার উপলব্ধি করা আন্তর্জাতিকতাবাদ থেকে পৃথক প্রমাণের জন্যই হোক, রিপালিকানরা বিশেষভাবে বিশ্বের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা এবং তাদের ভোটাররা কেবল আফগান যুদ্ধের ব্যাপারেই নয়, তারা তাদের প্রতিপক্ষ ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে অনেক বিষয়ে লক্ষণীয়ভাবে অনেক বেশি স্বাতন্ত্র্যবাদী। এখন ওবামা যখন রিপাবলিকানদের সঙ্গে ইমেজ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছে তখন এটা বলাই যায় যে, রিপাবলিকান সংবেদনশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।
নিজেদের বিশ্ব ঘটনাবলি থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার বিষয়টি ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আরও বেশি দানা বেঁধেছে। জরিপে দেখা যায়, ৭০ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এখন আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে আমেরিকাকে গুটিয়ে নেওয়ার পক্ষে।
রিপাবলিকান ভোটাররা ন্যাটোর সঙ্গে দূূরত্ব বজায় রেখে চলছেন। তবে এখনও সামান্য গরিষ্ঠ ৫১ শতাংশ আমেরিকার জনগণ তাদের দেশের নিরাপত্তায় ন্যাটোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে। তবে, ন্যাটোর প্রতি সমর্থনটা কিন্তু ২০০৯ সালের তুলনায় ১১ শতাংশ কমে গেছে। ন্যাটোর প্রতি একই সময়কালে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ৫ শতাংশ বেড়ে ৫৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আর স্বতন্ত্রদের সমর্থন হ্রাস পেয়েছে ২ শতাংশ।
যত বেশিসংখ্যক আমেরিকান ইউরোপের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ও নিজেদের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে, তত বেশি তারা এশিয়ার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে বুঝতে পারছেন। জিএমএফ জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করে, ইউরোপের দেশগুলোর চেয়ে এশিয়ার চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের জন্য অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ যখন অর্থনৈতিকভাবে হোঁচট খাচ্ছে এবং এশিয়া যখন দ্রুত বিকাশ লাভ করছে, তখন এই জরিপের ফলাফল আগ্রহোদ্দীপক। তবে, অনেক আমেরিকান বিশেষত রিপাবলিকান দলীয়দের কাছে বিকাশমান এশিয়া, বিশেষ করে চীনের তর তর করে বিকাশটা আতঙ্কজনক। এটা আমেরিকার জন্য সুযোগ তৈরি করেনি,বরং গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করেছে বলেই তারা মনে করেন।
আগামীতে প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীরা মার্কিন জনগণের পরিবর্তনশীল মনোভাবের দোহাই দিয়ে প্রকাশ্যে এহেন স্বাতন্ত্র্যবাদী বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকবেন বলে আশা করা যায়। কারণ নেতারা ঠিকই বোঝেন, সব সময় পপুলার মতকে প্রশ্রয় দিলে আখেরে দেশেরই ক্ষতি হতে পারে। তাই বলে আন্তর্জাতিক প্রশ্নে মার্কিন জনগণের পরিবর্তিত নেতিবাচক মনোভাবের এতে কোনো পরিবর্তন হবে না। আর এই জনমত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবেই। আফগান যুদ্ধ, ন্যাটো, ইউরোপের সঙ্গে এনগেজমেন্ট নিয়ে মার্কিন নেতিবাচক মনোভাব এবং চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বৈরিতাও ঘুচবে না।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী যদি ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে হোয়াইট হাউসে বসেন, তাহলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এর প্রভাবকে হেলা করা যাবে না।

ব্রুস স্টোকস :যুক্তরাষ্ট্রের জার্মান মার্শাল ফান্ডের সিনিয়র ট্রান্সআটলান্টিক অর্থনৈতিক বিষয়ক ফেলো খালিজ টাইমস থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর সুভাষ সাহা
 

No comments

Powered by Blogger.