বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চাই, বাণিজ্য নয়-শিক্ষা by তারেক শামসুর রেহমান

শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ও ইউজিসির সদস্য থাকার সুবাদে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আমি বিরোধিতা করছি। কেননা এতে একদিকে সার্টিফিকেট বাণিজ্য হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে 'মাস্টার্স ডিগ্রিধারীদের' বিস্ফোরণ ঘটবে, যারা একসময় 'মামা-খালুর' জোরে কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশাসনের উচ্চ পদগুলো দখল করবে এবং আমরা পরিণত হবো একটি মেধাশূন্য জাতিতে।


কারা সেখানে শিক্ষক হবেন, এটা কি বিবেচনায় নিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী? দু'দুটি জাতীয় দৈনিকে এখন এই জানুয়ারি মাসে সরকার একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেসরকারি) অনুমোদন দিতে যাচ্ছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, ঠিক তখনই অন্য একটি জাতীয় দৈনিক ধারাবাহিকভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি ছাপছে। বিষয়টি কাকতালীয়ভাবে কি-না জানি না, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি সরকারের নীতিনির্ধারকরা সংবাদগুলো মিলিয়ে দেখবেন। ১৯ ও ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত দুটি জাতীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদন পড়ে যা জানা গেল তা হচ্ছে, ৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদন চূড়ান্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যা আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে তা হচ্ছে, আবেদনকারীদের মধ্যে ৪ জন রয়েছেন_ যারা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা, সাংসদ_ তাদের কথা নাইবা বললাম। সংবাদে এমন কথাও বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয় একটি 'ফিট লিস্ট' তৈরি করেছে, যার ভিত্তিতে নতুন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করার অনুমতি দেওয়া হবে এবং প্রধানমন্ত্রী এগুলো অনুমোদন করবেন।
উচ্চশিক্ষা কোনো ব্যবসা নয় যে, এখান থেকে মুনাফা অর্জন করতে হবে। মুনাফা অর্জন করার অনেক জায়গা রয়েছে। ঢাকা তো এখন 'দোকানদার'দের শহরে পরিণত হয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে বিক্রি করলেও কারও কিছু বলার নেই। ব্যবসা করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তাহলে 'বাণিজ্য' কেন? আর যদি 'বাণিজ্য' করতেই হয়, তাহলে সরকারকে এটা ঘোষণা দিতে হবে_ এখানে যে কেউ পুঁজি বিনিয়োগ করে এখান থেকে 'মুনাফা' তুলে নিতে পারবেন। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও তাহলে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দিতে হবে! কথাটা শুনতে খারাপ শোনায়; কিন্তু বাস্তবতা কি তাই বলে না? যেখানে খোদ ৫৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট বাণিজ্য আমরা বন্ধ করতে পারছি না, সেখানে ইউজিসি আরও ৭৫টি আবেদন চূড়ান্ত করে কীভাবে? তাহলে কি ধরে নেব শর্ষের মধ্যে ভূত আছে!
শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ও ইউজিসির সদস্য থাকার সুবাদে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আমি বিরোধিতা করছি। কেননা এতে একদিকে সার্টিফিকেট বাণিজ্য হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে 'মাস্টার্স ডিগ্রিধারীদের' বিস্ফোরণ ঘটবে, যারা একসময় 'মামা-খালুর' জোরে কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশাসনের উচ্চ পদগুলো দখল করবে এবং আমরা পরিণত হবো একটি মেধাশূন্য জাতিতে। কারা সেখানে শিক্ষক হবেন, এটা কি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে? কারা বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য হয়েছেন এবং আগামীতে হবেন, তা কি অজানা? বিদেশি দূতাবাসে কাজ করা ব্যক্তি এখন উপাচার্য নামের আগে অবৈধভাবে 'অধ্যাপক' লেখেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ ব্যাপারে কি করণীয় কিছু নেই?
না, আমি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে আমি 'কমপ্রোমাইজ' করতে রাজি নই। হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েটকে বিশ্বের 'জব মার্কেটে' নিয়ে যেতে হলে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। এর বিকল্প নেই। আজ প্রায় ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সরকারি ও বেসরকারি) সঙ্গে কলেজের কোনো পার্থক্য আমি খুঁজে পাই না। সবগুলোতে বিবিএ চালু হয়েছে। বাংলায় পড়ানো হয় বিবিএ। নোট তৈরি করে দেন 'স্যাররা'। ক্লাসে উপস্থিত থাকার বালাই নেই। উপস্থিত থাকলেও নোটবই খুলে লেখায় কোনো বারণ নেই। আর গ্রেডিং মান সর্বোচ্চ। ওই 'গোল্ড মেডেল'ধারীদের একজনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাননি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে শিক্ষার মান আজ কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, করপোরেট হাউসগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তা জানেন। আগে বাংলায় পাস করেও ব্যাংকে চাকরি পাওয়া যেত। এখন বাংলার জায়গা দখল করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা। বেতন পনের হাজারেরও নিচে (আমাদের জমানায় আইবিএ-এমবিএর সূচনা বেতন ছিল প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো, সেই আশির দশকে)। করপোরেট হাউসগুলো শোষণ করছে। আর এর ক্ষেত্র তৈরি করছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যেহেতু আবেদনকারীদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে অনুমোদন দিতে হবে, সে ক্ষেত্রে কতগুলো নীতি অনুসরণ করা যায়। এক. সুনির্দিষ্টভাবে বলে দিতে হবে তাদের শিক্ষার কারিকুলাম সীমাবদ্ধ থাকবে নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এর বাইরে কোনো বিষয়ের জন্য তারা ভবিষ্যতে আবেদন করতে পারবে না। দুই. একেকটি বিশ্ববিদ্যালয় একেকটি বিষয় নিয়ে তাদের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করতে পারে। এক গাদা বিষয়ে তারা ছাত্রভর্তি করাতে পারবে না। তিন. ফার্মেসি, আইটি, গার্মেন্ট, মেরিন সায়েন্স, বিদেশি ভাষা, জাহাজ নির্মাণ প্রকৌশল, জিন প্রযুক্তি, অটো মেকানিকস্, কৃষিপ্রযুক্তি তথা কৃষিবিজ্ঞান, নার্সিং, পরিবেশ, মহাশূন্য ইত্যাদি বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে। এক একটি বিশ্ববিদ্যালয় এর মধ্যে থেকে তিন-চারটি বিষয় নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে পারে। ফার্মেসি, গার্মেন্ট, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে আমাদের মান আন্তর্জাতিক সম্পন্ন এবং আমরা একটি নেতৃত্বের আসনে রয়েছি। অন্যদিকে নার্সিং খাত, মেরিন সায়েন্স ও সাগরবিজ্ঞান, পরিবেশ ও কৃষি একটি অগ্রাধিকার খাত। বিদেশে প্রচুর চাহিদা রয়েছে এবং এসব ফিল্ডে আমরা প্রচুর জনশক্তি রফতানি করতে পারব। এ জন্য বিদেশি ভাষানির্ভর একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত বিশ্বে আজও রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
প্রসঙ্গক্রমে ইতিপূর্বে (১ জানুয়ারি) সমকালে প্রকাশিত আমার একটি লেখার (বাংলাদেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা) নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মূলত দু'জন। একজন (আবুল কাসেম হায়দার) একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা। অপরজন (মামুনুর রশিদ) একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক। আরেকজন আবদুল মান্নান, এক সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি ও বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি অবশ্য আমার নাম উল্লেখ না করে সহযোগী অপর একটি দৈনিকে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন (সংকটের আবর্তে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়)। তিনটি লেখার মূল বিষয় একটাই_ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভালো, সংকট নেই, সেশনজট নেই। আমি কারও বক্তব্যের সমালোচনা করব না। শুধু একটা ব্যাখ্যা দেব। সিদ্ধান্ত নেবেন পাঠক। উদ্যোক্তা ও অধ্যাপক মহোদয় যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগান গাইবেন, তাতে আমি অবাক হইনি। অবাক হয়েছি মামুনের লেখায়, যেখানে অসত্য তথ্য রয়েছে। জীবনটা যার সবে শুরু, সে যদি শুরুতেই বিভ্রান্তিতে পড়ে (টাকার মোহ), আমাকে তা কষ্ট দেয়। এই তরুণরাই 'আরব বিপ্লব' সম্পন্ন করেছে। এই তরুণরাই 'অকুপাই মুভমেন্ট'-এর জন্মদাতা। আমার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে। এক. আমি কখনও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে নই। পক্ষে। আর এ কারণেই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা হোক, আমি তা চাই। তাতে করে প্রতিযোগিতা বাড়বে। শিক্ষার মান উন্নয়নে তা সহায়ক হবে। কোন আইনে তা হবে, বিষয়টি দেখবে সরকার। তবে অবশ্যই তাদের পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় (শাখা) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদের লাভ, আমাদের ছাত্ররা বিদেশি শিক্ষকের অধীনে পড়তে পারবে। ক্রেডিট ট্রান্সফার সহজ হবে। দুই. আমি কখনও বলিনি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবসা করতে দেওয়া হোক। তারা যদি ভালো পড়ায়, তাহলে ছাত্ররা সেখানেই ভর্তি হবে। তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। তিন. চট্টগ্রামে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানের জন্য সরকার জমি দিয়েছে। এটা যৌক্তিক। এখানে দাতা দেশগুলোর ফান্ড ও প্রশিক্ষকও রয়েছেন। ওই বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা করা যাবে না। চার. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও প্রায় ক্ষেত্রে ৪টি ফার্সদ্ব ক্লাস ছাড়া শিক্ষক হওয়া যায় না। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই এই নিয়মটি রক্ষিত হয় না। পাঁচ. কোনো অবস্থাতেই কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ বছরে অধ্যাপক হওয়া যায় না। পিএইচডি থাকলে, ১২ বছরের ওপর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলেও অধ্যাপক হওয়া যাবে না, যদি না নূ্যনতম ১০ থেকে ১২টি গবেষণাপত্র না থাকে (অবশ্যই তা হতে হবে রেফারড জার্নালে)। ছয়. কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১১-এ। আমি এর পক্ষে। এপিইউ কেন বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে না, আমি তা বুঝতে অক্ষম। আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠনের পক্ষে। সাত. আমি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের বিপক্ষে কথাটি সত্য নয়। কাসেম হায়দার, উপাচার্য সাবেক, উপাচার্য সাইফুল মজিদসহ অনেকে আমার বন্ধুসম। 'নেতিবাচক' বলা হয়েছে এ কারণে যে, এপিইউ কখনও মান উন্নয়ন, দুর্নীতি রোধে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। আট. এপিইউর সদস্য, যারা সার্টিফিকেট বাণিজ্য করে, তাদের সদস্যপদ বাতিল করতে হবে। নয়. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এবং উপাচার্যদের 'ডাটা ব্যাংক' প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং শিক্ষক নিয়োগে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠীস্বার্থ নিরুৎসাহিত করতে হবে। এটাকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যাবে না। পদোন্নতির নীতিমালা থাকতে হবে। স্ত্রী বা পুত্রকে ভিসি বানানো যাবে না।
মোট কথা একুশ শতকে দাঁড়িয়ে মানসম্মত শিক্ষা যদি আমরা দিতে না পারি, আমরা সার্টিফিকেটসর্বস্ব জাতিতে পরিণত হবো।

প্রফেসর ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক জাবি ও ইউজিসির সাবেক সদস্য

No comments

Powered by Blogger.