রাজসিক অভিষেক

তিনটি তিনটি করে দু'দিকে মাত্র তো ছয়টি স্টাম্প, এগারো দিয়ে ভাগাভাগি করতে গেলে স্টাম্পগুলো দু'টুকরো করতে হয়, সেটা তো আর সম্ভব না। তাই দূরে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং করা শুকতারা বিজয় স্মারক হিসেবে গতকাল কোনো স্টাম্প সংগ্রহ করতে পারলেন না। হুড়াহুড়ির মধ্যে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি খাদিজাতুল কুবরার হাতও শূন্য থাকল, কোনো স্মারক স্টাম্প উঠল না; কিন্তু এসবে আর কী আসে যায়! লাল-সবুজ পতাকাকে আবারও


উঁচুতে তোলার আনন্দে তখন ভাসছেন সবাই। ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার মাত্র চবি্বশ ঘণ্টা পরই অভিষেক ম্যাচে রাজসিক জয় পেয়েছে মহিলা ক্রিকেট দল। বিকেএসপির মাঠে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৮২ রানের রাজসিক জয় নিয়ে শুধু বিশ্বকাপ বাছাইয়ের পঞ্চম স্থান নয়, আইসিসি র‌্যাংকিংয়েও ৯ নম্বরে উঠে এসেছেন সালমারা। কিছুটা ভাগ্যে বিশ্বাসী হয়ে, আর কিছুটা কৃতজ্ঞতা থেকে তাই ম্যাচ শেষে বিকেএসপির ঘাসে সেজদাহ দিতে দেখা যায় শুকতারাদের। লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে আবারও বিজয়ের বেশে দৌড়াতে দেখা যায় সবাইকে। যে দৃশ্যটা গত কয়েকদিন গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে, মেয়েদের বিজয়ীর সেই উল্লাসটাই ফের ক্যামেরাবন্দি হয়ে যায় সযত্নে। 'ভাবতেই ভালো লাগছে, প্রথম ওয়ানডেতেই আমরা জয় পেয়েছি। আয়ারল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে আমরা ২১০ রান করেছি। যদিও আরও বেশি রান হতে পারত। তারপরও আয়ারল্যান্ডকে ১২৮ রানের মধ্যে অল আউট করেছি। এ আসরেই আগে একবার এ দলটিকে হারিয়েছিলাম; কিন্তু আজকের এই হারানোটা অন্য রকমের। রেকর্ড হয়ে থাকবে, সবাই মনে রাখবে বাংলাদেশের মেয়েরা তাদের প্রথম ম্যাচেই জয় পেয়েছিল।' হাতে বিজয়ের স্মারক হিসেবে রাখা স্টাম্পটি ধরেই সালমা খাতুন তার দলের সাফল্যগাথার কথা বলেছিলেন।
হয়তো তুলনা চলে না, তারপরও একটি তথ্য সালমাদের এ সাফল্যের মাহাত্ম্য প্রমাণ করে। বাংলাদেশের ছেলেদের দল ১৯৮৬ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিল, তাদের জয় পেতে সময় লেগেছিল ১৩ বছর, ১৯৯৮ সালে কেনিয়াকে প্রথম হারিয়েছিলেন বাংলাদেশের ছেলেরা। মেয়েদের সেখানে জয় পেতে সময় লাগল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। দলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেই বদলে যাওয়া চেহারায় ধরা দিয়েছিল এদিন সালমাদের দল। আয়শা আকতারকে বসিয়ে ওপেনে নামানো হয়েছিল বিকেএসপির একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী শারমীন সুপ্তাকে। প্রথম ম্যাচেই তিনি ৫৩ রান করে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। আর বড় একটি প্রশ্নের মুখেও টিম ম্যানেজমেন্টকে দাঁড় করিয়ে দেন। যে মেয়ের ক্রিকেট টেকনিক এত ভালো, তাকে কেন গত ছয়টি ম্যাচে বসিয়ে রাখা হয়েছে? ম্যাচের পর জয়ের উল্লাসে থাকা কেউ এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না।
আসলে টস জয় থেকে শুরু করে ম্যাচের প্রতিটি ক্ষণেই আইরিশদের চেয়ে এগিয়েছিলেন বাংলাদেশিরা। প্রথম অফিসিয়াল ম্যাচ হওয়ায় এদিনের সবকিছুই ছিল রেকর্ড। সেখানে ওপেনিং জুটিতে বেশ সম্মানের একটা রেকর্ড গড়ে বসেন শুকতারা আর সুপ্তা। দু'জনের হাফ সেঞ্চুরিতে ভর করে ১১৩ রান আসে প্রথম উইকেট থেকেই। ৩০ ওভারের মাথায় সুপ্তি ক্লান্ত হয়ে পড়লে রান আউট হন। এরপর শুকতারাও ৫২ রানের বেশি করতে পারেননি। তিনিও আউট হয়েছিলেন ১৪৮ মিনিটে ১১৯ বল খেলার ক্লান্তির কারণেই। তবে এ দু'জনের খুলে যাওয়া রানের অ্যাকাউন্টে খুব বেশি প্রিমিয়াম জমা করতে পারেননি বাকিরা। শেষ দিকে রুমানা ৩০ বলে ৩৬ রান আর লতা মণ্ডল ২৮ বলে ২৭ রান তুলেছিলেন ঠিকই, তবে অধিনায়ক সালমা এদিন ৪ রানের বেশি করতে পারেননি।
বাংলাদেশিদের দুশ'র ওপর রান তোলা দেখেই আইরিশটা কিছুটা ব্যাকফুটে চলে যায়। আগের ম্যাচে গেঁথে যাওয়া বাংলাদেশি স্পিন আতঙ্ক তখনও বিরাজ করেছিল আইরিশ মেয়েদের মধ্যে। তবে ওপেনিং জুটিতে তারাও ৪১ রান করে কিছুটা প্রতিরোধের ইঙ্গিত দিয়েছিল; কিন্তু ১১ রানে থাকা ওপেনার হেওয়ার্ডকে সালমা আউট করার পর আইরিশ বাঁধ ভাঙতে সময় লাগেনি। পরের ৩৮ রান তুলতেই ৪ উইকেট পড়ে যায়। শুধু বোলিং নয় ফিল্ডিংয়েও রুমানা, ফারজানা, লতারা ছিলেন দুর্দান্ত। ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার সম্মানটা যে এমনি এমনি পায়নি বাংলাদেশ, তা এদিন রুমানা-কুবরারা বুঝিয়ে দেন তাদের বোলিং ও ফিল্ডিং দিয়ে। সালমা তিনটি, রুমানা দুটি এবং একটি উইকেট শিকার করেন কুবরা। তখনও পর্যন্ত ১৮ উইকেট পাওয়া কুবরাই ছিল আসরের সর্বোচ্চ শিকারি; কিন্তু মিরপুরে ৭ উইকেট পাওয়া ক্যারিবিয়ান স্পিনার আনিসা মোহাম্মদ শেষ বেলায় এসে টপকে যান কুবরাকে। অনেক পাওয়ার দিনে এটুকু না পাওয়াটা ছাড় দেওয়া যেতেই পারে।

No comments

Powered by Blogger.