সরকারের দুই আপদ: ছাত্রলীগ ও দলীয়করণ by সোহরাব হাসান

১৩ মাসের মাথায় এসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? কেউ বলবেন নিত্যপণ্যের দাম কমাতে না পারা। কেউ বলবেন বিনিয়োগে মন্দা। আবার কারও উত্তর হতে পারে অদক্ষ-অনভিজ্ঞ মন্ত্রিসভা।
আমরা মনে করি, এর কোনোটি নয়। সরকারের সামনে প্রধান আপদ হয়ে দেখা দিয়েছে ছাত্রলীগ ও দলীয়করণ। প্রধানমন্ত্রীর মৃদু ধমকে ছাত্রলীগ কিছুদিন চক্ষুলজ্জার খাতিরে কিছুটা আড়ালে থাকলেও ইদানীং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। (অবশ্য তাদের প্রতিপক্ষ ছাত্রদলও কম যায় না। তারা ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে সংগঠনের সভাপতির ওপর চড়াও হয়েছে)। তবে ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট ছাত্রলীগের তত্পরতা কেবল সংঘাত-সংঘর্ষে সীমিত নেই। যেখানে ভর্তি সেখানেই ছাত্রলীগের বাণিজ্য। যেখানে টেন্ডার সেখানে তাদের মাস্তানি। আর কর্তৃত্ব-নেতৃত্বের কোন্দল তো আছেই। তাদের এই কোন্দলের সশস্ত্র মহড়ার বলি হলেন এফ রহমান হলের ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক। দিনমজুর বাবা কষ্ট করে সন্তানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন লেখাপড়া করে সে সংসারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবে। সেই সন্তান বুধবার বাড়ি ফিরে গেল লাশ হয়ে। মহাজোট আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ছাত্র হত্যার কৃতিত্বও ছাত্রলীগ দাবি করতে পারে। ছাত্রলীগের মাস্তানি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা মাস্তানি চালিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে তাড়িয়েছে। ঢাকা কলেজের একজন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করেছে।
ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের মাস্তানি প্রসঙ্গে মনে পড়ল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চেয়ারপারসন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। সম্ভবত এরশাদের শাসনামলের শেষ দিকে ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচন হচ্ছিল। নিজেদের ভরাডুবি টের পেয়ে নির্বাচন বানচাল করে দিলেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। যাঁরা তাঁরই ছাত্র। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ছাত্র নামধারীদের এ মাস্তানি সহজে মানতে না পেরে শিক্ষকতা পেশাই ছেড়ে দিলেন। পরে সে অভিজ্ঞতার কথা লিখলেন নিষ্ফলা মাঠের কৃষক বইয়ে। তখনকার ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা বইটি পড়লে লজ্জা পেতেন। ভাগ্যিস, ছাত্রলীগের নেতারা বইয়ের চেয়ে আগ্নেয়াস্ত্রই বেশি প্রিয় মনে করেন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার সন্ত্রাসকে জাতীয়করণ করেছিল। মহাজোট দলীয়করণকে ক্ষমতায় থাকা ও ভবিষ্যতে আসার মোক্ষ অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। এর পরিসংখ্যান দিয়ে শেষ করা যাবে না। পত্রিকা খুললেই দেখা যাবে, নদী থেকে রাস্তা, বন্দর থেকে টার্মিনাল, সচিবালয় থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়—সর্বত্র চলছে দলীয়করণের মহোত্সব।
আমাদের দেশে একটি অদ্ভুত নিয়ম চালু হয়েছে। যে দল যখন ক্ষমতায় থাকবে, জনপ্রশাসনকে তাদের মতো চালাতে চায়। সেখানে দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, চাকরিবিধি, এসিআর, অফিস আদেশ—কিছুই না। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের কথা না শুনলে হয় অনন্তকাল ওএসডি থাকতে হবে অথবা খাগড়াছড়ি বদলি হতে হবে। অথচ, নির্বাচনী ইশতেহারে প্রশাসনকে দলীয়করণ করা হবে না বলে ওয়াদা করা হয়েছিল। অন্যদিকে, মেরুদণ্ড সোজা রেখে আমলাদের কাজ করার নজিরও খুব বেশি নেই। যাঁরা বেশি বুদ্ধিমান, তাঁরা গত আমলের ক্ষতি সুদাসলে উসুল করে নেন, নিচ্ছেন। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আদলে দিনবদলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। এখন দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বদলাচ্ছেন, দেশ বদলাচ্ছে না, মানুষের ভাগ্য বদলাচ্ছে না।
রূপকল্প ২০২১ শিরোনামের মোট ২৩ দফার নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগের পাঁচটি অগ্রাধিকার ছিল যথাক্রমে ১. দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা, ২. দুর্নীতির বিরুদ্ধে বহুমুখী ও দীর্ঘস্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ, ৩. বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, ৪. দারিদ্র্য ও বৈষম্যের অবসান, ৫. সুশাসন প্রতিষ্ঠা।
দেখার বিষয়, এ পাঁচ অগ্রাধিকার সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে? প্রথমে আসি দুর্নীতি বিষয়ে।
চারদলীয় জোট সরকারের ভরাডুবির প্রধান কারণ ছিল দুর্নীতি ও সন্ত্রাস। তাদের শাসনামলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের জরিপে দেশ চারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কাজটি শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগের আমলেই। নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবিরোধী ঘোষণা জনমনে আশা জাগালেও গত এক বছরে সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে, তার প্রমাণ নেই। বরং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা বাছবিচারহীনভাবে প্রত্যাহারের কাজ চলছে। সেখানেও মামলার গুণাগুণ নয়, অগ্রাধিকার পাচ্ছে দলীয় বিবেচনা। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানও সংস্থাকে ‘নখদন্তহীন বাঘ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, রাজনীতিবিদদের সহায়তা না পেলে দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না। এই রাজনীতিক বলতে তিনি কাদের ইঙ্গিত করেছেন? আমাদের দেশে বিরোধী দলে থেকে দুর্নীতি করার সুযোগ কম; যদিও শুল্কমুক্ত গাড়ি ও রাজউকের দেওয়া ফ্ল্যাট-প্লটের হিস্যা পাওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রীর দাবি গত এক বছরের মন্ত্রিসভায় কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কেউ দুর্নীতির অভিযোগ করেনি। এতে প্রমাণিত হয় না মন্ত্রিসভা নিষ্কলুষ, দেশ দুর্নীতিমুক্ত। সরকারি অফিসে ঘুষ-দুর্নীতি আগের মতোই চলছে।
আওয়ামী লীগ যথার্থভাবেই বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতকে তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করলেও, গত এক বছরে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য। বছরের মাঝামাঝি বিদ্যুত্ খাতের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা ঘোষিত হলেও বাস্তবায়নের লক্ষণ নেই। আগামী মার্চ-এপ্রিলে যে এক হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা, তার কাজ শুরু হয়েছিল মহাজোট ক্ষমতায় আসার আগেই। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দুটি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে পিএসসি সই হলেও তা জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে প্রতিবাদ করে আসছে তেল, গ্যাস ও জ্বালানিসম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটি।
নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত চতুর্থ অগ্রাধিকারে দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য দূর করার কথা বলা হলেও আগের সরকারের ধারাবাহিকতার বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি নেই। ‘জাতীয় সেবা’ নামে এক পরিবারে একজনের চাকরির নামে প্রলুব্ধকর কর্মসূচিটি শুরু হওয়ার আগেই দলীয়করণের অভিযোগ এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় স্থানীয় প্রশাসনকে এড়িয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সাত লাখ জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি চাকরির জন্য এভাবে দলীয় কর্মীদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। কেউ মামলা ঠুকে দিলে পুরো প্রকল্পটির ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
নির্বাচনী ইশতেহারের পঞ্চম অগ্রাধিকার সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে ছয়টি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করা হয়েছিল, তার অধিকাংশ অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে অথবা এ ব্যাপারে সরকার বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে। বাস্তবে তা বন্ধ হয়নি, বরং অপরাধ দমনে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকেই কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার এখনো ন্যায়পাল নিয়োগ করেনি। মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হলেও তার কার্যপরিধি ঠিক করা হয়নি।
নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয় সংসদকে কার্যকর করার কথা বলা হলেও প্রথম অধিবেশনের পর থেকে বিরোধী দল সংসদ বর্জন করে চলেছে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাহাসও কম হয়নি। বিরোধী দল সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও কত দিন থাকবে তা বলা যাচ্ছে না। বিএনপি আমলে আওয়ামী লীগও তাই করেছিল। যেভাবে সংসদ চলছে তাতে গত নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী দেশগুলোও অসন্তুষ্ট। হতাশ নাগরিক সমাজ। এ অবস্থা চলতে থাকলে সংঘাতের রাজনীতি অনিবার্য হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যে বিএনপির নেতৃত্ব সরকার উত্খাতের জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকতে বলেছেন।
নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিবছর প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সাংসদ ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব বিবরণী দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। গত এক বছরে কেউ তা দেননি। কেন দেননি তার জবাব নেই। বরং অনেক সাংসদ নির্বাচনীব্যয় বিবরণীতে দেওয়া বাড়ি বা ফ্ল্যাটের কথা গোপন রেখে রাজউক থেকে প্লট নিয়েছেন। এঁরাই হলেন আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি।
পূর্ববর্তী চারদলীয় জোট সরকারের সঙ্গে তুলনা করলে হয়তো মহাজোট সরকার গত এক বছরে বেশ কিছু ভালো কাজ করেছে। যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীরা আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন। ভালো কাজের জন্য বাহবা তাঁরা পেতেই পারেন। কিন্তু মন্দ কাজ পরিহার এবং দল থেকে মন্দ লোকগুলোকে তাড়াতে না পারলে সব অর্জনই ম্লান হয়ে যাবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের খোয়াবদাতাদের বিএনপি-জামায়াতের পথে হাঁটলে চলবে না।
সম্প্রতি আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তৃণমূল নেতারা মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সরকার ও দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরির অভিযোগ এনেছেন। এটি প্রধানমন্ত্রীর জন্য পরীক্ষাও বটে। তিনি যদি ভেবে থাকেন দলের তৃণমূলের নেতারা শতভাগ সাধু হয়ে গেছেন এবং দেশপ্রেমে গদগদ হয়ে মন্ত্রীদের তুলোধুনো করেছেন, তাহলে ভুল করবেন। ক্ষোভের কারণ মন্ত্রী-এমপিদের সত্পথে নিয়ে আসা নয়। বৈধ কি অবৈধ সুযোগ-সুবিধার ‘ন্যায্য’ হিস্যা না পাওয়া। যাঁরা পেয়েছেন শান্ত আছেন, যাঁরা পাননি তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন, ভবিষ্যতেও হবেন। অতএব এসব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে মাথা না ঘামালেও চলবে। বরং এখনো যাঁরা ক্ষুব্ধ হননি, কেন হননি সেসব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।।
সবশেষে দলীয়করণের আরেকটি নজির হাজির করছি। বিষয়টি ছোট, কিন্তু তাত্পর্য বড়। আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভাটি আয়োজন করা হয়েছিল গণভবনে। এটি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন। বর্তমান বাসভবন যমুনায় তিনি থাকছেন সাময়িক। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা সরকারি বাসভবনে দলের সাংগঠনিক সভা হতে পারে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যদি হোয়াইট হাউসে এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন যদি ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে দলীয় সভা ডাকতেন, তা হলে পরদিনই তাঁদের পদত্যাগ করতে হতো।
কিন্তু সব পেয়েছির বাংলাদেশে সবই সম্ভব।
সোহরাব হাসান: সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.