কাদের মোল্লা আলোকদী গ্রামে অসংখ্য বাঙালীকে হত্যা করে- যুদ্ধাপরাধী বিচার -সাফিউদ্দিন মোল্লার সাক্ষ্য

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা মিরপুর থানার পল্লবীর আলোকদী গ্রামে নিজের হাতে গুলি করে অসংখ্য মুক্তিকামী বাঙালীকে হত্যা করেছে। কাদের মোল্লা ও তার বাহিনীর বিহারীরা তাদেরকে ধরে এক জায়গায় নিয়ে আসে।


কিছুক্ষণ পর তিনি পাকসেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে উর্দুতে কিছু বলার পর দূর থেকে গুলির শব্দ শুনতে পাই। সেখানে তার (কাদের মোল্লার) হাতেও রাইফেল ছিল। সেও গুলি করে। গুলিতে ধানকাটার লোকসহ প্রায় ৩৭০ গ্রামবাসী নিহত হন। প্রসিকিউশনের পক্ষে ৬ষ্ঠ সাক্ষী সাফিউদ্দিন মোল্লা বুধবার চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ জবানবন্দীতে এ কথা বলেন।
অন্যদিকে, জামায়াতের অপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তৃতীয় সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা মোঃ জহিরুল হক মুন্সী বীর প্রতীক জবানবন্দীতে বলেছেন, তিনি ক্যাম্পে পাক মেজর আইয়ুবের সঙ্গে কামারুজ্জামানকে কথা বলতে দেখেন। এই পাক মেজর ও কামারুজ্জামান তৎকালে মাইকিং করে সবাইকে হুমকি দিত। মাইকে তারা বলত, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করবে তাদের বাড়িতে লুটপাট ও মহিলাদের সম্ভ্রমহানি করা হবে। এ ছাড়া সাক্ষী বিভিন্ন ক্যাম্পের নির্যাতন ও নিজের ওপর নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ তিনি এই জবানবন্দী প্রদান করেছেন। এর পর আসামি পক্ষের আইনজীবী তাকে জেরা করেন।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আবেদনে নবম সাক্ষী পরাগ ধরকে রিকল আবেদন মঞ্জুর করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ৭ আগস্ট এই সাক্ষীর ক্যামেরা ট্রায়াল অনুষ্ঠিত হবে। একই ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার জেরা অব্যাহত রয়েছে। চেয়ারম্যান বিচারপতি মোঃ নিজামুল হক নাসিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই আদেশ দেয়া হয়েছে।
কাদের মোল্লা ॥ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ষষ্ঠ সাক্ষী সাফিউদ্দিন মোল্লা তার জবানবন্দীতে পল্লবীর আলোকদি গ্রামের গণহত্যার বর্ণনা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ। বুধবার ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে তিনি তার জবানবন্দী পেশ করেন। সাক্ষীর জবানবন্দী দেবার সময় তাকে সহায়তা করেন প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী। আসামি পরে তার জেরা অসমাপ্ত রেখে ৫ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করে দেন ট্রাইব্যুনাল।
সাক্ষী তাঁর জবানবন্দীতে বলেন, আমার নাম সাফিউদ্দিন মোল্লা। মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭১ সালে আমার বয়স ছিল আনুমানিক ১৯ বছর। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় মিরপুর এলাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত লোকজন বেশি ছিল। আর ওই সময় আমাদের পরিবারের লোকজনও আওয়ামী লীগকে সমর্থন করতেন। আমি তখন ছাত্রলীগ করতাম। সাক্ষী তার জবানবন্দীতে বলেন, আমার আপন চাচা নবীউল্লা মোল্লা, আলোকদি গ্রামের মুক্তিকামী জনগণ ৭১ সালে ওই গ্রামে ধান কাটতে আসা কাজের লোকজনসহ প্রায় তিন শ’ ৬০ থেকে ৭০ জনকে আব্দুল কাদের মোল্লা পাকসেনাদের সহযোগিতায় গুলি করে হত্যা করে।
সাক্ষী মোঃ সাফিউদ্দিন মোল্লা আরও বলেন, ১৯৭১ সালে আমি ১৯ বছরের যুবক ছিলাম। মিরপুরে আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তাম। ১৯৭২ সালে সেখান থেকে এসএসসি পাস করি। তিনি বলেন, মিরপুরে ৭০ সালের নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লায় গোলাম আযম ও নৌকা প্রতীকে এ্যাডভোকেট জহির উদ্দিন নির্বাচন করেন। কাদের মোল্লা তখন ওই এলাকার ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতাও ছিল। তিনি গোলাম আযমের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার চালান। সেই সময় থেকে তিনি আবদুল কাদের মোল্লাকে চিনতেন। তিনি বলেন, ২৫ মার্চে পাক হানাদার বাহিনী তার এলাকায় হত্যাকা- চালায়।
সাক্ষী বলেন, যেহেতু আমাদের গ্রামের সবাই আওয়ামী লীগকে ভালবাসতাম এবং সমর্থন করতাম, সেহেতু এ্যাডভোকেট জহির আহম্মেদকে ভোট দিয়েছি। অপরপক্ষে জানামতে, তখন ইসলামী ছাত্রসংঘের কামারুজ্জামান উনি সমর্থক লোকদের নিয়ে প্রচার করতেন। তার সঙ্গে বিহারীরাও ছিল। তখন সাংগঠনিক প্রচারে কাদের মোল্লাকে চিনতাম। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। পাকিস্তানের তৎকালীন সরকার আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাই।
৭ মার্চ আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে জনসভা ডাকলেন। সেই জনসভায় বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন, স্বাথীনতাযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। এর পর আমরা আমাদের গ্রামে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতি ট্রেনিং আরম্ভ করি।
সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে বলেন, ২৪ এপ্রিল ১৯৭১ সালে আলোকদি গ্রামে পাকহানাদার বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার অবতরণ করে। এই হেলিকপ্টার অবতরণ করার পরই ওই গ্রামের লোকজন এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। হেলিকপ্টার থেকেই গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। এরপর দেখি আলোকদি গ্রামটিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর রাজাকার বাহিনীর লোকেরা ঘিরে ফেলেছে। গ্রামের বহু লোক ধান কাটার পেশায় নিয়োজিত ছিল সেদিন।
হেলিকপ্টার নদীর পাশে উঁচু জায়গায় নামে। এর কিছুক্ষণ পরেই পশ্চিম দিক থেকে গুলির শব্দ পাই। উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণ দিক থেকে সঙ্গে সঙ্গে গুলি আরম্ভ হয়। এর পর গুলির শব্দের কারণে গ্রামের লোকরা দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। ফজরের নামাজের সময় আস্তে আস্তে ফর্সা হয়। চোখের সামনে দেখতে পাই ২/১ জনের মৃতদেহ পড়ে আছে। আমি গ্রামের উত্তর পাশে একটা ঝোপের নিচে গর্তে লুকিয়ে পড়ি। এর পর দেখতে পাই পাকি সৈন্যরা বিভিন্ন বাড়ি থেকে লোকজন ধরে এনে জড়ো করছে। তখন ছিল ধানকাটার মৌসুম।
বিভিন্ন জেলা থেকে ধানকাটার জন্য লোকজন আসত। পশ্চিম দিক থেকে পাক সৈন্যরা ঐ লোকজন ও যারা ধান কাটতে এসেছে তাদের ধরে এনে জড়ো করল। এর পর পূর্ব দিকে যারা ছিল, সেগুলো কাদের মোল্লা এবং তার বাহিনীর বিহারী লোকজন একই জায়গায় ধরে নিয়ে আসে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম কাদের মোল্লা পাক সৈন্যদের সম্ভবত অফিসারের সঙ্গে উর্দুতে কি যেন বলাবলি করছিল। দূর থেকে তা শুনতে পাইনি। এর কিছুক্ষণ পর রাইফেল উঁচু করে লোকদের এক সাইডে করে গুলি আরম্ভ করে। সেখানে কাদের মোল্লাও ছিল। সেও গুলি করে। এখানে আমার আপন চাচা মোঃ নবীউল্লাহ এবং গ্রামের অনেক আত্মীয়স্বজনসহ গ্রামের ৭০/৮০ জন ধানকাটা লোকসহ ৩৬০ থেকে ৩৭০ জনকে হত্যা করা হয়।
সেখানে ধানকাটার লোকজন ছিল। ফজরের আজান থেকে আরম্ভ করে পরের দিন সকাল ১১টা পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ ঘটে। সেখানে হত্যাকা-ের পর গ্রামে ঢুকে লুটপাট চালায় । পরে ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। জবানবন্দী শেষে আসামি পক্ষের আইনজীবী তাকে কয়েকটি জেরা করেন। তা নিম্নে দেয়া হলোÑ
প্রশ্ন : সঙ্গে আইডি কার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্র ) এনেছেন?
উত্তর : আনিনি।
প্রশ্ন : স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করেছেন?
উত্তর : স্কুলে পড়েছি।
প্রশ্ন : এসএসসি পাস করেছেন?
উত্তর : করেছি।
প্রশ্ন : কোন সালে?
উত্তর : ১৯৭২ সালে। দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেছি।
কামারুজ্জামান ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তৃতীয় সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা মোঃ জহিরুল হক মুন্সী বীরপ্রতীক জবানবন্দী প্রদান করেছেন। বুধবার চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এই জবানবন্দী অনুষ্ঠিত হয়।
সাক্ষী জহিরুল হক মুন্সি জবানবন্দীতে বলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতে ট্রেনিং নিয়ে গ্রেটার ময়মনসিংহে আসেন। তিনি কামারুজ্জামানকে স্থানীয় সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন করতে দেখেন। ভিক্ষুকের বেশে তিনি কামারুজ্জামানের তৈরি আলবদর ক্যাম্পে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি পাক মেজর আইয়ুবের সঙ্গে কামারুজ্জামানকে কথা বলতে দেখেন। এই পাক মেজর ও কামারুজ্জামান তৎকালীন মাইকিং করে সবাইকে হুমকি দিত। মাইকে তারা বলত, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করবে তাদের বাড়িতে লুটপাট ও মহিলাদের সম্ভ্রমহানি করা হবে।
সাক্ষী আরও বলেন, কামারুজ্জামান ও মেজর সুলতান এই এলাকার বহু মানুষকে ক্যাম্পে এনে নির্যাতন করে মেরেছে বলে তিনি লোকমুখে শোনেন। এক ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, ভারতীয় সেনা কর্মকর্তার একটি চিঠি তিনি রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যান। পরে তাকে সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরবর্তীতে তাকে চিঠির উত্তর পৌঁছে দেবার জন্য ছেড়ে দিলে তিনি বেঁচে যান। ওই ঘটনাতেও তিনি কামারুজ্জামানকে দেখেন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান। সাক্ষী জহিরুলের জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী কফিল উদ্দিন চৌধুরী। সাক্ষীকে সহায়তা করেন প্রসিকিউটর একেএম সাইফুল ইসলাম।
কমান্ডার জহিরুল হক মুন্সি ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দীতে বলেন, তার পিতার নাম মৃত আব্দুর গফুর মুন্সি। জন্ম ৩১ সেপ্টেম্বর, ১৯৫০। গ্রাম ধামারিয়াপাড়া, শ্রীবর্দী, জেলা শেরপুর। তিনি একাত্তর সালে নারায়ণগঞ্জে ইপিআইডিসি ডক ইয়ার্ডে সুপারভাইজার হিসেবে চাকরি করতেন। একাত্তর সালে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণেÑ ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ এরপর স্বেচ্ছাসেবক দল ও ফায়ার ডিফেন্স গঠন করি, যাতে বিমান আক্রমণ হলে বাঁচতে পারি।
তিনি আরও বলেন, ২৫ মার্চ কালরাতে পাকহানাদার বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইপিআর সদর দফতর আক্রমণ করে এবং ঘুমন্ত অবস্থায় বাঙালীদের ওপর চড়াও হয়। ঘুমন্ত অবস্থায় আক্রমণ করে প্রায় ২০ হাজার সেনা, পুলিশ, ইপিআর ও বাঙালী সৈন্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেই খবর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তখন ২৬ ও ২৭ মার্চ আমরা ঢাক নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কে চাষাড়ায় প্রতিরোধ গড়ে তুলি।
সাক্ষী জবানবন্দীতে বলেন, কিন্ত ট্যাঙ্কের সামনে আমাদের থ্রি নট থ্রি মার্ক-৪ রাইফেল দিয়ে যুদ্ধ করতে হবে তা আমাদের ধারণা ছিল না। তখন আমরা ২ দিন প্রতিরোধ করার পর পিছু হটি। আওয়ামী লীগ নেতা দোহা সাহেব ও আলী আহম্মেদ চুনকা আমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, প্রতিরোধ করার জন্য আরও উচ্চতর ট্রেনিং নিতে হবে। ভারি অস্ত্র দিয়ে তাদের (পাকসেনাদের) মোকাবেলা করতে হবে। তখন নারায়ণগঞ্জ থেকে আমরা পিছু হটে যাই। সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে যেতে বলি। উচ্চতর ট্রেনিং নেয়ার জন্য আমরা হেঁটে ঘোড়াশাল-শফিপুর-টাঙ্গাইল-মধুপুর-জামালপুর-শেরপুর-শ্রীবর্দী, বকশীগঞ্জ হয়ে ভারতের মোহেন্দ্রগঞ্জে প্রবেশ করি। ১২/৪/৭১ তারিখে।
কমান্ডার জহিরুল হক মুন্সি জবানবন্দীতে বলেন, সেখানে গিয়ে দেখি বৃহত্তর ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের রফিকউদ্দিন ভুইয়া এবং আরও কয়েকজন বিএসএফ ক্যাপ্টেন নিয়োগীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছেন। আমি সালাম দিয়ে বললাম, ১২০ জন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ট্রেনিংয়ের কথা। তখন রফিক উদ্দিন ক্যাপ্টেন নিয়োগীর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে কালভার্ট ব্রিজ ধ্বংসের জন্য ১৫ দিনে ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করলেন। যাতে করে পাকিস্তানী সেনাসদস্যদের যোগাযোগ ব্যবস্থার বিঘœ সৃষ্টি হয়। ট্রেনিং শেষে টিকরকান্দা ফিরে আসি।
তিনি বলেন, শেরপুর ফিরে আসি। এখানে কামরান নামে একজন বদরবাহিনীর লোক ছিল। সে কামারুজ্জামানের টু-আই-সি। বেলুজ রেজিমেন্ট ক্যাপ্টেন রিয়াজ জামালপুরে হাতে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। কামরানের সঙ্গে সে পাকিস্তান চলে যায়। সাক্ষী আরও বলেন, আমি যে কামারুজ্জামানের কথা বলেছি তিনি ছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা ও আলবদর-আলশামস বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। কড়ুয়া হাইস্কুল মাঠে, শ্রীবর্দীর টেঙ্গরপাড়া হাইস্কুল মাঠে ও বকশিগঞ্জ নুর মোহাম্মদ স্কুলমাঠে আলবদর ক্যাম্প করা হয়। পাকসেনারা থাকত স্কুল বোর্ডিংয়ে আর আলবদররা থাকত পাশে ক্যাম্প করে।
সাক্ষী জহুরুল হক বলেন, আমি ভারতের চেরাপুঞ্জি ও তুরায় গেরিলা ট্রেনিং করি। উচ্চতর গেরিলা ট্রেনিং হয় চেরাপুঞ্জিতে পুরো একমাস ধরে। মারাঠা ফার্স্ট ব্যাটালিয়ন ৯৫ মাউন্টেইন ব্রিগেডে (এলআই) অন্তর্ভুক্ত করে আমাকে কমান্ডিং গাইডিং অফিসার হিসেবে নিযুক্ত করে। আমি সেখানে অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। আমার সুপিরিয়র অফিসার ছিলেন ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার হরদেব সিং ক্লে। তিনি আমাকে দায়িত্ব দিলেন, সীমান্তসংলগ্ন যে সকল পাকিস্তানী ও বদর ক্যাম্প আছে তার খবর সংগ্রহ করে তাকে জানানোর জন্য।
তিনি বলেন, সেই মোতাবেক আমি অক্টোবরে ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে শেরপুর শহরে কোথায় কি হচ্ছে এসব তথ্য নেয়ার চেষ্টা করি। এক পর্যায় আমি জানতে পারি সুরেন্দ্র মোহন সাহার পরিত্যক্ত বাড়িতে কামারুজ্জামান পাকসেনাদের ক্যাম্প তৈরি করে দেন। আমি ভিক্ষুক সেজে ওই বাড়ির আশপাশে চারদিন ভিক্ষা করি এবং খবর সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। হঠাৎ করে একদিন ঐ ক্যাম্পে ঢুকে পড়ি। দেখি গেটের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে মোহন মুন্সী নামে এক বদর সদস্য। তাকে ছালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখি কামারুজ্জামান ও মেজর আইয়ুব দোতালায় উঠে যাচ্ছে।
মেজর আইয়ুব সেন্ট্রিকে বললÑ ‘কোন্ হ্যায় কেয়া মাঙ্গতা হে। তখন আলবদর মোহন মুন্সী এবং সেন্ট্রিকে ছটফট করতে দেখি। এরপর তারা উপরে উঠে গেল। আমি তখন নিচতলা থেকে শুনলাম দোতলা থেকে আওয়াজ আসছেÑ ‘আল্লাগো, মাগো বাঁচাও।’ এ সময় একজন পাকসেনা নিচে নেমে এসে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে আমাকে ফকির মনে করে ক্যাম্প থেকে বের করে দেয়। তখন মোহন মুন্সী বলেন, ‘সে তো ভিক্ষুক হ্যায়।’ এরপর আমি সব খবর নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাই।
সাক্ষী জহিরুল হক মুন্সি জবানবন্দীতে বলেন, ‘পরে আমি লোকমুখে জানতে পারি সুরেন সাহার বাড়ির ক্যাম্পে থাকা মহিলা এবং পুরুষদের সেরি ব্রিজের কাছে নিয়ে বেয়নেট চার্জ ও গুলি করে পানিতে ভাসিয়ে দেয় পাকবাহিনী। আমি সুরেন সাহার ক্যাম্পে একবারই এসেছিলাম। আমি জানতে পারি প্রিন্সিপাল হান্নান সাহেবকে কামারুজ্জামান ও মেজর আইয়ুব কলেজের ছাত্র না আসায় এবং কলেজ বন্ধ রাখায় তার মাথা ন্যাড়া করে চুনকালি মেখে কোমরে দড়ি বেঁধে সারা শহর ঘুরায়। আমি ১৪ নবেম্বর টিকরকান্দীতে এ্যামবুশ করি। সেখানে মেজর আইয়ুব ফুলকার চর ব্রিজ দেখতে গিয়েছিল। ফেরার পথে আমাদের পোতা মাইন বিস্ফোরণে সেসহ ১৩ পাকিস্তানী সেনা নিহত হয়। এরপর আমি কামালপুরে গিয়ে দেখি ১৮ জন মহিলাকে নির্যাতন, ধর্ষণ করে পাকিস্তানীরা হত্যা করেছে। সেখানে মিরপুর বাঙলা কলেজের প্রথম বর্ষের ২ জন ছাত্রীর পরিচয়পত্র পাই।
তিনি বলেন, মোঃ কামারুজ্জামান এবং মেজর আইয়ুব বিভিন্ন ক্যাম্পে যেতেন এবং মাইকে বলতেনÑ ‘যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা করবেন তাদের রেহাই দেয়া হবে না, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হবে। মেয়েদের সম্ভ্রম হরণ করা হবে।’ ঝিনাইগাতি থানার কানগা ইউনিয়নের মোখলেছ চেয়ারম্যান হজের জন্য ৫০ হাজার টাকা জমা দিতে শেরপুরে গিয়েছিলেন। তখন এই চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করে বলে কয়েকজন আলবদর কামারুজ্জামানকে জানায়। তখনি এ চেয়ারম্যানকে ধরে বকশিগঞ্জ গরুহাটিতে নিয়ে হত্যা করা হয়।
সাক্ষী জহুরুল হক বলেন, ৯ ডিসেম্বর আমি বেলটিয়ায় অবস্থান করছিলাম। তখন আমি ব্রিগেডিয়ার হরদেব সিং ক্লের হাতে লেখা একটি চিঠি নিয়ে জামালপুর পিটিআইতে পাকিস্তানী আর্মি ক্যাম্পে আসি। সেন্ট্রি পোস্টে আমার বডি সার্চ করে ২০ টাকা ও একটি চিঠি পায়। আমি সাদা ফ্লাগ উড়িয়ে বাইসাইকেলযোগে গিয়েছিলাম। সে সাদা ফ্লাগটি দিয়ে আমার চোখ, আমার কোমরে থাকা গামছা দিয়ে হাত বেঁধে আমাকে ওয়াপদা ক্যাম্পে কোয়ার্টার গার্ডে রাখে। তখন একজন বেলুচ আর্মি বলেন, ‘উচকো কেয়া করে গা।’ তখন আমি জানতে পারি পাকিস্তানী কর্নেল সুলতান খান ও বদর কামান্ডার কামারুজ্জামান ঝিনাইগাতি ব্রিজ পরিদর্শন করতে গেছে।
তারা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। কিছুক্ষণের মধ্যে আনুমানিক দুপুর দেড়টা নাগাদ আমি যে স্যারেন্ডারপত্রটি বহন করে এনেছিলাম সেটি কর্নেল সুলতান খানের কাছে পাক আর্মিরা দেয়। তখন সে রাগান্বিত হয়ে তার কাছে থাকা এসএমজি ম্যাগাজিন দিয়ে আমাকে আঘাত করে। তাতে আমার ওপরের পার্টির ৪ থেকে ৫টি দাঁত ভেঙ্গে যায়। আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে আমাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখে। তখন পাকিস্তানী এক সেনা আমার পা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ‘মোরব্বা’ করে ফেলে।
সাক্ষী জহিরুল হক মুন্সি বলেন, আমি তখন বলি আমি একজন সাধারণ কৃষক, আমাকে ভয় দেখিয়ে চিঠি দিয়ে পাঠিয়েছে। আমি মুক্তিযোদ্ধা না। তখন সুলতান খান হরদেব সিং ক্লের চিঠির জবাব লিখে তা আমাকে ক্লের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য বলেন। তখন আমি অভিনয় করে বলি আমি আর এই চিঠি নিয়ে যাব না। গেলে আমাকে মেরে ফেলবে। আমি এখানেই থাকব। ওই ক্যাম্পে আমি সকাল ১১টায় ঢুকি রাত প্রায় ১১টায় সাইকেলসহ আমাকে ছেড়ে দেয়। আমি এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে কোন মতে বেলদিয়াস ক্যাম্পের দিকে রওনা দিই। যাওয়ার পথে রাস্তার দু’পাশের গাছগুলোর সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ অনেক মানুষের মৃতদেহ দেখতে পাই।
জবানবন্দী শেষে প্রসিকিউটর একেএম সাইফুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী জহুরুল হক কাঠগড়া থেকে নেমে পেছনের ডকে বসা কামারুজ্জামানকে দেখে বলেন, ‘আসামির ডকে বসা, চশমা পরা উনিই কামারুজ্জামান। এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী কফিলউদ্দিন চৌধুরী তাকে জেরা শুরু করেন। পরে ট্রাইব্যুনাল তার জেরা অসমাপ্ত অবস্থায় ২ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করেন।
উল্লেখ্য, ১৫ জুলাই কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন চলতি বছরে ১৫ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। পরে বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ গত ৩১ জানুয়ারি অভিযোগ আমলে নেয়।
সাকা চৌধুরী ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষী ব্যবসায়ী পরাগ ধরের জবানবন্দী আবারও ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে গ্রহণ করা হবে বলে আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। চেয়ারম্যান বিচারপতি মোঃ নিজামুল হক নাসিমের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দিয়েছে।
২৬ জুলাই প্রসিকিউশনের নবম সাক্ষী পরাগ ধর জবানবন্দী দেন ট্রাইব্যুনালে। জবানবন্দী শেষে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী আহসানুল হক হেনা সাক্ষীকে জেরা করেন। ওই দিন মাত্র ৩০ মিনিট সময়ে সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরার কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়। পরে বুধবার ওই সাক্ষীর বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে জবানবন্দী গ্রহণ করার জন্য আদেশ দেয় বলে জানান প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম। ক্যামেরা ট্রায়ালের বিষয়ে সাক্ষ্যগ্রহণের আদেশ দেয়ার আগে বুধবার ট্রাইব্যুনালের কাছে এই মর্মে আবেদন করেন যে, সাক্ষী তার জবানবন্দীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়েছেন। তাই পুনরায় সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা হোক। শুনানিতে জেয়াদ আল মালুম বলেন, সাক্ষী তার জবানবন্দীতে যে বক্তব্য পেশ করবেন তা যেন ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। পরে ট্রাইব্যুনাল তার আবেদন মঞ্জুর করে।
আদেশের পর প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম জনকণ্ঠকে বলেছেন, ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর সঙ্গে আমিসহ প্রসিকিউশন পক্ষের মোট তিন জন এবং ডিফেন্সের আহসানুল হক হেনার সঙ্গে আরও একজন মোট পাঁচজন আইনজীবী উপস্থিত থাকবে। তবে আদালতের ভেতরের কোন তথ্য ট্রাইব্যুনালের বাইরে কোন আইনজীবী প্রকাশ করতে পারবেন না। এমনকি কোন সাংবাদিকও সেদিনের সাক্ষ্যগ্রহণে উপস্থিত থাকতে পারবেন না। এর আগে ট্রাইব্যুনাল-২-এ আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রথম ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে এক মহিলা ভিকটিমের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল।
সাঈদী ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি মোঃ হেলাল উদ্দিনের জেরা অব্যাহত রয়েছে। বুধবার তাকে চেয়ারম্যান নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে হেলাল উদ্দিনকে ৪১তম দিনের মতো জেরা করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম।
গত ৮ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাঈদীর বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন সাক্ষ্য দেন ট্রাইব্যুনালে। এর পর ২৫ এপ্রিল থেকে তাকে জেরা করছে আসামিপক্ষ। অসুস্থ অবস্থায় বর্তমানে ইব্রাহীম কার্ডিয়াক (বারডেম) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাঈদীর অনুপস্থতিইে তার বিচার কার্যক্রম চলছে। ২০১০ সালের ২৯ জুন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে তার রাজধানীর শহীদবাগের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

No comments

Powered by Blogger.