আকালের কারণ বহুবিধ- বলছেন বিশেষজ্ঞরা by রফিকুল ইসলাম ও মির্জা এস আই খালেদ

২৯ জুলাই সকাল। পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের ঘাটে কয়েক শ ট্রলার নোঙর করা। জেলেদের চেহারায় আলস্য ও হতাশার ছাপ। জেলেরা জানান, জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ মাস ইলিশের ভরা মৌসুম। এ সময় ধরা পড়া ইলিশ দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এবার ইলিশের দেখা নেই।


দুলাল মাঝি জানান, লাখ টাকা ব্যয়ে ট্রলারে করে ১৯ জন শ্রমিকসহ তিন-চারবার সাগরে গিয়ে তাঁকে প্রায় শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয়েছে।
জেলেরা বলছেন, মেঘনায় ইলিশ নেই, নেই কীর্তনখোলায়ও; যদিও আষাঢ়-শ্রাবণ মেঘনায় ইলিশের ভ্রমণের সময়। কিন্তু ইলিশের দেখা মেলেনি সেভাবে। এমনকি বঙ্গোপসাগর উপকূলেও অনুপস্থিত ইলিশ। পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের আড়তদার সগীর আলম বলেন, 'মৌসুমের দেড় মাস পার হলেও ইলিশ ধরা না পড়ায় আমাদের ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়েছে।' একই ধরনের হতাশা আড়তদার সেলিম মিয়ার কথায়। 'অনেক আশা-ভরসা নিয়ে এবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলাম, তা ভেস্তে যেতে বসেছে।' কালের কণ্ঠকে বলেন সেলিম মিয়া।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এবার মূলত চার কারণে বঙ্গোপসাগর থেকে ইলিশের ঝাঁক নদীতে আসছে না। এগুলো হচ্ছে বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়া, নদীদূষণ, যত্রতত্র ডুবোচর ও কারেন্ট জাল। এ ছাড়া নদীতে পানি ও স্রোত কমে যাওয়া এবং মিঠা পানির নদীতে লবণাক্ততা চলে আসার জন্যও ইলিশ মোহনামুখী হচ্ছে না। ফলে ব্যাহত হচ্ছে ইলিশের প্রজনন। বৈরী অবস্থায় এখন যা ইলিশ ধরা পড়ছে, তা কেবল সমুদ্র উপকূলে। কিন্তু বিদেশি উপদ্রবের ফলে সমুদ্রেও মাছ পড়ছে না।
ইলিশ মাছের জীবনাচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আনিসুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, চরিত্রগতভাবে ইলিশ দল বেঁধে চলে। প্রতিবছর তারা নির্দিষ্ট কয়েকটি নদীর মোহনায় ডিম ছাড়ে। বছরের পর বছর তারা একই স্থানে ডিম ছাড়ার জন্য ফিরে আসে। কিন্তু সেই বিচরণের স্থানে সমস্যা তৈরি হলে তারা স্থান ত্যাগ করে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ কোনো মোহনায় চলে যায়। আনিসুর রহমান আশা করছেন, সামনে বৃষ্টি ও বজ্রপাত বাড়লে ইলিশের দল বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, চাঁদপুরের পার্শ্ববর্তী পদ্মা ও মেঘনা অববাহিকায় আসতে শুরু করবে।
মৎস্য অধিদপ্তর, বরিশাল বিভাগের উপপরিচালক এ কে এম আমিনুল হক বলেন, 'ইলিশ মাছ অঞ্চলের মুক্ত জলাশয়ে ডিম ছাড়ে। ওই রেণু বড় হয়ে পূর্ণবয়স্ক ইলিশ হওয়ার পর ওই অঞ্চলেই ডিম ছাড়তে আসে। কিন্তু পরিবেশ বিপর্যয় ও নদী ভরাট করে বাঁধ নির্মাণ করার কারণে মাছের গতি পরিবর্তন হয়ে গেছে। নদী ভরাট, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের মুক্ত জলাশয় কমে গেছে।' মৎস্যসম্পদ রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড, বন বিভাগ, কৃষি ও মৎস্য অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
টোল আদায় হ্রাস : পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লে. কমান্ডার মীর মো. হুমায়ুন কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিবছর এ সময়ে পটুয়াখালী, বরগুনা, বাগেরহাট, পিরোজপুরসহ উপকূলের জেলেদের আনাগোনায় মুখর থাকে এই কেন্দ্র। এবার এখানে ইলিশের তেমন সরবরাহ না থাকায় টোল আদায় কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। তিনি বলেন, সিডর ও আইলার আঘাতের পর উপকূলের সামগ্রিক আবহাওয়ার গতি-প্রকৃতি ও সামুদ্রিক প্রতিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন মৌসুমেও গত দু-তিন বছরে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। তিনি আশা করছেন, শ্রাবণে ভারি বর্ষণ হলেই সাগরে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে।
বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্ষার মৌসুমে গড় বৃষ্টিপাত কমে এসেছে। তাই বিগত বছরগুলোর মতো এখন নদীর মিঠা পানির স্রোত সাগরে যাচ্ছে না। ফলে সাগরে লবণাক্ততা সহজেই কমছে না। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বিদেশিরা নির্বিচারে ট্রলিং বোর্ডের সাহায্যে চিংড়ি মাছ ধরছে বলে বছর দুয়েক ধরে জেলেরা অভিযোগ করে আসছেন। জেলেদের সেই অভিযোগও ভরা মৌসুমে ইলিশ না পড়ার একটি কারণ। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'বিদেশি জেলেরা উন্নত প্রযুক্তি বিশেষ করে শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে মাছ শিকার করে। এ ক্ষেত্রে আমাদের জেলেরা পিছিয়ে আছে।'
ভরা মৌসুমে ইলিশের আকালের কারণ জানতে চাইলে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্বে থাকা উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর উপকূলের সামগ্রিক পরিবেশ ও প্রতিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। তাঁর মতে, সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ার কারণে সাগরের পানির লবণাক্ততা পরিবর্তিত না হওয়ায় ইলিশের প্রাচুর্য কম।
ভারত ও মিয়ানমারের জেলেদের নির্বিচারে ট্রলিং বোর্ডের সাহায্যে চিংড়ি মাছ ধরার কথা জানা যায় বরগুনা-২ (পাথরঘাটা-বামনা-বেতাগী) আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য গোলাম সবুর টুলুর কাছ থেকেও। তিনি মুঠোফোনে বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ভারত ও মিয়ানমারের জেলেদের ট্রলিং বোর্ডের সাহায্যে চিংড়ি মাছ ধরার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিদেশিদের ট্রলিং বোর্ডের কারণে গভীর সমুদ্র থেকে ডিম ছাড়ার জন্য ইলিশ মাছ তীরে আসছে না। তিনি বলেন, 'বিষয়টি নিয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে কথা বলেছি। তারা বিষয়টি দেখার আশ্বাসও দিয়েছে। তবে গভীর সমুদ্রে গিয়ে বাংলাদেশি জেলেদের নিরাপত্তা দেওয়ার মতো নৌযান কোস্টগার্ডেরও নেই। তাই জেলেদের দীর্ঘদিনের দাবির সুরাহা হচ্ছে না।'
বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ও জেলা মৎস্য শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আ. মান্নান মাঝি বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বিদেশি জেলেরা প্রবেশ করায় স্থানীয় মৎস্যজীবীরা বিপাকে পড়েছে। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়ে জানানো হয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.