বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৩৬৩ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। শফিকুর রহমান, বীর প্রতীক যুদ্ধক্ষেত্রে বাঁ হাত উড়ে গেল তাঁর গোলাগুলির শব্দে গোটা এলাকা প্রকম্পিত। বৃষ্টির মতো শত শত গুলি ধেয়ে আসছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে। গোলাও এসে পড়ছে।


বিরামহীন গোলাবর্ষণ। শফিকুর রহমান ও তাঁর সহযোদ্ধারা ভীতসন্ত্রস্ত হলেন না। অধিনায়কের নির্দেশ পেয়ে গোলাগুলি উপেক্ষা করে সাহসিকতার সঙ্গে তাঁরা এগিয়ে যেতে থাকলেন সামনে। ঢুকে পড়লেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষার ভেতর। এমন সময় হঠাৎ একটি গোলা এসে পড়ল শফিকুর রহমানের পাশে। বিস্ফোরিত গোলার বড় এক স্প্লিন্টার আঘাত করল তাঁর বাঁ হাতে। নিমেষে উড়ে গেল তাঁর হাতের সামনের অংশ। গুরুতর আহত শফিকুর রহমান লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। এ ঘটনা কামালপুরে। ১৯৭১ সালের ৩১ জুলাই।
কামালপুর জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে। এখানে আছে সীমান্তচৌকি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ওই সীমান্তচৌকি ঘিরে তৈরি করে দুর্ভেদ্য এক ঘাঁটি। সেদিন মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওই ঘাঁটিতে আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম, পরে মেজর) ও ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দীন মমতাজ (বীর উত্তম) নেতৃত্ব দেন। ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমদের বয়ানে কামালপুর যুদ্ধের বিবরণ আছে।
তিনি বলেন, ‘৩১ জুলাই ভোর সাড়ে তিনটার সময় দুই কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আমরা কামালপুর বর্ডার আউট পোস্টে আক্রমণ করি। এফইউপিতে পৌঁছানোর পূর্বেই আমাদের পক্ষ থেকে আর্টিলারির গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে আমাদের এফইউপিতে পৌঁছার পরই আর্টিলারির ব্যবহার করার কথা ছিল। এতে মুক্তিযোদ্ধারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন।
‘এ সময়ে শত্রুপক্ষও আর্টিলারি ও ভারী মর্টারের সাহায্যে গোলাগুলি শুরু করে। তা সত্ত্বেও আমি ও সালাহউদ্দীন আমাদের কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রিত করে শত্রুদের আক্রমণ করি ও সামনে অগ্রসর হই। কাঁটাতার এবং মাইন ফিল্ড অতিক্রম করে শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষার অর্ধেক জায়গা দখল করে নিই। শত্রুরা পেছন দিকে হটে যায়।
‘এই আক্রমণ ও যুদ্ধে আমাদের পক্ষে একজন অফিসারসহ ৩১ জন যোদ্ধা শহীদ ও দুজন জুনিয়র কমিশন অফিসারসহ ৬৫ জন আহত হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, শত্রুপক্ষের ৫০ জন নিহত ও ৬০ জন আহত হয়। ওই আক্রমণ যদিও পুরোপুরি সফল হয়নি, তবুও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটা একটা স্মরণীয় আক্রমণ ছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাঁটাতারের ঘেরা ও মাইন ফিল্ড উপেক্ষা করে আমাদের যোদ্ধারা যেভাবে অসীম সাহসিকতায় সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন, তা থেকে প্রমাণিত হয় তাঁরাও অসীম বীরত্বের অধিকারী।’
শফিকুর রহমান ওই যুদ্ধে আহত হওয়ার পর সহযোদ্ধারা তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করে পাঠিয়ে দেন ফিল্ড হাসপাতালে। পরে ভারতে তাঁর চিকিৎসা হয়।
শফিকুর রহমান চাকরি করতেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ১৯৭১ সালে এই রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল যশোরে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য শফিকুর রহমানকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ২৩২।
শফিকুর রহমান এ বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি যশোর জেলার সদর উপজেলার ইছালী ইউনিয়নের জোত রহিমপুর গ্রামে। বাবার নাম নওয়াব আলী বিশ্বাস। মা জরিনা বেগম। স্ত্রী শাহনাজ বেগম। তাঁদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে।
সূত্র: জাহিদ রহমান, প্রধান নির্বাহী, মুক্তিযুদ্ধে মাগুরা গবেষণাকেন্দ্র এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র, দশম খণ্ড।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.